27/07/2025
প্রত্যেকটি শব্দের প্রথম ‘ক’ বর্ণ গল্পটির লেখক স্বর্গীয় সুধাংশু নাথ মন্ডল, ডাকঘর-তারাপুর, উপজেলা-সুন্দরগঞ্জ, জেলা-গাইবান্ধা।জন্ম ০১ অক্টোবর ১৯৪০খ্রিস্টাব্দ। ১৯৫৯সালে ইস্ট পাকিস্তান সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড, ঢাকা থেকে ম্যাট্রিকুলেশন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৬২সালে আই. এ, ১৯৬৬সালে বি. এ. এবং ১৯৭৯সালে বি. এড. ডিগ্রি লাভ। ২০০০সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ঘগোয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে অবসর গ্রহণ। শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেয়ার তিনি বিভিন্ন লেখালেখির সঙ্গে নিজেকে জড়িয়ে ফেলেন। আর তাঁর লেখালেখিতে ফুটে উঠত সমাজের বিভিন্ন ধরনের কুসংস্কার, ধর্মীয় রীতিনীতি, জানা-অজানা তথ্য, এছাড়া হিন্দুধর্মীয় নানা ধরনের জানা অজানা তথ্যের সমন্বয়ে বই।‘ক’ বর্ণ তাঁর ছাত্রাবস্থায় লেখা এবং সেটি ১৯৬৩খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘‘পাকিস্তান খবরে” প্রকাশিত হয়েছিল।তিনি ০৪অগ্রহায়ন, ১৪২৬বঙ্গাব্দ (২২নভেম্বর, ২০১৯খ্রি.)বৃহস্পতিবার রাত ১.২০মিনিটে ইহলোকের মায়া-মমতা ত্যাগ করে পরলোক গমন করেছেন(ওঁ দিব্যান্ লোকান্ স-গচ্ছতুঃ)।.......................................................
কোম্পানীর কর্তার কুমতলব
কারমাইকেল কলেজের কিছু কাছে কলম্বো কেমিকেল কোম্পানীতে কেশরী কান্ত কাজ করিত। কতকাল কেশরী কান্ত কাজ করিয়াছে কিন্তু কখনই কেহ কেশরীকে কু-কথা কহে নাই। কোম্পানীর কর্মকর্তারাও কখনো কেশরীর কর্ত্তব্য কর্মের কুনাম করিত না। কিন্তু কার কপালে কী? কে কহিবে?
কেশরী কান্তের কুটিরে কেবল কুসম কোমল কুমারী কন্যা কমলা। কমলার কেশান্ত কটিতে, কমনীয় কায়, কুরঙ্গ-কটাক্ষ, কণ্ঠ কিন্নরীর। কোকিলের কণ্ঠও কমলার কাছে কদর্য। কেহ কেহ কাব্য করিয়া কমলাকে কুমুদিনী কহিত। কেহ বা কৌতুক করিয়া কিংকিনি কহিত।
কমলার কমনীয় কান্তির কথা কহিলাম। কর্ম কুশলতার কথা কহিতেছি। কমলা কেশরী কান্তের কর্মঠা কন্যা। কেশরী কান্তের কারণে কখনই কাল কাটাইত না। কমলা কুঠার করে কাননে কান্তারে কাঠ কাটিত। কাষ্টতক্ষক কিছু কড়িতে কমলার কাঠ ক্রয় করিলে কমলা কাঠের কড়িতে কলা, কদু, কুমড়া, কলাই ক্রয় করিত। কিন্তু কেবল কাঠের কড়িতে কমলা কতই ক্রয় করিবে? কুন্তলে ক্লিপ, কোমরে কাপড়, কর্ণে কুন্ডল, করে কাঁকন কণ্ঠে কণ্ঠি কবরীতে কাঞ্চনকাঁটা ক্রয় করা কায় ক্লেশেও কমলার কষ্টকর। কারণ কমলা কোমলাঙ্গী কুমারী। কমলার কণ্ঠী, কÐল, কাঁকন ক্রয় করা কেশরী কান্তেরও কষ্টকর, কারণ কেশরী কেবল কুড়ি কাহন কড়ির কারণে কোম্পানীতে কাজ করিত। কমলা কেশরী কান্তের কাছে কাঞ্চন কাঁকনের কারণে ক্রন্দন করিলে কেশরী কহিত, ‘‘ক্রন্দন করিও না; কাঞ্চন কি কখনো কুশ্রীকে কমনীয় করে?
কিয়দ্দিন কাটিলে কোম্পাণীর কর্মীরা কমলার কথা কানাকানি করিল। কেহ কেহ কহিল, কমলা কুলটা; কেহ কেহ কহিল, কাননে কাঠ কাটিলেই কি কেহ কাহাকেও কুলটা কহে? কোন কর্মী কমলার কুকথা কহিল, কোন কর্মী কেশরী কান্তের কারণে কহিল না। কাজেই কর্মীতে কর্মীতে কোন্দল করিল। কোম্পানীর কর্তা কর্মীদের কোন্দলের কথা কর্ণে করিয়া কেশরীকে কহিল, কেশরী, ক্রন্দন করিও না। কমলা কুৎসিত কাজ না করিলে কুজনে কুকথা কহিয়া কী করিবে?
কিন্তু কোম্পানীর কর্তাও কুমতলবী। কলিকার কল্যাণেকাহাকেও কেয়ার করিত না। কমলার কলঙ্কের কথা কর্ণে করিয়া কমলাকে করায়ত্ত করিবার কারণে কুটিল কৌশল করিল। কেশরীকে কহিল, কেশরী, কয়েকটা কাজের কথা কহিতাম। কেশরী কহিল কি কথা? কর্তা কহিল, ‘‘কমলা কাননে কাঠ কটিলে কেহ কেহ কুকথা কহিবেই। কোম্পানীতে কাজ করিলে কেহ কোন কথা কহিবে না, কাজেই কমলাকে কিছু কালের কারণে কোম্পানীতে কাজ করাইব। কাজ কেবল-কাপড়কাঁচা, কুন্তলে কলপকরা। কাঞ্চনের কারণে কোনই কষ্ট করিবে না। কেহ কোন কথা কহিবেও না।
কেশরী কান্ত কর্তার কথায় কর কচলাইতে কচলাইতে কহিল, ‘‘কি করিবেন করুন।’ কর্তা কহিল, ‘কালই কমলাকে কাজ করাইব। কাজেই কিছু কড়ি করায়ও কর।’ কেশরী কড়ি করায়ও করিল।
কিম্ভূতকিমাকার কর্তার কয়েকটা কুকর্মের কথা কমলা কর্ণে করিয়াছিল। কাজেই কেশরী কমলাকে কর্তার কাজ করার কথা কহিলে কমলা কোন কথাই কহিল না। কেশরী কহিল, ‘কাননে কাঠ কাটিলে কেহ কেহ কুকথা কহিবেই; কিন্তু কর্তার কাজ করিলে কেহ কোন কথা কহিবে না।
কমলা কল্পনা করিল, ‘কাননে কাঠ কাটাও কঠিন কর্তার কাজ করাও কঠিন, কাজেই কি করিব? কুনাম না কিনিয়া কর্তার কাজই করিব।’
কর্তার কাজ করিয়া কমলা কিছুকাল কাটাইল। কিন্তু কর্তার কুদৃষ্টিতে কমলা কত কাল কাটাইবে? কর্তার কটাক্ষপূর্ণ কুকথা ও কদর্যময় কার্যকলাপের কারণে কমলা কখনো কখনো কাঁদিত। কাঁদিতে কাঁদিতে করযোড়ে কর্তার করুণা কামনা করিত। কিন্তু কর্তা কুকর্মের কমতি না করিয়া কেবলই কুভঙ্গি করিত কিংবা করাঙ্গুল কাত করিয়া কুকাজের কথা কৌশলে কহিত। কমলা কিংকর্তব্যাবস্থা কাটাইয়া কাঁদিতে কাঁদিতে কেশরীকে কহিল, ‘কর্তার কাজ করিব না।
কেশরী কমলার কথা কর্ণে না করিয়া কহিল, ‘কাজ না করিয়া কী কচু কাটিবে?’ কমলাকে কাজ করাইলই।
কুমতলবী কর্তা কথায় কথায় কমলাকে কত কি কহিত। কিন্তু কমলা কোন কথা না কহিয়া কেবলই কাঁদিত। কর্তা কখন কখন কমলাকে কাব্য করিয়া কহিত-
কতেক কাহনে কিনিনু কলিঙ্গা
কলপ করিয়া কেশে
কদর করিয়া না কহিলে কথা
কুকিলা কহিব কিসে?
কখন কখন কহিত, কপোত কপোতী করিতেছে কেলি
কাব্য কুঞ্জ কাননে।
কিসের কারণে কেতকী কাঁপিছে
কহিবে না কানে কানে?
কমলা ক্রোধে কাঁপিতে কাঁপিতে কাংস্য কণ্ঠে কত কটু কাটব্য কহিত কিন্তু কর্তা কর্ণে করিত না।
কিছুকাল কাটিলে কার্তা কি কুকর্ম করিল ক্রমে ক্রমে কহিতেছি। কোনদিন কমলার কক্ষে কমলা করজোড়ে কৃষ্ণের কৃপা কামনা করিয়া ক্রন্দন করিতেছিল। কর্তা কমলার কাছে কাছাইয়া কেশাকর্ষণ করত: কুকর্মের কথা কহিল। কমলা কক্ষ কাঁপাইয়া ক্রন্দন করিলে কক্ষের কাছেই কর্মরত কেশরী কমলার ক্রন্দন কর্ণে করিয়া কাল না কাটাইয়া কমলাকে কর্তার কবল কাটাইয়া কিড়মিড় করিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে কর্তাকে কয়েকটা কিল কিলাইল। কেশরী কান্ত কহিল, কৃষিকাজ করিয়া, কাঠ কাটিয়া, করীষ কুড়াইয়া, কয়লা কুড়াইয়া কাউনিয়ার কুটিরেই কাল কাটাইব; কিন্তু কোম্পানীর কাজ করিব না।’
কালক্ষেপ না করিয়া কেশরী কলম্বো কোম্পানীর কাজকে কুর্ণিশ করিয়া কাউনিয়ার কাছেকার কল্লোলিনী কূলে কুটির করিয়া কাল কাটাইতেছিল। কর্তা কিন্তু কমলার কারণে কম করিল না। কেশরী কান্তকে কয়েদ করিবার কুমতলব করিল। কোম্পানীর কাগজ, কয়েক কাহন কড়ি , করায়ত্ত করার কারণে কৌশলে কেশরীকে কয়েদ করিল।
কেশরী কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল; কমলা কিছু কর না কর, কর্তার কোন কাথায় কর্ণপাত করিও না। কারাগারে কেশরী কেবলই কপালে করাঘাত করিত ও কলিজার কন্যা কমলার কথা কহিতে কহিতে কাতরাইত।
কমলাও কপালে করাঘাত করিয়া কেবলই ক্রন্দন করিত। কিছুকাল কাটিলে কমলা কল্লোলিনী কূলে কলসী কাছে করিয়া কাপড় কাঁচিতেছিল। কর্তা কাছে কাছাইয়া কহিল, ‘কমলা, কেশরীকে কয়েদ করিয়াছি। কহ কথামত কাজ করিবে কি না? না করিলে কী করিব কহিতেছি, কু-কথায় কলঙ্কিত করিয়া কপালে কালির কষি কাটিয়া কলিকাতার কালীঘাটের কাছেকার কদর্য কলোনীতে কুকাজ করাইব।
কর্তার কু-কথাটি কর্কশ কুলীশবত কমলার কর্নকুহর কাটাইয়া কলিজাকে কষ্টদায়ক কাঁপুনিতে কাঁপাইল। কমলা ক্রোধান্বিত কণ্ঠে কহিল, কান-কাটা কুকুর, কুল কন্যাদের কলঙ্কিত না করিলে কি কুমতলব কমিবে না? কহিয়া কাঁপিতে কাঁপিতে কাছের কলসী করে করিয়া কর্তার কাপালে কষাঘাত করিল। কর্তা কোঁ কোঁ করিতে করিতে করযোড়ে কাকুতি করিল। ক্রোধান্বিত কমলা কণ্টকিত কুরবক করে করিয়া কুরবকের কোপে কর্তাকে কোপাইতে কোপাইতে কুপোকাত করিল।