12/04/2025
‘আমরাই (বাংলা) সাগরের অভিভাবক’ কথাটার আসল অর্থ কী, অথবা কীভাবে ড. ইউনূস ভারতের খেলা ভারতের দিকেই ঘুরিয়ে দিয়েছেন
ড. ইউনূস ভারতের সাতবোন রাজ্য নিয়ে যা বলেছেন, সেই কথাটাই জাপানের প্রধানমন্ত্রী ইশিবা ২০২৩ সালের মার্চে ভারত সফরের সময়ে বলেছিলেন। বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা বেইজিং সফরে গিয়ে বলেছেন ভারতের ল্যান্ড-লকড সাত রাজ্যকে সাগরের সাতে যুক্ত করতে পারে বাংলাদেশ। এতে ভারতের আপত্তি তো নাই-ই, বরং এটাই তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।
কিন্তু স্বপ্নটাকে দুঃস্বপ্ন করে দিচ্ছে ‘ল্যান্ডলকড’ কথাটা না। ড. ইউনূস যদি ‘আমরাই সাগরের অভিভাবক’ কথাটা না বলতেন, ভারতের কোনো অসুবিধা ছিল না। কিন্তু ‘আমরাই সাগরের অভিভাবক’ (We are guardian of the ocean) ঘোষণা সরাসরি ভারতের সাগর নীতির [Security and Growth for All in the Region (SAGAR)] বিরুদ্ধে।
সাগর নীতির অধীনে জাপান-ভারত মিলে কাজ করছিল ভারত মহাসাগরে চীনকে ঠেকাতে বঙ্গোপসাগরে ওপর ভারতীয় কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করায়। জাপানি প্রধানমন্ত্রীর ২০২৩ সালের সফরে ভারত-জাপান সম্পর্কের চারটি খুঁটি বা পিলারের ৩ নম্বরের মূল কথা ছিল, ‘(the Bay of Bengal-Northeast India industrial value chain concept in cooperation with India and Bangladesh etc.) এজন্যই চীনের পক্ষ থেকে সোনাদিয়ায় গভীর সমুদ্রবন্দর প্রকল্প ঠেকিয়ে হাসিনাকে দিয়ে জাপানের অর্থায়নে মাতারবাড়িতে একটা বন্দর তৈরি করা হয় বিশেষজ্ঞদের মতের বিরুদ্ধে গিয়ে।
জাপান ভারতের সাত রাজ্যের উন্নয়নে অনেক দিন ধরে কাজ করছে। তারই অংশ হিসেবে তারা বাংলাদেশের মাতারবাড়িতে বন্দর বানিয়েছে। বিপুল খরচে কর্ণফুলী টানেল বা ‘বঙ্গবন্ধু’ টানেল বানানো বাংলাদেশের জন্য অপচয় হলেও ভারতের জন্য সেটা মাতারবাড়ি বন্দরকে সাত রাজ্যের সাথে যুক্ত করার জন্য জরুরি। যাহোক, হাসিনার পতন না হলে জাপান-ভারত মিলে ভূমিতে করিডর আর সাগরে বন্দর-সংযোগ দিয়ে সাত রাজ্যের ভূবন্দি দশা কাটাতো। এমনকি চীন বিরোধী কোয়াডে ব্যবহৃত হতো বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা। এতে সর্বনাশ হয়ে যেত বাংলাদেশের।
ড. ইউনূসের প্রস্তাবে নতুন কথা এটাই যে, সাত রাজ্যকে এই সুবিধা দেওয়া হবে বটে, তবে তার মালিকানা থাকবে বাংলাদেশের হাতে। ভারত চটেছে এই জায়গাটাতেই। ভারত করিডর ও বন্দর নিয়ে এবং এগুলি হাতে রাখার জন্য বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদী শাসনে বন্দি করে দাস হিসেবে ব্যবহারের ভূরাজনীতি করতে চাইতেই পারে। কিন্তু বাংলাদেশ তো আত্মহত্যা করতে পারে না। তারপরও ড. ইউনূসের ভাষা দেখুন, তিনি ভূরাজনীতির ভাষা ব্যবহার করেন নি, তিনি ব্যবহার করেছেন অর্থনৈতিক পরিভাষা।
ভারতের স্বার্থ হাসিলে বাংলাদেশকে বলি দিতেও রাজি ছিলেন শেখ হাসিনা। এবং ভারত যা চায় তা দেবার ক্ষমতা একমাত্র হাসিনার ফ্যাসিস্ট সরকারেরই ছিল।
এই ব্যাপারটা না বুঝলে ভারতের বেচারাম দশা বা মরিয়াপনা বোঝা যাবে না।
ভারত বাংলাদেশকে দখল করে ভারতের অংশ করতে চায় না। এটা তার জন্য আত্মঘাতী হবে। মুসলমান হিসেবে ১৭ কোটি বাংলাদেশি ভারতের নাগরিক হওয়া মানে আবার বাংলা বিহার আসাম ত্রিপুরা জুড়ে আলীবর্দীর বাংলা সালতানাত কায়েম হবে। তাও যদি না হয়, তাহলে ভারতের মুসলিমরাসিহ বাংলাদেশি মুসলিমরাই ঠিক করবে কে শাসন করবে দিল্লি। আবার ১৮ কোটি বাঙালি হিসেবেও যদি ভারতভুক্তি হয়, তাহলে বাঙালিরাই হবে একক বৃহত্তম জাতি এবং দিল্লি চলে যাবে তাদরে নিয়ন্ত্রণে। সুতরাং মুসলমান বা বাঙালি কোনো পরিচয়েই আধিপত্যবাদী ভারত বাংলাদেশিদের ভারতে নেবে না।
বরং সে চাইবে চারিদিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে বাংলাদেশের প্যালেস্টানিকরণ। তারা দেশেটার বুক চিরে সামরিক ও বাণিজ্যিক যাতায়াত করবে, সেটার পাহারাও দেবে তাদের বাহিনী। ক্রমশ বাংলাদেশের একটা অংশকে পশ্চিম তীর আর আরেকটা অংশকে গাজা বানাবে। বাংলাদেশ তাদের চোখে একটা ল্যান্ডম্যাস, এর বন্দর, এর সাগর, এর আকাশ এর মাটি তারা ব্যবহার করবে দেশের মানুষকে দমনের মাধ্যমে।
কোনো নির্বাচিত সরকার এই সুযোগ ভারতকে দেবে না। দেবে শুধূ ভারতের হাতে জিম্মি শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনার না দিয়ে উপায়ও ছিল না। ভারত যেহেতু কোনো রকম বৈধ উপায়ে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব কিনতে বা ভাড়া নিতে পারবে না, সেহেতু হাসিনা স্টাইলের শাসক ছাড়া তার সাত রাজ্যের নিরাপত্তা থাকবে না।
ভারতের সাগর নীতিসহ যাবতীয় নীতির অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য এটাই। এজন্যই তাদের সংখ্যালঘু নিপীড়নের গল্প বানাতে হয়, নাশকতা সাজাতে হয়, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে হয়, শেখ হাসিনাসহ হাজার হাজার লুটেরা ও খুনীকে ভারতে রেখে পুষতে হয় এই আশায় যে, একদিন তাদের পুশ করে আবার তারা বাংলাদেশে ও বঙ্গোপসাগরের মালিকানা নেওয়া শুরু করবে। দুনিয়ার কেউ মানবে যে, আমি তোমার ভেতর দিয়ে যাব-আসব আবার আমি তোমাকে দমনও করবো কিন্তু তুমি ‘আহা উহুও করতে পারবা না। আমাদের মুখ বন্ধ করতেই তারা ‘মুক্তিযুদ্ধ, অসাম্প্রদায়িকতা, সেকুলারিজম ইত্যাকার ঠুলি পরাতে চায় চোখে, জবান বন্ধ করতে চায়। ভারতের যাবতীয় বুলিবাগীশতার তলার আসল কথাটা হলো তারা করিডর ও বন্দর পেতে চায়। ইঊনূস সেই আসল জায়গাটাতেই হাত দিয়েছেন।
‘আমরাই (বাংলা) সাগরের অভিভাবক’ কখন থাকতে পারবো? যখন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মালিকানা এর জনগণের হাতে থাকবে। এখন দেখার বিষয়, তিনি কীভাবে একই সাথে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রকে সামলে বাংলাদেশের স্বার্থ বাঁচাতে পারেন।
ড. ইউনূস ভারতের খেলা ভারতের দিকেই ঘুরিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলছেন, আসো সুযোগ নাও কিন্তু মনে রাখবা তোমরা গ্রাহকমাত্র মালিক নও। বাংলাদেশের টাকায় পদ্মা সেতুসহ সারাদেশের যাবতীয় অবকাঠামো প্রকল্প তৈরি করা হয়েছিল জাস্ট ভারতের ট্রানজিট-করিডর চালু করবার জন্য—আপনার গাড়ি বা মটর সাইকেল হাঁকাবার জন্য না, ঈদে স্বস্তিতে বাড়ি যাবার জন্য না। ভারত এসব শুধু মাগনাই খেতে চায়নি, তাদের খাওয়ার বাধা অপসারণে বাংলাদেশকে ফ্যাসিস্ট শাসনে বন্দি রাখতে চেয়েছিল। আগস্টের অভ্যুত্থান সেই মওকাটা মাত করে দিয়েছে।
এবং আবারো বলি, বাংলাদেশ কোনোভাবেই ভারতবিরোধী বা কারো বিরোধী না। নেগেটিভ ব্র্যান্ডিং আমাদের কাজে আসবে না। আমরা অ্যান্টি না, আমরা প্রো। আমরা বাংলাদেশপন্থী। যেসব লোক আপনাদের নেগেটিভ রাজনীতি ও অ্যানার্কির দিকে ঠেলতে চায় তারা বাংলাদেশপন্থী না।