28/04/2022
'গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুল'
শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। শিক্ষালাভের জন্য চাই আদর্শ বিদ্যাপীঠ। একসময় শিক্ষা ছিলো আশ্রমকেন্দ্রিক। শিক্ষার্থী সেই সময় থেকেই গুরুর কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতো। আদর্শ বিদ্যালয় এক একটি আশ্রমবিশেষ। এমনই একটি আশ্রম আমার বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের নাম 'গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুল'।
গফরগাঁওয়ের শিলাসী গ্রাম নিবাসী মরহুম মৌলভী নাসিরুদ্দিন খান, ভারইল গ্রাম নিবাসী মৌলভী ছাবেদুল্লাহর প্রচেষ্টায় ১৯০৬ সালে গফরগাঁও ইসলামিয়া ইংরেজী বিদ্যালয় নামে মুসলিম শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মোচন করা হয়। রাঘাইচটি গ্রাম নিবাসী পরস্পর দুই চাচাত ভাই আহম্মদ আলী ও আবেদ আলী এবং কাজা গ্রাম নিবাসী আব্দুর রহমান, প্রথম এই তিন ছাত্র নিয়ে প্রাচীন বটতলায় (আগের মাঠের পাশে ছিল) ছাবেদুল্লাহ বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করেন। গফরগাঁও ইসলামিয়া ইংরেজী উচ্চ বিদ্যালয় নামকরণ করায়, স্কুল প্রতিষ্ঠার ব্যাপারটি তৎকালীন জমিদাররা সহজে মেনে নিতে পারেনি। ইংরেজী নাম দেয়ায় ওলামা সমাজও ধর্মের দোহাই দিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাধা প্রদান করে। ঠিক এই সময়ে আলীগড় মুসলিম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময়ে মুসলিম আন্দোলনের পক্ষে এলাকার বৃহত্তর স্বার্থে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজন ছিল। এ কারণেই মুসলিম জাতীয় নেতা নবাব সলিমুল্লাহ, খান বাহাদুর ইসমাইল, আব্দুল খালেক, মুন্সী ইব্রাহিম খান প্রমুখ বিভাগীয় পরিদর্শকের কাছে বিদ্যালয়ের পক্ষে সুপারিশ করেন। ময়মনসিংহ জেলার সহকারী প্রশাসক মিস্টার সেকসি ১৯০৮ সালে মৌলভী হালিম উদ্দিনের মক্তবটিকে একত্রিত করে, গফরগাঁও ইসলামিয়া হাইস্কুল নামে রিপোর্ট বিভাগীয় পর্যায়ে পাঠান। সে রিপোর্টের ভিত্তিতে ১৯১০ সালে গফরগাঁও ইসলামিয়া হাই স্কুলটি সরকারী অনুমোদন লাভ করে।
ময়মনসিংহের গফরগাঁও উপজেলার কেন্দ্রবিন্দুতে স্কুলটির অবস্থান। গফরগাঁও রেলওয়ে স্টেশন থেকে স্কুলটির দূরত্ব ১.১ কি.মি। গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুলের উত্তর দিকে রয়েছে গফরগাঁও থানা, দক্ষিণ দিকে রয়েছে গফরগাঁও সরকারি কলেজ এবং স্কুলটির পূর্ব দিকে রয়েছে ব্রহ্মপুত্র নদ।
আমাদের বিদ্যালয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের গাছ এবং একটি 'বঙ্গবন্ধু পুষ্পকানন'। স্কুলটিতে রয়েছে সবুজ ঘাসে আবৃত একটি বিশাল মাঠ। মাঠের পশ্চিম দিকে রয়েছে 1906 সালে স্থাপিত প্রাগৈতিহাসিক ভবন এবং দক্ষিণে দুতলা বিশিষ্ট ভবন এবং নির্মানাধীন ৬ তলা বিশিষ্ট আরও একটি ভবন।
ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত স্কুলটিতে মোট সহস্রাধিক শিক্ষার্থী রয়েছে।
এছাড়াও আমাদের স্কুলে রয়েছে একটি আই.সি.টি ল্যাব, একটি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম, একটি বিজ্ঞানাগার এবং একটি পাঠাগার। পাঠাগারটি দীর্ঘদিন যাবৎ বন্ধ থাকার পর আমাদের স্কুলের স্কাউট সদস্যদের উদ্যোগে, শ্রদ্ধেয় আবু সাঈদ স্যারের সহযোগিতায় পুনরায় চালু হয়েছে।
সময়ের পরিক্রমায় আট দশক পর বিদ্যালয়টি জাতীয়করণ করা হয় ১৯৮৫ সালের ১ জুন। বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক ছিলেন বাউল চন্দ্র বসাক। স্কুলটি জন্মলগ্ন হতেই লেখাপড়া, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করে আসছে।
আমাদের বিদ্যালয়ের বর্তমান প্রধান শিক্ষক হচ্ছেন শ্রদ্ধেয় আবুল কাশেম স্যার। শ্রদ্ধেয় শিব্বির আহমেদ স্যার বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই স্কুলটি ক্রমশ উন্নত হচ্ছে।
আমাদের স্কুলের উল্লেখযোগ্য শিক্ষকমণ্ডলীরা হচ্ছেন,
আবুল কাশেম স্যার,
শহিদুর রহমান স্যার,
আবু সাঈদ স্যার,
মাজাহারুল ইসলাম স্যার,
রাশিদুজ্জামান স্যার,
আসাদুজ্জামান স্যার
মিজানুর রহমান স্যার,
মতিউর রহমান স্যার,
আফরোজা ম্যাম,
রোকসানা ম্যাম,
সাইফুল স্যার,
বিপ্লব স্যার,
আমিত দাস স্যার,
সোহেল স্যার।
স্কুলের ছাত্রদের আস্থাভাজন হাশেম চাচা, হুমায়ুন ভাই, রতন ভাই! কাগজ-পত্র সংক্রান্ত সব ব্যাপারে উনারা আমাদের সর্বোচ্চ সহায়তা করেন।
১৯৯৭ সালে কাবাডিতে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন, ২০০১ সালে ইন্টার স্কুল প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন, ২০০৫ সালে বাংলালিংক আয়োজিত স্কুল প্রতিযোগিতায় কুমিল্লা স্টেডিয়ামে রানার্সআপসহ ক্রীড়া ও সংস্কৃতি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে বিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবছর সাফল্যের পুরস্কার এনেছে। এমনকি অ্যাথলেটিক্সের প্রত্যেক টা খেলাতেই জাতীয় পর্যায় খেলার সুনাম অর্জন করেছে। ২০০৮ সালে দৌড় প্রতিযোগীতায় স্কুলের ছাত্র মোহাম্মদ বাহার উদ্দিন সারা বাংলাদেশ সুনাম অর্জন করেছে। এমনকি অর্জন করেছে জাতীয় স্বর্ন। বিদ্যালয়টি থেকে পাস করা হাজার হাজার ছাত্র আজ দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রতিষ্ঠিত।
এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছেন এমন বিখ্যাত কয়েক রাজনীতিবিদের মধ্যেঃ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মুখ্যমন্ত্রী নুরুল আমিন, পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী শ্রী সত্যপ্রিয় চক্রবর্তী, সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের রাজস্ব মন্ত্রী শ্রী ফখরউদ্দিন আহম্মেদ ও স্কুল কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী, সেক্রেটারি খান বাহাদুর ইসলাম যার নামে গফরগাঁও-ময়মনসিংহ সড়ক (খান বাহাদুর ইসমাইল রোড), পাকিস্তানের সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন পাঠান। তৎকালীন এই বিদ্যালয়ে কয়েক কৃতী ছাত্রের মধ্যে রয়েছেন পূর্ব পাকিস্তানের প্রাক্তন মন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন পাঠান, পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ উপ-সচিব আশরাফ মোমেন। এ ছাড়া রয়েছেন ডা. এম এ হাদী, আমৃত্যু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করে গেছেন। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের একজন কৃতী ছাত্র ছিলেন। ডা. আবুল বাশার বর্তমানে ঢাকা ন্যাশনাল হাসপাতালের পরিচালক, ডা. সাইদুর রহমান (তারেক), ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুল আলম উপ-পরিচালক (অব) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা, মোঃ ফসি উল্লাহ(মহাপরিচালক, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর), মীর নজরুল ইসলাম(অতিরিক্ত সচিব), জামিল আহমেদ (ডিআইজি), আব্দুল্লাহ হিল বাকি (এআইজি), মোস্তাফিজুর রহমান (এ আই জি)।
আমাদের স্কুলের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছরই পরীক্ষায় ভালো ফল অর্জন করে। জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষার ফল সবার দৃষ্টি কাড়ে। আমাদের বিদ্যালয়টি গফরগাঁও উপজেলার অন্যতম সেরা স্কুল।
একটি আদর্শ বিদ্যালয় বলতে যা বোঝায়, আমার বিদ্যালয় তা-ই। মনোরম পরিবেশ, জ্ঞানী-গুণী শিক্ষক আর সেরা ফলাফলের জন্য আমাদের বিদ্যালয় অতুলনীয়। এ প্রতিষ্ঠানের একজন শিক্ষার্থী হতে পেরে আমি নিজেকে ধন্য মনে করি।
আমাদের বিদ্যালয় সবসময় সেরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হোক— এটাই আমার প্রত্যাশা।
ভাগাভাগি করে খাওয়া চানাচুর-ঝালমুড়ি কিংবা স্যারদের কাছ থেকে পাওয়া স্নেহ-মমতা-শাসন! হাজারো প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির সাক্ষী আমার স্কুল।
ভালোবাসার প্রিয় 'গফরগাঁও ইসলামিয়া সরকারি হাইস্কুল' ❤
লেখা ও ছবি:
মোরসালিন খান প্রান্ত, GIGHS 2022 Batch