21/11/2025
কেন আজকের কম মাত্রার ভূমিকম্প এত স্পষ্ট টের পেলাম?
আজ সকালের ঝাঁকুনিটা হঠাৎ মনে করিয়ে দিল ১০ বছর আগের একটা দুপুরের কথা।
২০১৫ সাল। নাটোরের তেবাড়িয়া বাইপাস রোডে মোটরসাইকেল চালাচ্ছি। হঠাৎ মনে হলো, রাস্তা দু’দিকে দুলছে। প্রথমে সন্দেহ জাগল, আমি নৌকা চালাচ্ছি, না মোটরসাইকেল? আমারই বোধহয় মাথা ঘুরছে। তারপর বুঝলাম, না – সত্যি সত্যিই রাস্তার সঙ্গে আমিও দুলছি। তাড়াহুড়ো করে মূল সড়ক ছেড়ে পাশের সরু গলিতে ঢুকে এক আমবাগানের ভেতর গিয়ে দাঁড়ালাম। চারদিক থেকে মানুষ দৌড়ে বেরিয়ে আসছে ঘর থেকে। কারও কোলে শিশু, কেউ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে কী হচ্ছে তা বোঝার চেষ্টা করছে। আমার ভেতরের কাঁপুনিটাই শুধু থামেনি অনেকক্ষণ।
পরে জানলাম, সেটা ছিল ২০১৫ সালের ২৫ এপ্রিলের নেপাল ভূমিকম্পের ঢেউ; প্রায় ৭.৮ মাত্রার, কেন্দ্র গোরখা অঞ্চল, বাংলাদেশ থেকে অনেক দূরে। কাগজে-কলমে বিশাল ভূমিকম্প, কিন্তু দূরত্ব আর গভীরতার কারণে আমাদের এখানে এসে কম্পন তুলনামূলকভাবে নরম হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু নরম সেই দুলুনিটাই যা ভয় পাইয়ে দিয়েছিল, স্মরণ হলেই আত্মা শুকিয়ে আসে।
এরপর এই দশ বছরে যতগুলো ভূমিকম্প টের পেয়েছি, বেশির ভাগই ছোট ঝাঁকুনির মতোই লেগেছে। কিন্তু আজকেরটা আবার সেই পুরনো ভয়টাকে জাগিয়ে তুলল।
আজ আমি ঘরে বসে চেয়ারে, কম্পিউটারে গেম খেলছি। হঠাৎ মনে হল, চেয়ারের নিচের মেঝেটা দুলে উঠল। কয়েক সেকেন্ডের জন্য সবকিছু যেন ভেসে গেল। উঠে বসে চারপাশ দেখলাম, সত্যি। পরে আরও দু–একটা আফটারশকও টের পেলাম। কি প্রস্তুতি নিব ভাবছিলাম।
আজকের ভূমিকম্পের মাত্রা খুব বড় ছিল না, প্রায় ৫.৬। তবুও কেন এটা ঢাকাসহ দেশের এত জায়গায় এত স্পষ্ট টের পাওয়া গেল? একটা বড় কারণ, কেন্দ্রটাই ছিল বাংলাদেশের ভেতরে, নরসিংদী–মাধবদী অঞ্চলের কাছে; আর গভীরতাও ছিল খুব কম, মাটির প্রায় ১০ কিলোমিটার নিচে ছিল এই ভূমিকম্পের উৎস। ভূমিকম্প যত অগভীর হয় আর কেন্দ্র যত কাছাকাছি হয়, ঝাঁকুনিটা তত বেশি তীব্র আর সরাসরি লাগে। নেপালের ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প কাগজে বড়, কিন্তু দূরে ছিল। আজকের ৫–এর ভূমিকম্পটা ছোট, কিন্তু আমাদের পায়ের নিচের মাটির তলায়, অথবা প্রতিবেশির মাটির তলায়। সেই কারণে কম মাত্রা হয়েও কম্পনটা দেশে বেশ বিস্তৃতভাবে মানুষ টের পেয়েছে।
মাত্রায় কম হলেও চিন্তার কিছু নেই তা না। নিঃসন্দেহে, আজকেরটা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে ঢাকার এত কাছে হওয়া বিরল এক ভূমিকম্প।
সাধারণ ধারণা হিসেবে ভূকম্পবিদরা বলেন, ৪-মাত্রার নিচে বেশির ভাগ সময় ভূমিকম্প খুব হালকা প্রকাশ পায়; ৫-এর ঘরে পুরোনো আর দুর্বল ভবনের জন্য ঝুঁকি বেড়ে যায়; আর ৬-এর ওপরে গেলে, যদি কেন্দ্র খুব দূরে না হয়, সেটা বড় ধরনের ঘটনার সিগন্যাল। আজকেরটা ছিল সেই ৫-এর ঘরের। আতঙ্কে দৌড়াদৌড়ি করার চেয়ে, শান্ত থেকে পরিস্থিতিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখা, ভবনের ফাটল, নিরাপত্তা আর ভবিষ্যতের প্রস্তুতির কথা ভাবার মতো লেভেল।
আমরা আপাতত ঠিক আছি। ঘরবাড়িও ঠিক আছে।
তবু এই কয়েক সেকেন্ডের দুলুনি আবার মনে করিয়ে দিল, যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এত নিশ্চিন্তে জীবন যাপন করি, তার আড়ালে নীরবে মাটির নিচে টানাপোড়েন চলতেই থাকে।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে হেফাজত করুন। 🤲
আপনারা কোথায় ছিলেন, কীভাবে টের পেলেন আজকের ঝাঁকুনিটা?