22/09/2025
‘আজকাল তোমাকে খুব উদাস দেখায় অর্পা।তোমার কি মন খারাপ?’
রাশেদের কথাটা শুনে বেশ আশ্চর্য হলো অর্পা।তার মন খারাপের খবর তবে একটুখানি হলেও রাখে রাশেদ। এতো ব্যাস্ততা কাটিয়ে প্রেমিকার মন খারাপের বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে ভাবা যায়!এর জন্য তো তাকে বিরাট একটা কুর্নিশ জানানো উচিত।অথচ অর্পা অতিশয় উল্লাসে তাকে কুর্নিশ জানাতে পারলো না।মুখ ভার করে বসে রইলো।শহরের এক আভিজাত্যপূর্ণ কফিশপ।আশেপাশে বসে আছে অনেকগুলো প্রেমিকযুগল। জনসম্মুখে কঠিন সত্য বলে অপ্রেমিকের সম্মান খোয়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আর নেই।অর্পার মন খারাপ বিষয়টি আজকাল খুব সহজলভ্য হয়ে গেছে।যখন তখন হুটহাট মন খারাপ হয়।অত:পর বর্ষার ধারার মতো চোখ বেয়ে অশ্রু বর্ষণ হয়।জনসম্মুখে তা সাড়ম্বরে প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।রাদেশ ভ্রুকুটি কুঁচকে ফের বলল,
‘তোমার এই নির্লিপ্ততা আর নেওয়া যাচ্ছে না অর্পা।সারাক্ষণ এমন দু:খী দু:খী ভাব করে থাকার মানে কি?এমন চলতে থাকলে আমাদের সম্পর্কটা এখনেই ইতি টানতে হচ্ছে।’
রাশেদের কথায় অর্পার ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠলো।রাশেদের প্রচন্ড দুর্বিনীত,অহংকারী উদ্ধতস্বভাব দিন দিন যেন আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।অর্পা এমন অসামাজিক মানুষটাকে কখনোই ভালোবাসে নি।সে ভালোবেসেছিল একটা নিখাঁদ সোনার মানুষকে।সেই ব্যাক্তি যে সময়ের ব্যাবধানে এমন দাম্ভিকতাপূর্ণ মানব হয়ে ওঠবে সেটা কল্পনাও করেনি সে।অবশ্য হবে নাই বা কেন,এই দুর্মূল্যের বাজারে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা মাইনে পাওয়া ব্যাক্তির কমতি কিসে?এজন্য পুরনো প্রেমিকাকে অবহেলায়,অযত্নে দূরে সরিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ বৈকি।তাদের ছয় বছরের প্রেম।কলেজ জীবনের সমবয়সী প্রেমিকযুগল এখন জীবিকার টানে, টাকার মোহে, ভালোবাসার চেয়ে বাস্তবতার কাছে পরাজিতপ্রায়।অর্পা একটা ছোটখাটো এনজিও-তে সামান্য বেতনে চাকরি করে।দুজনের ব্যাস্ত জীবন শুরু হয়েছে প্রায় বছর হতে চলল।অর্পা প্রায়ই রাশেদকে বিয়ের কথা বলে।সেকথা রাশেদের কর্ণকুহর অবধি পৌঁছায় কিনা বলা মুশকিল।
আজ তবে কঠিনতম সংকল্পটা উত্থাপন করেই ফেলল রাশেদ।অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছিলো,তবে কথাটা কিভাবে বলা উচিত সেই পন্থা জানা ছিল না।অর্পা বহু আগে বুঝতে পেরেছে প্রেমিকের মনোভাব।অত:পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ধীরে ধীরে।সে অপেক্ষায় ছিল কখন রাশেদ মুখ ফুটে কথাটা বলবে।এমন জোরজবরদস্তির সম্পর্কে অর্পা থাকতে মোটেও ইচ্ছুক নয়।তবুও এই নিষ্ঠুর সত্যিটা অবুঝ হৃদয় মানতে নারাজ।যাক অবশেষে তবে সম্পর্কের চূড়ান্ত সমাপ্তি টানার সময় এসেছে।এখন আর প্রতি মাসে একবার করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাটকীয় সাক্ষাৎতের প্রয়োজন পরবে না।
‘কি হলো?কথা বলছো না কেন?’
রাশেদ অস্থির হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো।বেশ রাগান্বিত কন্ঠস্বর।অর্পা অপেক্ষায় আছে রাশেদ আর কি কি বলে সেটা শোনার জন্য।লোকটা দারুণ দুর্দর্ষ অভিনেতা।কে বলবে সুদর্শন পুরুষের মুখের আড়ালে একটা কুৎসিত মানুষ লুকিয়ে আছে।যার চরিত্রের দোষ বিস্তর।অবশ্য আগে এমনটা ছিল না।অর্পা চোখের জল গোপন করে হতাশা মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিলো,
‘কি বলব?’
‘দেখো অর্পা,আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজনের কেউই এ সম্পর্কে খুশি নই।একরকম জোর করে সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাচ্ছি।এমন ভাবে তো আর চলতে পারে না।তার থেকে ভালো আমরা নিজেদের জীবন নতুন ভাবে শুরু করি।’
অর্পার চোখ ছলছল করে ওঠলো।রাশেদ সেই রোদনস্ফিত নয়নের দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।ওহ!চোখের জল দেখিয়ে তবে বাঁধন দেবার চেষ্টা!রাশেদ তার চোখের জল সহ্য করতে পারে না সে বিষয় অর্পা ভালো ভাবেই জ্ঞাত।নতুন ভাবে আবার প্রেমে আকৃষ্ট করার প্রবল চেষ্টা!না,ভাঙা সম্পর্ককে শুধু স্মৃতির মোহে আবার বাঁচিয়ে তোলা রাশেদের পক্ষে সম্ভব নয়।আজ এ সম্পর্কের শেষ না করলে প্রীতির সাথে বিয়ের কথাটা বাড়িতে বলা যাচ্ছে না।মেয়েটা বিয়ে বিয়ে করে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।তার সাথে রাশেদের পরিচয় হয়েছে চাকরি পাওয়ার পরপরই।এক সহকর্মীর বিয়েতে মেয়েটির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে রাশেদের।ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত মেয়েটির রূপ সৌন্দর্য বড়ো অপূর্বদৃষ্ট।তার লম্বা ছিপছিপে গড়ন,ফর্সা মুখশ্রী,হরিণীর মতো টানা টানা দুটো চোখ,উন্মীলিত বক্ষ,সুন্দর শরীরী বাঁক,উন্নত নিতম্ব যে কোনো পুরুষকে অনায়াসে মোহাবিষ্ট করতে সক্ষম।আর অপরদিকে অর্পাকে আজকাল কেমন বয়স্ক দেখায়।চোখের নিচে কালি পড়েছে।মুখে কোনো তারুণ্যের ছাপ নেই।শরীরের গড়নেও পরিবর্তন এসেছে।আগের থেকে স্থুল শরীরে পেটের কাছে সামান্য চর্বি জমেছে বোধহয়।উঁচু দেখাচ্ছে সামান্য।কোনো আকর্ষন নেই একদম।রাশেদ অরুচি নিয়ে তাকালো অর্পার দিকে।যেই দৃষ্টি প্রেমে পরিপূর্ণ থাকতো সবসময় সেই দৃষ্টিতে এমন ভৎসনার আভাস দেখে বুকে ব্যাথা অনুভব করলো অর্পা।মনে মনে বলল,‘রাশেদ,আর কত অপমান করবে আমায়?’
মুখে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে অর্পা মনের কথাটা ধামাচাপা দিলো।অনুভূতিহীন কন্ঠে বলল,‘সব তো ঠিক করেই ফেলেছো।তবে বিয়েটা কবে করছো?’
‘মানে?’
তড়িৎ প্রশ্ন করলো রাশেদ।তার কন্ঠে একই সাথে রাগ এবং বিস্ময়ের বহিঃপ্রকাশ।অর্পা হাসলো।বোকা নাকি?লোকটা ভাবছে এতো অপমানের পরে অর্পা নিজের সাথে তার বিয়ের কথা বলছে।এতোদিন সম্পর্কে থেকে এই চিনলো অর্পাকে?হায়রে পুরুষ!অর্পার মনে হলো রাশেদ তাকে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।ভালোবাসলে বুঝি এভাবে আঘাত করা যায়?অপমানে অপমানে নি:শেষ করে দেওয়া যায়!উহু,মোটেও যায় না।এমন ভালোবাসাহীন একটা সম্পর্কে থাকা খুব অন্যায়।এতোদিন ধরে অর্পা জেনে বুঝে অন্যায়টা করে যাচ্ছিল।কি করবে মানুষ তো!মন নামক ভীষণ বেহায়া বস্তুটার জন্য নিজের আত্মসম্মান বলিদান দিতে হয়েছে। আর নয়।অর্পা ফের ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,
‘বলছি বিয়েটা কবে করছো?বিয়ে করবে না?’
‘এই শোনো,তোমার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেছে?তুমি জানো আজকাল তোমাকে পরিণত বয়সী নারীদের মতো দেখায়।এমন অধুনা পৌঢ়া মেয়েকে আমার বাবা-মা ছেলের বউ হিসাবে কখনোই পছন্দ করবে না।’
এবার সশব্দে হাসলো অর্পা।তার হাসিতে বেশ বিচলিত বোধ করলো রাশেদ।ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো অর্পার মুখের দিকে।প্রেম বিয়োগের অতিরিক্ত শোকে মেয়েটির মাথায় সমস্যা হলো নাকি?আহারে!কিন্তু রাশেদের আর করণীয় কি?তার তো উপান্তর নেই।তবে হাসিটায় ক্ষানিকটাও শোকের ইঙ্গিত নেই।বরং লেপ্টে আছে বিদ্রুপ!কিছুসময় অতিবাহিত হবার পরে রাশেদ বলল,‘এমন অসভ্যের মতো হাসছো কেন?আমি হাসির কি বললাম?মাথাটা কি সত্যিকার অর্থেই পুরোপুরি গেছে?’
‘ছি!রাশেদ,এমন ভাবে বলতে আছে নাকি?আমার মাথা পাগল হলে তোমার ভালো লাগবে?যতোই হোক কোনো এক কালের প্রেমিকা আমি তোমার।’
অর্পা হাসতে হাসতে বলল কথাটা।রাশেদ অবাক নেত্রে দেখলো অর্পাকে।কিছুক্ষণ আছে বয়স্ক লাগা অর্পাকে এখন কেমন কিশোরী দেখাচ্ছে।হাসলে বুঝি নারীদের রূপ এভাবে বদল হয়?কি আশ্চর্য!অর্পা নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।রাশেদ কিছু বলার পূর্বেই উঠে দাঁড়ালো অর্পা।গম্ভীরকন্ঠে বলল,
‘শোনো বিয়েতে আমাকে ইনভাইট করতে ভুলো যেন।প্রীতি মেয়েটা খুব সুন্দর।আমি নিশ্চিত ও তোমাকে খুব ভালো রাখবে।তবে সত্যিটা কি জানো,তোমার সুখ চাইতে আমার কষ্টই হবে।আমি অতিরিক্ত উদারমনা নই কিনা।আমাকে আঘাতে আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া মানুষের সুখ চাইতে পারি না।আচ্ছা,আজ তাহলে আসি।’
বলতে বলতে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা বক্স বের করলো অর্পা।সেটা রাশেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,‘ছয় বছরে বিভিন্ন সময়ে এই জিনিসগুলো আমাকে দিয়েছিলে তুমি।তুমি চাইলে বক্স খুলে দেখে নিতে পারো।তোমার দেওয়া সবটা ফেরত দিচ্ছি আমি।কি বলতো আমি না ঋণ রাখতে চাই না।শুধু একটাই আফসোস,তুমি যে অবহেলা,অবজ্ঞা,অপ্রেম দিয়েছো সেটা তোমাকে ফেরত দিতে পারলাম না আমি।আর হ্যাঁ কফির দামটা দিয়ে যাচ্ছি।ভালো থেকো।’
রাশেদ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।অর্পা প্রীতির সম্পর্কে জানে?কিভাবে জানলো?বক্সটা হাতে নিয়ে অর্পার ফেরত দেওয়া জিনিসগুলোর দিকে তাকালো রাশেদ।খুব সামান্য উপহারগুলো।মাথার ক্লিপ,ঘড়ি,গোলাপ,আংটি,চুড়ি এসব ছোট ছোট জিনিস।ছয় বছরের প্রেমে এই সামান্য উপহারগুলো পেয়েছিল অর্পা।অথচ মেয়েটা এগুলো পেয়ে কি অসামান্য খুশিটাই না হতো।অপরদিকে প্রীতির সাথে রাশেদের সম্পর্ক এখনো বছর হয়নি।মেয়েটাকে কি কি উপহার-ই না দিয়েছে রাশেদ।এই তো গত মাসে নতুন ফোন কিনে দিয়েছে।মাসে মাসে তাকে শাড়ি উপহার না দিতে চলে না।আন্তরিকতাহীন ব্যাবহারে অতিষ্ঠ করে তুলে রাশেদকে। সেই অল্প বয়সী ললনার আবদার গুলো উপভোগ করে রাশেদ।অথচ চাকরি পাওয়ার পর অর্পা ইমার্জেন্সিতে একদিন মোবাইলে রিচার্জ করে দিতে বলেছিল সেদিন রাশেদ মেজাজ দেখিয়ে বলেছিল,‘টাকা কোথায় পাব?আমি তোমার মোবাইলে টাকা দিতে পারব না।প্রেমিকের কাছে টাকা চাওয়া ছোটলোকি কাজ।’
এরপর অর্পা আর কোনো আবদার করেনি।আর আজ তো সমস্ত আবদারের পথ রোধ করে চলে গেছে।বহু আকাঙ্খিত বিচ্ছেদ রূপী মুক্তি পাবার পরেও কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে রাশেদের।বুকটা জ্বলছে ভীষণ।মন চাইছে এখুনি ছুটে গিয়ে অর্পাকে জড়িয়ে ধরে বলতে,‘অর্পা আমি তোমাকে আজও প্রথম দিনের মতো ভালোবাসি।’
অথচ সংকোচ,দ্বিধা,নতুন প্রাপ্তির লোভ,প্রীতির আকর্ষণীয় দেহ ছোঁয়ার মোহ স্বস্থানে বেঁধে রাখলো তাকে।বুকের জলন্ত আগুন মূলত মায়া।মায়া কেটে গেলে অবশ্যই সে অর্পাকে ভুলে যাবে।অর্পার যাওয়ার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মানুষটা বড়ো নিষ্ঠুর।নিষ্ঠুরতম মানুষের দিকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক পলক তাকালো অর্পা।রাশেদের চোখে কোনো অনুভূতি নেই।তবে কি তার একটুও কষ্ট হচ্ছে না।অথচ বোকা অর্পার জীবনে পড়ে আছে স্মৃতির ভাঙা খণ্ডচিহ্ন।ভালোবাসা কি সত্যিই সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যায়?নাকি মানুষই হারায় তার মানবিকতা?
#বিবর্ণ_প্রেম
|ছোটগল্প|
সানজিদা খানম স্বর্ণা