26/11/2024
ডিভোর্সের পর বিসিএস দিলাম।।পাশ করলাম।কলেজে জয়েন করলাম।ছ' বছর আগে বিয়ে করেছিলাম তাকে।বেকার ছিলাম।কতবার বলেছি- " বাপের বাড়ি যাও,সংসার টংসার আমার ভাল্লাগেনা।
আসলে তখন বিয়ের পর ঘরে-বাইরের মানুষজন নানান কথা শোনাত।যত রাগ যত ক্ষোভ বউ এর উপরই ঝাড়তাম। বউ আমার কখনো টু শব্দ করেনি।
'বাড়ির বউ তখনই সবার কাছে প্রিয় হয়,যখন চোখ থাকতে অন্ধ হয় আর , মুখ থাকতে বোবা হয়।না পারতাম বউকে নিজের টাকায় হিজাব কিনে দিতে,না পারতাম শখের কিছু নিয়ে আসতে।ওর কোনো অভিযোগ ছিলো না।কাগজে মুড়িয়ে ১০ টাকার খুরমা নিয়ে এলেই খুশি হয়ে যেতো।
তনু খুব করে চাইতো ও মা হবে।ওকে বলতাম-চাকরি বাকরি নাই বোঝোনা,বাচ্চা নিয়ে কি আমার বাচ্চাকে চোর বানাবো আমি।
ও চুপ করে শুনতো।
একবার ওকে বাবার বাড়ি রেখে আসলাম।যাবেই না,বাইকের পেছনে চুপচাপ বসে ছিলো সেদিন।মন ভালো থাকলে একটার পর একটা কথা বলেই যেতো।বউ আমার রাগ করেছে।ওর রাগ - অভিমানে তো আমার কিছু আসে যায়না।
আমার নানি ওকে খুব ভালোবাসতো।সন্ধায় নানি এসে বললো,'তনু মনটা খারাপ করে গেলো। তুই এখন ওর ওখানে যাহ।তাছাড়া কান্নাকাটি করবিনি'।
আমি হেসে বললাম,'ও যে পরিমাণ ছ্যাচড়া,,আমি এখন গেলেই আসার জন্য গাড়ির পেছনে উঠে পড়বে। বাপের বাড়িই থাকুক। পড়াশোনা করুক।এখানে থাকলে তো ঠিকমতো পড়াশোনা করেনা।''
তনু তখন ভার্সিটিতে প্রথম বর্ষে।.....
সেদিন রাতে বার বার ফোন করছিলো।বিরক্ত হয়ে ওর নাম্বার ব্লক করে ঘুমালাম।
সত্যিই তনু ছ্যাচড়া।কোনোরকম রাতটা একা কাটিয়েছে।পরদিন রাত পোহানোর পরই ও দেখি আমার বাড়িতে এসে হাজির।সেদিন সারাদিন ওর সাথে কথা বলিনি। রাতেও কথা বললাম না।শুয়ে আছি।ও আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।বুঝতে পারলাম ওর দু চোখই ভেজা।এক ফোঁটা পানি আমার গালে এসে পড়লো। কিছুই বললাম না। ও আমার বুকে রাখবে আর অমনি আমি অন্যদিকে মাথা ঘোরালাম। তনু আমার বুকের মাঝে জায়গা না পেয়ে পায়ের কাছে গিয়ে বসলো। আমার পা দুটো ওর কোলের কাছে নিয়ে বললো,'কি অন্যায় করেছি আসিফ,কি অপরাধ,কি ভুল আমার? ভুল যদি খুঁজেও পাও আমাকে ক্ষমা করো প্লিজ।''
আসলে ও নিজেও জানেনা ও কি ভুল করেছে।আর আমিও জানিনা কি ওর অন্যায়।। তারপর ভালোই কাটছিলো।কিন্তু দিনের পর দিন হতাশা বাড়ে।
বেকার বলে শ্বশুর বাড়িতেও পাত্তা পাইনি।তনু ওর বাবার বাড়ি থেকেও অনেক কথা শুনেছে। জামাই বেকার হলে বাবা মার কাছেও মেয়ের গুরুত্ব থাকে না এটাই স্বাভাবিক।
তনুকে আবারো বাবার বাড়ি পাঠিয়ে বললাম, -''তনু এভাবে আর হয়না।তোমারও সময় আছে, নিজের জীবন গুছিয়ে নাও।ডিভোর্স হোক প্লিজ। ''
তনু বলেছিলো,''অনেক আগলে রাখতে চেয়েছিলাম আসিফ।তোমার মতো করে কে ভালোবাসবে?কি নিয়ে ভালো থাকবো আমি? আমাকে ছেড়ে তুমিও কি ভালো থাকবে?''
কথা ঘুরিয়ে আমি বললাম- তুমি খাইছো??
কিছু না বলে তনুই ফোনটা কেটে দিলো।হয়তো ''ছেড়ে দেবো,ছেড়ে দেবো",শুনতে শুনতে বউ আমার ক্লান্ত। তারপর আর কথা হয়নি। আপোষে আমাদের ডিভোর্স হয়ে যায়।
ডিভোর্সের পর কতবার ওর সাথে দেখা হলো,ও আর আমার দিকে ফিরেও তাকাইনি।কতবার ওর ভার্সিটিতে গিয়েছি,ও আমাকে দেখেই না দেখার ভান করেছে।আবারও ওর বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালাম। নানিকেই পাঠালাম।জানিয়েছে,,জীবনের পঁচিশটা বছর কেটে গেলো বাকি দিন গুলোও কেটে যাবে।"
কদিন আগে হঠাৎ করেই ওর পথ আগলে দাঁড়ালাম। বললাম,-''পুরো পৃথিবী আমার করে পেলেও তোমার অভাবে আমি খুবই শূন্য,তনু।
আমার না হয় কোনো গুণ নেই। তোমার তো অনেক গুণ,সেই গুণেই আমাকে ক্ষমা করে দাও।ফিরিয়ে দিওনা প্লিজ। ''
তনু কিছুই বললো না।যেনো ওর সব বলা ফুরিয়ে গেছে,আর কিছুই বলার নেই। ওর চোখের কোণে দেখলাম পানি জমেছে কিন্তু ঝরে পড়েনি।নিজেকে আটকে রাখা শিখে গেছে।তনুও খুবই ব্যস্ত। হাইস্কুলে জয়েন করেছে ম্যাথের টিচার।হয়তো ওর ব্যস্ত শহরে কিংবা অবসরে আজ আর আমি নেই।
আজ দু'তলা বাড়ি আছে।দুটো গাড়ি আছে।মাসশেষে টাকা আছে।শুধু আমার তনু নেই।
পরিবার থেকে অনেকবার বিয়ের কথা বলেছে।কয়েকটা মেয়েও দেখেছি। বাবা সেদিন রাগ করে বলেই ফেললো,,মেয়ে ব্যাংকার।ভালো ফ্যামিলি।বিয়েতে তোমার আপত্তি কেন?
চুপ করে থাকলাম।একটু পর আবার বললো,,তনুকে ছাড়তে তো আমরা তোমাকে বলিনি,তুমিই ছাড়ছো।
একথা শুনেই বললাম, '''ছেড়ে দেওয়ার কথা তোমরা কেউই বলোনি বাবা, কিন্তু বাঁধা ও দাওনি।
বাবা আর কিছু বলেনি।
মেয়ে সুন্দরী।ভালো ফ্যামিলি।ব্যাংকার/ টিচার সবই ঠিক আছে। কিন্তু কারো চোখে আমার তনুকে খুঁজে পাইনি।
আসলে সবাই সবার জন্যে না।তারাও যোগ্য কিন্তু সবার প্রতি সবার ফিলিংস আসেনা।
টাইম পাস অনেক নারীর সাথেই করা যায় কিন্তু ঘরের বউ ঐ একজনই হয়।প্রথম বউকে যে যতই বলুক,,তোমার চেয়েও ভালো নিয়ে আসবো। আসলে তা আর হয়না। যায় দিন ভালো,আসে দিন খারাপ।..................…..........
আজ মা-বাবা,ভাই-ভাবি,বন্ধু-বান্ধব যে যার সংসার নিয়েই ভালো আছে। ভাঙ্গা গড়ার এ খেলায় টুপ করে ভেঙে ফেলা যায়,,,,,,,,,,,,,,গড়ে দিতেই যত বাহানা!ভুলতো আমারই!
প্রকৃতি ছাড় দেয়না। সুখের আশায়, সুখ পাখি ছেড়ে দিয়ে,সুখের খোঁজ করা,,, ভীষণ অন্যায়।
পাঠিয়েছেন
নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক এক ভাইয়া
#অনুগল্প