24/12/2025
'উল্টোনদীর বাঁকে' সংকলনের পাঠ অনুভূতি জানালেন স্নিগ্ধদেব বোস । তাঁর বক্তব্য নিম্নরূপ।
📕 বই~ উল্টোনদীর বাঁকে
✒️ লেখিকা~ সাথী দাস
🖼️ প্রচ্ছদ~ সৌজন্য চক্রবর্তী
🖨️ প্রকাশনা~ দীপ প্রকাশন
💷 মুদ্রিত মূল্য~ ২৭৫/-
📋 পৃষ্ঠা~ ১৬৮
📝পাঠ অনুভূতি
💎 জানতে হয়তো বড্ড দেরি হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু সেই চিরন্তন সত্যের সন্ধান পাওয়ার পর থেকেই ডুব দিয়েছিলাম পাঠের অতল গভীরে। পড়ার পর আমি শুধু বিস্মিত হইনি, বরং এক অলৌকিক ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি। সেই ঘোর কাটতে না কাটতেই প্রবল বিস্ময়ে হাত কেঁপে উঠেছিল; তন্নতন্ন করে খুঁজেও পাইনি সেই অনন্য ছবিখানি। তবে বিস্ময়ের ঘোর কাটলে একে একে হৃদয়ে সঞ্চয় করেছি আপনার সৃষ্টির রত্নগুলো। এরপর অনুভূতির সেই জোয়ার এলো, যাতে আমার মনের গহনে জমে থাকা সকল অমীমাংসিত প্রশ্নের উত্তর মিললো অত্যন্ত জাদুকরী উপায়ে। সেই তৃপ্তির আনন্দ আসলে ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।
❤️ একজন জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বের অপরিচিত এক পাঠক যে এভাবে ভাই হয়ে উঠতে পারে, তা আমার কাছে এক পরম প্রাপ্তি। না, পাঠ-অনুভূতি লিখতে বসে আমি কোনো কল্পকাহিনি ফাঁদছি না; এগুলো নিতান্তই হৃদয়ের স্পন্দন, যা অতি যত্নে আজীবন মনের মণিকোঠায় তোলা থাকবে। এই বিশেষ গ্রন্থটি পাঠের পর যে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে, তাই আজ শব্দে সাজাতে বসেছি। তবে শুরু করা যাক...
🏠 ডাক:
দীর্ঘ এক পথচলার পর গল্পের কথক অবশেষে নিজের 'স্থায়ী ঠিকানা' খুঁজে পেয়েছে। নিজের উপার্জিত অর্থ দিয়ে সাজানো ফ্ল্যাটের নামফলকে নিজের নাম খোদাই করে সে যেন জীবনের সব তিক্ত অভিজ্ঞতা ও অবাঞ্ছিত অতিথিদের প্রতি এক কড়া 'সাবধানবাণী' জারি করে— "এবার আর কেড়ে নেওয়া চলবে না।"
এই নতুন ঠিকানা তার সংগ্রাম ও আত্মনির্ভরতার প্রতীক। কিন্তু মনের গভীরে কি সত্যিই স্থিতাবস্থা এসেছে? এই কাহিনি আসলে শিকড় ও আশ্রয়ের খোঁজে একাকী মানুষের পথচলার এবং এক নতুন পরিচিতি গড়ে তোলার মর্মস্পর্শী গল্প।
গল্পটি পাঠকের (আমার) মনে এক গভীর আত্ম-অনুসন্ধানের জন্ম দেয়। এটি কেবল কোনো স্থানের বিবরণ নয়, বরং নিজস্বতা (Identity) এবং স্থায়িত্বের (Permanence) জন্য এক মানুষের নিরন্তর লড়াইয়ের দলিল। পড়তে পড়তে হারিয়ে গিয়ে মনে হয়েছে, নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার অর্জন করতেই হয় সকলকে। কথকের কথায় যে দৃঢ়তা ফুটে ওঠে— "ফ্ল্যাটের প্রত্যেকটা সুতো আমার টাকায় কেনা", তার মধ্যে কেবল অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জয় নেই, আছে দীর্ঘদিনের অপমান ও 'তাড়িয়ে দেওয়া'র ভয় থেকে মুক্তি পাওয়ার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা। এ যেন বাস্তবের সেই সব মানুষ, যাদের দেখেছি সূর্যাস্তের পর আলো-আঁধারি জীবনে। মনে এসেছে কত কথা, কত মানুষের গল্প। বাস্তব যেন ভেসে ওঠে সামনে। মন খারাপ হবে না, তাই হয় নাকি? এমন লেখা লেখিকার কলমই পারে।
লেখিকা অত্যন্ত কাব্যিক ও প্রতীকী ভাষায় শৈশবের স্মৃতি, বর্তমানের সংগ্রাম এবং ভবিষ্যতের ভয়কে অসাধারণভাবে তুলে ধরেছেন। 'গোলাপি রঙের বাড়ি' বা 'মস্ত প্রজাপতি গেট' যেন হারিয়ে যাওয়া সহজ জীবনের প্রতীক। অন্যদিকে, 'বাবার পরলোকগমন' এবং 'মায়ের জানালার প্রতি ভালোবাসা' (যা তাঁর মুক্তির একমাত্র পথ)-এর মতো ব্যক্তিগত বিষাদগুলো মানুষের অভ্যন্তরীণ শূন্যতাকে ফুটিয়ে তুলেছে। মা ও মেয়ের মনে বয়সের প্রেক্ষিতে যে গোপনীয়তা থাকে, তা লেখিকা গভীরভাবে উপলব্ধি করেছেন। মানবমনের অভ্যন্তরে পৌঁছে যেতে লেখিকার মন ও কলম দুই-ই অপ্রতিরোধ্য।
এই কাহিনি প্রমাণ করে, বাইরের জগতের দৌড় থেমে গেলেও মনের ভেতরের অস্থিরতা সহজে থামে না। পাঠকালে পাঠক অনুভব করবেন, বাড়ি তৈরি করা সহজ, কিন্তু 'ঘর' তৈরি করতে প্রয়োজন হয় এক গভীর মানসিক স্থিতির। এটি কেবল একটি বাড়ির গল্প নয়, বরং এক ভাঙা মনকে জোড়া লাগানোর, আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা করার এবং অবশেষে শান্তিতে 'থাকার' লড়াইয়ের গল্প।
নিজের নামকে নামফলকে খোদাই করে যে 'উগ্র সাবধানবাণী' দেওয়া, তা একাকী মানুষের অসহায়তা ও ক্রোধকে এক লহমায় প্রকাশ করে। মানুষের মনের ক্ষতবিক্ষত দিকগুলো ফুটে ওঠে এই কাহিনিতে। আত্মগত ভাষার ব্যবহার এবং স্মৃতিচারণের শৈলী পাঠককে নিবিড়ভাবে চরিত্রের সঙ্গে জুড়ে রাখে।
সবশেষে বলা যায়, 'ডাক' একটি মনোযোগী পাঠের দাবি রাখে, যা জীবনের অস্থির গতিপথের শেষে এক স্থির, নিজস্ব আশ্রয়ের খোঁজ করে।
🎣 টান:
গল্পটি মণিদীপা নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিকার দৃষ্টিকোণ থেকে বলা হয়েছে। তাঁর বর্তমান জীবন শুরু হয় যান্ত্রিক ফোনের শব্দে ঘুম ভাঙার মধ্য দিয়ে। নিজের মেয়ে পুপু, গৃহকর্ম সহায়ক রেখা এবং দৈনন্দিন সুগার-থাইরয়েড-কোলেস্টেরলের মতো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে বোঝাপড়া করে তিনি একরকম জীবন কাটাচ্ছেন।
লেখিকা গল্পের প্রধান চরিত্র মণিদীপার জীবনের দুটো দিক ফুটিয়ে তুলেছেন—এক, বর্তমানের একাকীত্ব ও স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ অবসর জীবন; দুই, অতীতের কষ্ট, অভাব আর জীবনের লড়াই। বর্তমানে তাঁর "নোলা" অর্থাৎ খাদ্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণ তাঁকে যেমন হাসি-খুশিতে রাখে, তেমনি এই 'নোলা'ই যেন ছিল অতীতের দারিদ্র্যপীড়িত জীবনের এক নির্মম সত্য।
গল্পটি মূলত আত্মজীবনীমূলক গদ্যের মাধ্যমে একজন নারীর দীর্ঘ জীবনসংগ্রামের অন্তরঙ্গ চিত্র। মূল চরিত্র মণিদীপার স্মৃতিচারণ পাঠককে টেনে নিয়ে যায় এক করুণ অথচ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জীবনে, যেখান থেকে পাঠকের মুক্তি নেই। গল্পের প্রধানতম থিম হলো 'নোলা', যা শুধু খাদ্যের প্রতি আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং জীবনের সবরকম মৌলিক চাহিদা, ভালোবাসা ও মর্যাদার জন্য এক অবদমিত আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হিসেবে দেখিয়েছেন লেখিকা। দারিদ্র্যের কারণে যে আকাঙ্ক্ষাকে বারবার 'খারাপ' বা 'লজ্জার' বিষয় বলে মনে করা হয়েছে, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেটিই ভালোবাসার আর্তি হিসেবে নতুন অর্থ খুঁজে পেয়েছে। গভীর উপলব্ধিতে মনে হয়েছে— এই পৃথিবীর কোন মানুষ আছে যে 'নোলা' নয়? বলতে পারি না। আমি তো ভীষণ 'নোলা' একটু স্নেহ ও ভালোবাসার।
মণিদীপার টিউশনির সময় করবীদির শাশুড়ির দ্বারা 'অজাত-কুজাত' বলে অপমানিত হওয়ার ঘটনায় সেই সময়ের সমাজ ও শ্রেণির বৈষম্য তীব্রভাবে ফুটে উঠেছে, যা আজকের দিনেও ঘটে চলে অহরহ। অন্যদিকে, করবীদির লুকানো স্নেহ ও প্রতিবাদ প্রমাণ করে মানবিকতা কীভাবে সমস্ত সামাজিক বেড়াজাল ছিন্ন করতে পারে। চরিত্রের দুই দিক এক কাহিনির মধ্যে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখিকা, যা পাঠককে গভীরভাবে ভাবায়।
লেখিকা শৈশবের করুণ স্মৃতিগুলি এবং বর্তমানের ছোট ছোট সুখের (যেমন— মেয়ের দেওয়া ফোন বা ইলিশ মাছের গন্ধ) মধ্যে একটি সুন্দর ভারসাম্য তৈরি করেছেন। এটি পাঠককে মনে করায় যে, অতীতের কষ্ট কখনও সম্পূর্ণ মুছে যায় না, কিন্তু বর্তমানের যত্ন আর ভালোবাসা সেই দাগের ওপর প্রলেপ দিতে পারে।
সামগ্রিকভাবে, 'টান' এক মর্মস্পর্শী রচনা, যা মানুষকে শেখায় যে খাদ্য-বস্ত্রের মতো সামান্য জিনিসও একজন মানুষের কাছে সম্মান আর ভালোবাসার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
🚂 গতি:
গল্পটি মূলত মদন নামক এক স্টেশন চত্বরের চায়ের হকারের জীবন ও পারিপার্শ্বিকতা নিয়ে আবর্তিত। গল্পের মূল চরিত্র মদন ওরফে 'ট্যারা মদনা', যার জীবন রেললাইনের সমান্তরাল গতির সঙ্গে এক অদ্ভুত বৈপরীত্যে বাঁধা।
স্টেশন চত্বরে মদন ওই নামেই পরিচিত। তার জীবন বাঁধা পড়েছে চায়ের কেটলি হাতে চলন্ত ট্রেনের জানালার পাশে দৌড়ানোর নিত্যদিনের সংগ্রামে। এক ল্যাংড়া বাবা আর রুগ্ণ মাকে নিয়ে রেললাইনের ধারের বস্তিতে তার সকাল হয়, রাত নামে। মদনের জীবনে গতি মানে শুধু দৌড়; কিন্তু সে জানে এই চলার সঙ্গে সাযুজ্য রেখেও তার জীবন আসলে অচল, থেমে থাকা। তার বয়স আসছে অঘ্রানে আঠেরো হবে, আর তার সমস্ত ভাবনা জুড়ে আছে কৈশোর পেরোনো পনেরো বছর বয়সের পিয়া। পিয়ার সঙ্গে তার টানাপোড়েন, ট্রেনের গতি, প্ল্যাটফর্মের বুড়ি আর তার মৃত ছেলের কাহিনি—সব মিলিয়ে এই কাহিনি যেন প্রমাণ করে, রেললাইন যেমন সমান্তরাল হয়েও কখনও মিলিত হয় না, তেমনি জীবনের গতি আর স্থবিরতা চিরকালই একে অপরের বিপরীতে অবস্থান করে।
গল্পটি একটি তীব্র জীবনবোধ সম্পন্ন রচনা, যা পাঠকের মনে গতি এবং স্থবিরতার দার্শনিক প্রশ্নটি উত্থাপন করে। লেখিকা রেললাইনকে জীবনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছেন—দুটো সমান্তরাল রেখা, যা নিত্যদিন জীবনের স্রোত বয়ে নিয়ে যায়, কিন্তু কখনও মিলিত হয় না। এটাই জীবন, প্রত্যেক মানুষের জীবন এভাবেই এগিয়ে চলে প্রত্যহ শেষ গন্তব্যের দিকে।
চরিত্রগুলির মধ্যে মদনের একাকীত্ব ও অসহায়তা, বিশেষত তার স্বপ্নের পিয়াকে নিয়ে দেখা আবেগ পাঠকের হৃদয়ে গভীর দাগ কাটে। একজন মানুষের বেড়ে ওঠা পরিবেশের মধ্য দিয়ে যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও ভাষারীতি জন্ম নেয়, লেখিকা তা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন, যা পাঠককে অনুভব করতে বাধ্য করে। পিয়ার প্রতি মদনের ভালোবাসা ও অধিকারবোধে এক রুক্ষতা আছে, যা তার জীবনসংগ্রামেরই প্রতিফলন; কারণ তাদের জীবন বেড়ে উঠেছে সেই সংগ্রামের মাটিতেই। অন্যদিকে, ল্যাংড়া বাবা এবং মোটা বুড়ির ছেলে (যে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা যায়)—তাদের স্থবির জীবনের ছবি মদনের অস্থিরতাকে আরও প্রকট করে তোলে।
মদনের চা বিক্রি করার দৌড় আর ট্রেনের লাগামহীন গতি এই সমাজের এক করুণ বৈপরীত্যকে তুলে ধরেছে। যারা চলন্ত ট্রেনের কামরায় চা খায়, তারা চলমান জীবনের অংশ; আর যে চা বানিয়ে বিক্রি করে, সে সমাজর চোখে এক থেমে থাকা, অচল মানুষ। আমাদের সমাজ এটাই ভাবতে শিখিয়েছে; এই দৃষ্টিভঙ্গি লেখিকা ভাঙতে পারবেন বলে আশা রাখি। কলমই তাঁর অস্ত্র।
রেললাইনকে কেন্দ্র করে গতি, জীবনের স্রোত এবং ভাগ্য-অভিশাপের রূপক ব্যবহার অনবদ্য। এর থেকে ভালো রূপকের ব্যবহার আগে কখনও পড়িনি। মদন ও পিয়ার মধ্যেকার প্রেম, ঘৃণা ও সংঘাতের বর্ণনা অত্যন্ত বাস্তবসম্মত বলে মনে হয়েছে। কাহিনিতে ব্যবহৃত আঞ্চলিক শব্দ ও চিত্রকল্প (যেমন— 'গরম তাওয়ায় ছেড়ে দেওয়া ডালডার মতো গলে যাই') চরিত্রগুলিকে জীবন্ত করে তুলেছে।
সামগ্রিকভাবে, 'গতি' কেবল একটি প্রেমকাহিনি বা দারিদ্র্যের চিত্র নয়; এটি মানুষের অস্তিত্বের এক বিষণ্ণ আবর্তের গল্প। গতিময় পৃথিবীতে থেমে থাকা মানুষের নিরুপায় জীবন, সংগ্রাম, ধৈর্য আর পুনর্জন্মের এক কাব্যিক গদ্য এই গল্পটি।
☀️ রোদ্দুর:
গল্পের পক্ষাঘাতগ্রস্ত কেন্দ্রীয় চরিত্র লকাই যখন নিঃসঙ্গ রোগশয্যায় দিন গুনছেন, ঠিক তখনই মেজদার প্রয়াণের সংবাদ তাঁকে শৈশব ও যৌবনের স্মৃতিবিজড়িত এক গভীর আত্মোপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করায়। পিসির সাথে মায়ের তিক্ততা কিংবা যৌথ পরিবারের জটিলতার মাঝেও মেজদা ছিলেন তাঁর সেই শৈশবের খেলার সাথী এবং প্রাণরক্ষাকারী অকৃত্রিম বন্ধু, যাঁর সাথে একসময় তিনি গ্রামের যেকোনো মৃতদেহে কাঁধ দিতে ছুটে যেতেন। আজ নিজের শারীরিক অক্ষমতা আর পরিবারের মানুষদের চরম উদাসীনতার মাঝে দাঁড়িয়ে মেজদার শেষযাত্রায় শামিল হতে না পারার হাহাকার লকাইকে এক রূঢ় সত্যের সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়—যেখানে রক্তের সম্পর্ক আর নিঃস্বার্থ ভালোবাসার স্মৃতিগুলোই হয়ে ওঠে জীবনের শেষ সম্বল।
বার্ধক্য ও অসুস্থতা কীভাবে একজন মানুষকে নিজের ঘরেই পরবাসী করে তোলে, তা এই গল্পের অন্যতম প্রধান উপজীব্য হিসেবে তুলে ধরেছেন লেখিকা, যা আমরা আশেপাশে দৃষ্টি মেললেই দেখতে পাই। জীবনের এই অধ্যায়ে মানুষের মনের ভেতর চলা গভীর আত্মকথন লেখিকা আবারও পড়ে ফেলেছেন। কীভাবে পারেন এই গভীর উপলব্ধিগুলো ব্যক্ত করতে! ভগবান ভাগ্যিস লেখিকার হাতে কলম দিয়েছেন, নয়তো পাঠক বঞ্চিত হতেন বলাই যায়।
রক্ত ও আত্মার সম্পর্কের মধ্যে যে সূক্ষ্ম ব্যবধান, তা এখানে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে নিঃসন্দেহে। পরিবারের সদস্যদের দায়সারা ভাব আর মৃত্যুপথযাত্রী মানুষের প্রতি অবহেলা গল্পের বিষণ্নতাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। জীবনের এই অসহায়তা কখন দায়বদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায় এবং তা যে অসহনীয় হয়ে ওঠে, তা পাঠক সহজেই উপলব্ধি করবেন। এ তো আমাদেরই গল্প হয়ে ধরা দেবে পাঠকের কাছে।
বর্তমানের জরাগ্রস্ত জীবনের চেয়ে অতীতের স্মৃতিগুলো অনেক বেশি উজ্জ্বল ও জীবন্ত, যা লকাইকে বেঁচে থাকার রসদ জোগায়। জীবনের এই পর্যায়ে পাওয়া হাহাকার ও মনের ভেতরে চলা কথনকে লেখিকা নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
"কেউ কারও নয়"—এই চরম সত্যটিই মেজদা এবং লকাইয়ের জীবনের অভিজ্ঞতায় বারে বারে ফিরিয়ে এনেছেন লেখিকা। 'রোদ্দুর' কেবল একটি গল্প নয়, এটি একটি জীবনের দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। মানুষের আসা আর যাওয়ার মাঝখানের যে পথটুকু আমরা 'সম্পর্ক' দিয়ে সাজিয়ে রাখি, শেষবেলায় তা কতটা ফিকে হয়ে যায়, লেখিকা তা নিপুণভাবে দেখিয়েছেন। গল্পের ভাষা অত্যন্ত আবেগপ্রবণ এবং বর্ণনাগুলো এতই জীবন্ত যে, পাঠকের মনে এক ধরণের চাপা বিষণ্নতা তৈরি করে। বিশেষ করে মায়ের আত্মসম্মানের লড়াই আর মেজদার সাথে কাটানো মুহূর্তগুলো পড়ার সময় পাঠকের চোখ ভিজে উঠতে বাধ্য। জীবনের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে মেনে নেওয়ার এক চরম শিক্ষা দিয়ে যায় এই গল্পটি।
🎭 উল্টোনদীর বাঁকে:
উপন্যাসিকার মূল উপজীব্য হলো এক রূঢ় ও অন্ধকার জীবনের চোরাবালি থেকে উত্তরণের এক অসম লড়াই। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুবর্ণ—সমাজের চোখে যে এক 'অনামুখো' অবৈধ সন্তান—পরিস্থিতির চাপে গ্রামের এক জীর্ণ স্কুল ও পরিত্যক্ত বাড়িতে আশ্রয় নিলেও তার ভেতরে আজন্ম লালিত ঘৃণা ও অন্ধকার থেকে সে মুক্তি পায় না। নিজের সুবিধাবাদী মানসিকতা আর সুপ্ত কামনার তাড়না সত্ত্বেও গ্রামের সহজ-সরল মানুষগুলোর অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও অভাবী জীবনের সান্নিধ্যে তার ভেতরের ‘পশু’টা বারংবার কুঁকড়ে যায়। একদিকে সবকিছু বিক্রি করে পালিয়ে যাওয়ার লালসা, অন্যদিকে অবচেতন মনে 'ভদ্দরলোক' সাজার এক অদ্ভুত টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে সুবর্ণ নিজেরই এক অচেনা আয়নার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এক গভীর আত্মোপলব্ধির পথে চালিত হয়।
গল্পের মূল ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে অস্তিত্বের সংকট (Identity Crisis) এবং মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের ওপর। এই দিকটা বলা বা লেখা সহজ নয়। লেখিকা সেটাও যেন সহজভাবে বলেছেন কাহিনিতে, যা পাঠককে ধরে রাখে।
নিম্নবিত্ত মায়ের অবৈধ সন্তান হিসেবে সুবর্ণর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তাকে মানসিকভাবে রূঢ় করে তুলেছে। সমাজের বাস্তব মাটিতে এরকম মানুষ আমাদের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে রোজ, আমরা জানতেও পারি না। সুবর্ণর ভেতরে থাকা কামনা এবং বাইরের 'ভদ্রলোক' সাজার অভিনয়ের লড়াই গল্পটির একটি অন্যতম প্রধান দিক হিসেবে ধরা দিয়েছে। সমাজের বুকে ভালো থাকার মুখোশ পরে চলা কঠিন, অসম্ভব নয়; তবে তাও একসময় ক্লান্তিকর হয়ে ওঠে। নিজের সাথে লড়াই কতক্ষণ আর করা যায়?
গ্রামের মানুষের দারিদ্র্যের মাঝে যে সহজ অমায়িকতা লুকিয়ে থাকে, তা সুবর্ণর মতো কঠোর চরিত্রের মানুষের মনেও আলোড়ন সৃষ্টি করে। গ্রামের মানুষের অনড়ম্বর জীবনের সহজ-সরল মন সুন্দরভাবে চিত্রিত করেছেন লেখিকা।
'উল্টোনদীর বাঁকে' পড়তে গিয়ে মনে হয় এক অদ্ভুত অস্বস্তিকর অথচ বাস্তব সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি। গল্পের প্রধান চরিত্র সুবর্ণ মোটেই কোনো আদর্শগত নায়ক নয়, বরং রক্ত-মাংসের এক চরম বাস্তব ও ত্রুটিপূর্ণ মানুষ। তার জবানিতে যেভাবে তার কুৎসিত চিন্তাগুলো উঠে এসেছে, তা পাঠকদের চমকে দেয়। তবে লেখিকার মুন্সিয়ানা এখানেই যে, সুবর্ণর প্রতি বিরক্তি আসার পাশাপাশি তার প্রতি এক ধরণের করুণাও জাগে। গ্রামের প্রকৃতির বর্ণনা আর দারিদ্র্যের নিখুঁত চিত্রায়ন গল্পটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। এটি এমন এক গল্প যা আপনাকে ভাবাবে—মানুষ কি পরিস্থিতির শিকার হয়ে বদলে যায়, নাকি তার আসল চেহারাটাই অভিনয়ের আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে?
🍂 মনের ভাব প্রকাশ তো করেছি, কিন্তু বারংবার একটি সংশয় জাগছে—হৃদয়ের সবটুকু আর্তি কি শব্দে ফুটিয়ে তুলতে পারলাম? জানি না। তবে প্রিয় পাঠক, আপনাদের প্রতি অনুরোধ—একবার অন্তত পড়ে দেখুন। এই বইয়ের প্রতিটি চরিত্র আপনার অন্তরের গভীরে স্থায়ী বসতি গড়বে।
🕯️ আপনাদের সকলের পাঠ শুভ হোক।
শ্রদ্ধেয় দিভাই,
দিভাই, তুমি কীভাবে জানো বলো তো? কোন জাদুমন্ত্রে তুমি মানুষের মনের গহিন অরণ্যে অনায়াসে পৌঁছে যাও? এই বইমেলায় দেখা হলে, ময়দানে দেখা এক নিঃসঙ্গ মানুষের গল্প বলবো তোমায়—যাদের সমাজ আজও ভ্রুকুটি আর কুৎসিত নজরে বিদ্ধ করে, যাদের কথা বলার কেউ নেই। তুমি কি পরম মমতায় কলম ধরবে তাদের সেই না-বলা আখ্যান নিয়ে?
ইতি,
তোমারই এক অনুরাগী পাঠক (ভাই)
🌸 লেখায়~ স্নিগ্ধদেব বোস
***********************************************
এমন সুন্দর এবং দীর্ঘ পাঠ অনুভূতির জন্য জানাই আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। এই বিশ্লেষণটুকুই আমার আগামীর উৎসাহ এবং প্রশ্রয়। ভালোবাসা রইল। 🙏🥰
চিত্রঋণ : স্নিগ্ধদেব বোস। 💚