28/12/2025
"সোনালী ক্যারিয়ার না থাকলে পুরুষের প্রেম ভালোবাসা মূল্যহীন"!
আজকের সমাজে এই উক্তিটি অনেকটা তিক্ত সত্যের মতো শোনায়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালি সমাজে, যেখানে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং ক্যারিয়ারের সাফল্য পুরুষের পরিচয়ের একটি বড় অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। "সোনালী ক্যারিয়ার" বলতে আমরা বুঝি একটি উজ্জ্বল, স্থিতিশীল এবং সম্মানজনক পেশা – যা শুধু আয় নয়, সমাজে মর্যাদা এবং নিরাপত্তাও এনে দেয়। এই উক্তির আলোকে বিস্তারিত আলোচনা করলে দেখা যায়, এটি শুধু একটি কথার কথা নয়, বরং সমাজের গভীর বাস্তবতা, লিঙ্গভিত্তিক প্রত্যাশা এবং অর্থনৈতিক চাপের প্রতিফলন।
✅ প্রথমত, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এই উক্তি অনেকাংশে সত্য। বাঙালি সমাজে (বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে) পুরুষকে ঐতিহ্যগতভাবে পরিবারের "প্রোভাইডার" হিসেবে দেখা হয়। একজন পুরুষের ভালোবাসা বা প্রেম তখনই "মূল্যবান" বলে মনে হয় যখন তার পিছনে অর্থনৈতিক সক্ষমতা থাকে। টাকা না থাকলে প্রেম "জানালা দিয়ে পালায়" – এমন প্রবাদ প্রচলিত আছে। অনেক উক্তিতে দেখা যায়: "অর্থহীন পুরুষ সমাজের কাছে মূল্যহীন, যতই সে চরিত্রবান হোক" অথবা "টাকা না থাকলে প্রেমেও পুরুষকে ছোট করে দেখা হয়"। এটি hypergamy-র একটি রূপ – যেখানে নারীরা (সচেতন বা অসচেতনভাবে) এমন পুরুষকে পছন্দ করেন যার শিক্ষা, চাকরি বা আয় তাদের সমান বা তার চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের বিয়ের বাজারে এটি স্পষ্ট: ভালো ক্যারিয়ারহীন পুরুষের জন্য যৌতুকের দাবি কম হয়, কিন্তু সম্মানও কম। ফলে, একজন পুরুষের প্রেম যদি সোনালী ক্যারিয়ারের ছায়ায় না থাকে, তা প্রায়শই "অসম্পূর্ণ" বা "অবাস্তব" বলে গণ্য হয়।
✅ দ্বিতীয়ত, বাস্তব জীবনের উদাহরণে এই উক্তি আরও স্পষ্ট হয়। আজকালকার সমাজে প্রেম বা বিয়ের সম্পর্কে অর্থের ভূমিকা অস্বীকার করা কঠিন। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, অর্থনৈতিকভাবে স্বচ্ছল দম্পতিরা বেশি সুখী। টাকা না থাকলে পরিবারের চাহিদা পূরণ হয় না, ভবিষ্যতের নিরাপত্তা থাকে না – ফলে প্রেমের মধুরতা হারিয়ে যায়। পুরুষের ভালোবাসা প্রকাশ পায় তার কাজে, দায়িত্বে – কিন্তু যদি ক্যারিয়ার না থাকে, তাহলে সেই দায়িত্ব পালন করা কঠিন। অনেক নারী (এবং তাদের পরিবার) মনে করেন, ভালোবাসা থাকলেও অর্থ ছাড়া সম্পর্ক টিকবে না। এটি শুধু বাংলাদেশ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক সমাজেই দেখা যায় – যেখানে পুরুষের আকর্ষণীয়তায় financial success একটি বড় ফ্যাক্টর।
✅ তবে, এই উক্তির অন্ধকার দিকও আছে। এটি পুরুষদের উপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে – যেন তাদের মূল্য শুধু ক্যারিয়ারে নির্ধারিত। চরিত্র, সততা, ভালোবাসার গভীরতা – এগুলো কি সত্যিই মূল্যহীন? না, অবশ্যই না। অনেকে বলেন, সত্যিকারের প্রেম টাকা-পয়সা বা চেহারা দিয়ে হয় না, মন থেকে হয়। পুরুষের ভালোবাসা নীরব, গভীর – যা কাজে প্রকাশ পায়, না কথায়। যদি ক্যারিয়ার না থাকে, তবু যে পুরুষ নিজের সাধ্যমতো চেষ্টা করে, সে-ই প্রকৃত প্রেমিক। সমাজের এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনশীল – আজকের যুগে অনেক নারী নিজেরা ক্যারিয়ার গড়ছেন, ফলে প্রেমের মানদণ্ডও বদলাচ্ছে।
✅ উপসংহারে বলা যায়, এই উক্তি সমাজের একটি কঠোর বাস্তবতাকে তুলে ধরে, কিন্তু এটি পুরো সত্য নয়। সোনালী ক্যারিয়ার প্রেমকে সহজ করে, নিরাপদ করে – কিন্তু প্রেমের মূল্য নির্ধারণ করে না। সত্যিকারের ভালোবাসা অর্থের ঊর্ধ্বে, যা চরিত্র, বিশ্বাস এবং সমর্থনে টিকে থাকে। তবু, বর্তমান সমাজে পুরুষদের জন্য সোনালী ক্যারিয়ার গড়া শুধু সাফল্য নয়, প্রেমকে মূল্যবান রাখার একটি উপায়। এই উক্তি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে: প্রেম কি শুধু হৃদয়ের, নাকি সমাজের নিয়মে বাঁধা?
📩
#সময়শেষ