25/12/2025
Happy Christmas 🔔
এক সময় Santa মানেই ছিল দূরের কোনো বিদেশি গল্প—তুষার ঢাকা দেশ, বড়দিন, ক্রিসমাস ট্রি আর এক অদ্ভুত লাল জামা পরা বুড়ো মানুষ। ভারতবর্ষের মতো গরম দেশ, যেখানে বরফ তো দূরের কথা, শীতও অনেক জায়গায় নামমাত্র—সেখানে Santa কীভাবে এত জনপ্রিয় হয়ে উঠল? কীভাবে সে আজ শুধু খ্রিস্টান সমাজেই নয়, প্রায় সব ধর্ম, সব শ্রেণির শিশুর পরিচিত মুখ? এই জনপ্রিয়তার পেছনে আছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, বাজার, আর মানুষের আবেগ—সবকিছুর মিলিত গল্প।
Santa-র মূল উৎস অবশ্যই পাশ্চাত্য দুনিয়া। ইউরোপ ও আমেরিকার খ্রিস্টান সংস্কৃতিতে বড়দিন মানেই ছিল আনন্দ আর উপহার। ব্রিটিশ শাসনামলে এই সংস্কৃতির প্রথম প্রবেশ ঘটে ভারতবর্ষে। কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, গোয়ার মতো শহরে বড়দিন পালন শুরু হয় চার্চকেন্দ্রিকভাবে। সেই সময় Santa ছিল মূলত চার্চ আর মিশনারি স্কুলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।
কিন্তু Santa শুধু ধর্মীয় চরিত্র হিসেবে ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়নি। তার জনপ্রিয়তার আসল কারণ—সে ধর্মের সীমা ভেঙে শিশুদের আনন্দের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। Santa কাউকে ধর্ম জিজ্ঞেস করে না, জাত দেখে না, ভাষা বোঝে না—সে শুধু শিশুদের হাসি বোঝে। এই নিরপেক্ষতা ভারতীয় সমাজে Santa-কে দ্রুত গ্রহণযোগ্য করে তোলে।
এরপর আসে ইংরেজি শিক্ষা ও মিশনারি স্কুলের প্রভাব। আশির দশক ও নব্বইয়ের দশকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুল দ্রুত বাড়তে থাকে। সেখানে বড়দিনে নাটক, গান, কার্ড বানানো, Santa সেজে উপহার দেওয়া—এসব শিশুদের জীবনের অংশ হয়ে যায়। ছোটবেলা থেকেই শিশুরা Santa-কে আনন্দের সঙ্গে জুড়ে ফেলে। স্কুলের মাধ্যমে Santa ঢুকে পড়ে হাজার হাজার পরিবারের ঘরে।
তারপর এল মিডিয়া ও বিনোদনের যুগ। টেলিভিশন, বিদেশি সিনেমা, কার্টুন—সবখানেই Santa হাজির। বড়দিন এলেই টিভিতে দেখা যেত লাল জামা পরা Santa, “Ho Ho Ho” হাসি, আর উপহারের গল্প। ভারতীয় শিশুরা ভাষা না বুঝলেও ছবি বুঝত, হাসি বুঝত। Santa হয়ে উঠল কল্পনার বন্ধু।
নব্বইয়ের দশকের পর ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে Santa পেল এক নতুন পরিচয়—বাজারের তারকা। শপিং মল, ব্র্যান্ড, খেলনার দোকান, চকোলেট কোম্পানি—সবাই বুঝে গেল Santa মানে বিক্রি। ডিসেম্বর এলেই দোকানে দোকানে Santa-র টুপি, দাড়ি, গিফট প্যাক। মলগুলোতে Santa বসে ছবি তোলে, বাচ্চাদের হাতে চকোলেট দেয়। Santa তখন আর শুধু গল্পের চরিত্র নয়—সে বাস্তব অভিজ্ঞতা।
এখানেই Santa-র জনপ্রিয়তা ধর্মের সীমানা ছাড়িয়ে যায়। হিন্দু, মুসলিম, শিখ, জৈন—সব ঘরের শিশুই Santa-কে চিনতে শেখে। কারণ Santa কারও ঈশ্বর নয়, সে আনন্দের চরিত্র। ভারতীয় সংস্কৃতিতে যেমন মামা, ঠাকুরদা, দাদুর গল্পে উপহার দেওয়ার রীতি আছে—Santa সহজেই সেই জায়গা দখল করে নেয়।
আরেকটা বড় কারণ হলো—ভারতীয় বাবা-মায়ের আবেগ। বাবা-মায়েরা সবসময়ই সন্তানের মুখে হাসি দেখতে চায়। Santa সেই হাসির সহজ মাধ্যম। ধর্মীয় জটিলতা ছাড়াই সন্তানের জন্য একটা উৎসব, একটা গল্প তৈরি করে দেওয়া যায়। Santa-র মাধ্যমে বাবা-মায়েরা নিজেরাই “উপহারদাতা” হয়ে ওঠে—যা শিশুমনে গভীর ছাপ ফেলে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে Santa-র ভারতীয় রূপও বদলেছে। কোথাও তাকে দেখা যায় গেরুয়া শাল জড়িয়ে, কোথাও আবার রিকশায় বসে উপহার বিলি করতে। কিছু জায়গায় Santa গরমে ঘেমে ওঠে, তবু হাসি থামে না। এই অভিযোজন ক্ষমতাই Santa-কে ভারতবর্ষে টিকিয়ে রেখেছে। সে বিদেশি হয়েও পুরোপুরি বিদেশি নয়—সে আমাদের মতো করেই বদলে গেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে Santa আরও বেশি ছড়িয়ে পড়েছে। রিল, ছবি, স্কুল প্রোগ্রাম, অফিস পার্টি—সবখানে Santa। কেউ ধর্মীয় দৃষ্টিতে দেখে না, দেখে উৎসবের দৃষ্টিতে। Santa এখন “সিজনাল হ্যাপিনেস”-এর প্রতীক।
তবে সবচেয়ে বড় সত্যটা হলো—Santa ভারতবর্ষে জনপ্রিয় হয়েছে কারণ সে আমাদের নিজস্ব এক বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গেছে। আমাদের সংস্কৃতিতে তো আগেই ছিল ত্যাগ, দান, আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ধারণা। Santa সেই চিরচেনা ভাবনাকেই একটু ভিন্ন পোশাকে হাজির করেছে।
সবশেষে বলা যায়—Santa ভারতবর্ষে ফেমাস হয়েছে ধর্মের জোরে নয়, ভালোবাসার জোরে। গল্পের জোরে নয়, হাসির জোরে। সে বিদেশ থেকে এলেও, ভারতীয় হৃদয়ে সে জায়গা করে নিয়েছে কারণ আমরা সবাই ভেতরে ভেতরে একটা শিশু—যে এখনো উপহারের অপেক্ষা করে, একটু আনন্দ চায়।
তাই আজ Santa শুধু বড়দিনের চরিত্র নয়—
সে হলো শৈশবের সার্বজনীন আনন্দের প্রতীক,
আর এই কারণেই Santa সারা ভারতবর্ষে এত ফেমাস।
কলমে সোমনাথ ব্যানার্জি।