Dropout's Canvas

  • Home
  • Dropout's Canvas

Dropout's Canvas Welcome to DROPOUT'S CANVAS. We will collect valuable writings and repost with credit in our page.

22/09/2025

‘আজকাল তোমাকে খুব উদাস দেখায় অর্পা।তোমার কি মন খারাপ?’

রাশেদের কথাটা শুনে বেশ আশ্চর্য হলো অর্পা।তার মন খারাপের খবর তবে একটুখানি হলেও রাখে রাশেদ। এতো ব্যাস্ততা কাটিয়ে প্রেমিকার মন খারাপের বিষয়ে বিশেষ নজর দিচ্ছে ভাবা যায়!এর জন্য তো তাকে বিরাট একটা কুর্নিশ জানানো উচিত।অথচ অর্পা অতিশয় উল্লাসে তাকে কুর্নিশ জানাতে পারলো না।মুখ ভার করে বসে রইলো।শহরের এক আভিজাত্যপূর্ণ কফিশপ।আশেপাশে বসে আছে অনেকগুলো প্রেমিকযুগল। জনসম্মুখে কঠিন সত্য বলে অপ্রেমিকের সম্মান খোয়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আর নেই।অর্পার মন খারাপ বিষয়টি আজকাল খুব সহজলভ্য হয়ে গেছে।যখন তখন হুটহাট মন খারাপ হয়।অত:পর বর্ষার ধারার মতো চোখ বেয়ে অশ্রু বর্ষণ হয়।জনসম্মুখে তা সাড়ম্বরে প্রকাশের মতো গুরুত্বপূর্ণ কিছু নয়।রাদেশ ভ্রুকুটি কুঁচকে ফের বলল,

‘তোমার এই নির্লিপ্ততা আর নেওয়া যাচ্ছে না অর্পা।সারাক্ষণ এমন দু:খী দু:খী ভাব করে থাকার মানে কি?এমন চলতে থাকলে আমাদের সম্পর্কটা এখনেই ইতি টানতে হচ্ছে।’

রাশেদের কথায় অর্পার ঠোঁটে বিদ্রুপের হাসি ফুটে ওঠলো।রাশেদের প্রচন্ড দুর্বিনীত,অহংকারী উদ্ধতস্বভাব দিন দিন যেন আকাশচুম্বী হয়ে উঠেছে।অর্পা এমন অসামাজিক মানুষটাকে কখনোই ভালোবাসে নি।সে ভালোবেসেছিল একটা নিখাঁদ সোনার মানুষকে।সেই ব্যাক্তি যে সময়ের ব্যাবধানে এমন দাম্ভিকতাপূর্ণ মানব হয়ে ওঠবে সেটা কল্পনাও করেনি সে।অবশ্য হবে নাই বা কেন,এই দুর্মূল্যের বাজারে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা মাইনে পাওয়া ব্যাক্তির কমতি কিসে?এজন্য পুরনো প্রেমিকাকে অবহেলায়,অযত্নে দূরে সরিয়ে দেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ বৈকি।তাদের ছয় বছরের প্রেম।কলেজ জীবনের সমবয়সী প্রেমিকযুগল এখন জীবিকার টানে, টাকার মোহে, ভালোবাসার চেয়ে বাস্তবতার কাছে পরাজিতপ্রায়।অর্পা একটা ছোটখাটো এনজিও-তে সামান্য বেতনে চাকরি করে।দুজনের ব্যাস্ত জীবন শুরু হয়েছে প্রায় বছর হতে চলল।অর্পা প্রায়ই রাশেদকে বিয়ের কথা বলে।সেকথা রাশেদের কর্ণকুহর অবধি পৌঁছায় কিনা বলা মুশকিল।

আজ তবে কঠিনতম সংকল্পটা উত্থাপন করেই ফেলল রাশেদ।অনেকদিন ধরেই চেষ্টা চালাচ্ছিলো,তবে কথাটা কিভাবে বলা উচিত সেই পন্থা জানা ছিল না।অর্পা বহু আগে বুঝতে পেরেছে প্রেমিকের মনোভাব।অত:পর নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে ধীরে ধীরে।সে অপেক্ষায় ছিল কখন রাশেদ মুখ ফুটে কথাটা বলবে।এমন জোরজবরদস্তির সম্পর্কে অর্পা থাকতে মোটেও ইচ্ছুক নয়।তবুও এই নিষ্ঠুর সত্যিটা অবুঝ হৃদয় মানতে নারাজ।যাক অবশেষে তবে সম্পর্কের চূড়ান্ত সমাপ্তি টানার সময় এসেছে।এখন আর প্রতি মাসে একবার করে অনিচ্ছা সত্ত্বেও নাটকীয় সাক্ষাৎতের প্রয়োজন পরবে না।

‘কি হলো?কথা বলছো না কেন?’
রাশেদ অস্থির হয়ে প্রশ্ন ছুঁড়লো।বেশ রাগান্বিত কন্ঠস্বর।অর্পা অপেক্ষায় আছে রাশেদ আর কি কি বলে সেটা শোনার জন্য।লোকটা দারুণ দুর্দর্ষ অভিনেতা।কে বলবে সুদর্শন পুরুষের মুখের আড়ালে একটা কুৎসিত মানুষ লুকিয়ে আছে।যার চরিত্রের দোষ বিস্তর।অবশ্য আগে এমনটা ছিল না।অর্পা চোখের জল গোপন করে হতাশা মিশ্রিত কন্ঠে জবাব দিলো,

‘কি বলব?’
‘দেখো অর্পা,আমার মনে হচ্ছে আমরা দুজনের কেউই এ সম্পর্কে খুশি নই।একরকম জোর করে সম্পর্কটা টেনে নিয়ে যাচ্ছি।এমন ভাবে তো আর চলতে পারে না।তার থেকে ভালো আমরা নিজেদের জীবন নতুন ভাবে শুরু করি।’

অর্পার চোখ ছলছল করে ওঠলো।রাশেদ সেই রোদনস্ফিত নয়নের দিকে এক পলক তাকিয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলো।ওহ!চোখের জল দেখিয়ে তবে বাঁধন দেবার চেষ্টা!রাশেদ তার চোখের জল সহ্য করতে পারে না সে বিষয় অর্পা ভালো ভাবেই জ্ঞাত।নতুন ভাবে আবার প্রেমে আকৃষ্ট করার প্রবল চেষ্টা!না,ভাঙা সম্পর্ককে শুধু স্মৃতির মোহে আবার বাঁচিয়ে তোলা রাশেদের পক্ষে সম্ভব নয়।আজ এ সম্পর্কের শেষ না করলে প্রীতির সাথে বিয়ের কথাটা বাড়িতে বলা যাচ্ছে না।মেয়েটা বিয়ে বিয়ে করে অতিষ্ঠ করে তুলেছে।তার সাথে রাশেদের পরিচয় হয়েছে চাকরি পাওয়ার পরপরই।এক সহকর্মীর বিয়েতে মেয়েটির সাথে সখ্যতা গড়ে ওঠেছে রাশেদের।ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত মেয়েটির রূপ সৌন্দর্য বড়ো অপূর্বদৃষ্ট।তার লম্বা ছিপছিপে গড়ন,ফর্সা মুখশ্রী,হরিণীর মতো টানা টানা দুটো চোখ,উন্মীলিত বক্ষ,সুন্দর শরীরী বাঁক,উন্নত নিতম্ব যে কোনো পুরুষকে অনায়াসে মোহাবিষ্ট করতে সক্ষম।আর অপরদিকে অর্পাকে আজকাল কেমন বয়স্ক দেখায়।চোখের নিচে কালি পড়েছে।মুখে কোনো তারুণ্যের ছাপ নেই।শরীরের গড়নেও পরিবর্তন এসেছে।আগের থেকে স্থুল শরীরে পেটের কাছে সামান্য চর্বি জমেছে বোধহয়।উঁচু দেখাচ্ছে সামান্য।কোনো আকর্ষন নেই একদম।রাশেদ অরুচি নিয়ে তাকালো অর্পার দিকে।যেই দৃষ্টি প্রেমে পরিপূর্ণ থাকতো সবসময় সেই দৃষ্টিতে এমন ভৎসনার আভাস দেখে বুকে ব্যাথা অনুভব করলো অর্পা।মনে মনে বলল,‘রাশেদ,আর কত অপমান করবে আমায়?’

মুখে একটা মেকি হাসি ঝুলিয়ে অর্পা মনের কথাটা ধামাচাপা দিলো।অনুভূতিহীন কন্ঠে বলল,‘সব তো ঠিক করেই ফেলেছো।তবে বিয়েটা কবে করছো?’

‘মানে?’
তড়িৎ প্রশ্ন করলো রাশেদ।তার কন্ঠে একই সাথে রাগ এবং বিস্ময়ের বহিঃপ্রকাশ।অর্পা হাসলো।বোকা নাকি?লোকটা ভাবছে এতো অপমানের পরে অর্পা নিজের সাথে তার বিয়ের কথা বলছে।এতোদিন সম্পর্কে থেকে এই চিনলো অর্পাকে?হায়রে পুরুষ!অর্পার মনে হলো রাশেদ তাকে কোনোদিনই ভালোবাসেনি।ভালোবাসলে বুঝি এভাবে আঘাত করা যায়?অপমানে অপমানে নি:শেষ করে দেওয়া যায়!উহু,মোটেও যায় না।এমন ভালোবাসাহীন একটা সম্পর্কে থাকা খুব অন্যায়।এতোদিন ধরে অর্পা জেনে বুঝে অন্যায়টা করে যাচ্ছিল।কি করবে মানুষ তো!মন নামক ভীষণ বেহায়া বস্তুটার জন্য নিজের আত্মসম্মান বলিদান দিতে হয়েছে। আর নয়।অর্পা ফের ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,

‘বলছি বিয়েটা কবে করছো?বিয়ে করবে না?’
‘এই শোনো,তোমার মাথাটা কি খারাপ হয়ে গেছে?তুমি জানো আজকাল তোমাকে পরিণত বয়সী নারীদের মতো দেখায়।এমন অধুনা পৌঢ়া মেয়েকে আমার বাবা-মা ছেলের বউ হিসাবে কখনোই পছন্দ করবে না।’

এবার সশব্দে হাসলো অর্পা।তার হাসিতে বেশ বিচলিত বোধ করলো রাশেদ।ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে থাকলো অর্পার মুখের দিকে।প্রেম বিয়োগের অতিরিক্ত শোকে মেয়েটির মাথায় সমস্যা হলো নাকি?আহারে!কিন্তু রাশেদের আর করণীয় কি?তার তো উপান্তর নেই।তবে হাসিটায় ক্ষানিকটাও শোকের ইঙ্গিত নেই।বরং লেপ্টে আছে বিদ্রুপ!কিছুসময় অতিবাহিত হবার পরে রাশেদ বলল,‘এমন অসভ্যের মতো হাসছো কেন?আমি হাসির কি বললাম?মাথাটা কি সত্যিকার অর্থেই পুরোপুরি গেছে?’

‘ছি!রাশেদ,এমন ভাবে বলতে আছে নাকি?আমার মাথা পাগল হলে তোমার ভালো লাগবে?যতোই হোক কোনো এক কালের প্রেমিকা আমি তোমার।’

অর্পা হাসতে হাসতে বলল কথাটা।রাশেদ অবাক নেত্রে দেখলো অর্পাকে।কিছুক্ষণ আছে বয়স্ক লাগা অর্পাকে এখন কেমন কিশোরী দেখাচ্ছে।হাসলে বুঝি নারীদের রূপ এভাবে বদল হয়?কি আশ্চর্য!অর্পা নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে।রাশেদ কিছু বলার পূর্বেই উঠে দাঁড়ালো অর্পা।গম্ভীরকন্ঠে বলল,

‘শোনো বিয়েতে আমাকে ইনভাইট করতে ভুলো যেন।প্রীতি মেয়েটা খুব সুন্দর।আমি নিশ্চিত ও তোমাকে খুব ভালো রাখবে।তবে সত্যিটা কি জানো,তোমার সুখ চাইতে আমার কষ্টই হবে।আমি অতিরিক্ত উদারমনা নই কিনা।আমাকে আঘাতে আঘাতে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে দেওয়া মানুষের সুখ চাইতে পারি না।আচ্ছা,আজ তাহলে আসি।’

বলতে বলতে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে একটা বক্স বের করলো অর্পা।সেটা রাশেদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,‘ছয় বছরে বিভিন্ন সময়ে এই জিনিসগুলো আমাকে দিয়েছিলে তুমি।তুমি চাইলে বক্স খুলে দেখে নিতে পারো।তোমার দেওয়া সবটা ফেরত দিচ্ছি আমি।কি বলতো আমি না ঋণ রাখতে চাই না।শুধু একটাই আফসোস,তুমি যে অবহেলা,অবজ্ঞা,অপ্রেম দিয়েছো সেটা তোমাকে ফেরত দিতে পারলাম না আমি।আর হ্যাঁ কফির দামটা দিয়ে যাচ্ছি।ভালো থেকো।’

রাশেদ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।অর্পা প্রীতির সম্পর্কে জানে?কিভাবে জানলো?বক্সটা হাতে নিয়ে অর্পার ফেরত দেওয়া জিনিসগুলোর দিকে তাকালো রাশেদ।খুব সামান্য উপহারগুলো।মাথার ক্লিপ,ঘড়ি,গোলাপ,আংটি,চুড়ি এসব ছোট ছোট জিনিস।ছয় বছরের প্রেমে এই সামান্য উপহারগুলো পেয়েছিল অর্পা।অথচ মেয়েটা এগুলো পেয়ে কি অসামান্য খুশিটাই না হতো।অপরদিকে প্রীতির সাথে রাশেদের সম্পর্ক এখনো বছর হয়নি।মেয়েটাকে কি কি উপহার-ই না দিয়েছে রাশেদ।এই তো গত মাসে নতুন ফোন কিনে দিয়েছে।মাসে মাসে তাকে শাড়ি উপহার না দিতে চলে না।আন্তরিকতাহীন ব্যাবহারে অতিষ্ঠ করে তুলে রাশেদকে। সেই অল্প বয়সী ললনার আবদার গুলো উপভোগ করে রাশেদ।অথচ চাকরি পাওয়ার পর অর্পা ইমার্জেন্সিতে একদিন মোবাইলে রিচার্জ করে দিতে বলেছিল সেদিন রাশেদ মেজাজ দেখিয়ে বলেছিল,‘টাকা কোথায় পাব?আমি তোমার মোবাইলে টাকা দিতে পারব না।প্রেমিকের কাছে টাকা চাওয়া ছোটলোকি কাজ।’

এরপর অর্পা আর কোনো আবদার করেনি।আর আজ তো সমস্ত আবদারের পথ রোধ করে চলে গেছে।বহু আকাঙ্খিত বিচ্ছেদ রূপী মুক্তি পাবার পরেও কেমন যেন খাপছাড়া লাগছে রাশেদের।বুকটা জ্বলছে ভীষণ।মন চাইছে এখুনি ছুটে গিয়ে অর্পাকে জড়িয়ে ধরে বলতে,‘অর্পা আমি তোমাকে আজও প্রথম দিনের মতো ভালোবাসি।’

অথচ সংকোচ,দ্বিধা,নতুন প্রাপ্তির লোভ,প্রীতির আকর্ষণীয় দেহ ছোঁয়ার মোহ স্বস্থানে বেঁধে রাখলো তাকে।বুকের জলন্ত আগুন মূলত মায়া।মায়া কেটে গেলে অবশ্যই সে অর্পাকে ভুলে যাবে।অর্পার যাওয়ার পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা মানুষটা বড়ো নিষ্ঠুর।নিষ্ঠুরতম মানুষের দিকে নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও এক পলক তাকালো অর্পা।রাশেদের চোখে কোনো অনুভূতি নেই।তবে কি তার একটুও কষ্ট হচ্ছে না।অথচ বোকা অর্পার জীবনে পড়ে আছে স্মৃতির ভাঙা খণ্ডচিহ্ন।ভালোবাসা কি সত্যিই সময়ের স্রোতে বিলীন হয়ে যায়?নাকি মানুষই হারায় তার মানবিকতা?

#বিবর্ণ_প্রেম
|ছোটগল্প|
সানজিদা খানম স্বর্ণা

22/09/2025

আমাদের বিয়ের প্রায় ৩ বছর চলে কিন্তু
পরিবারের সবাই কিছুটা মেনে নিলেও উৎপলের বাবা মানে আমার শ্বশুর বাবা এখনো আমাকে মেনে নেয়নি এমনকি সে আমার কথাও শুনতে পারেনা কারণ সে উৎপলের বিয়ে ঠিক করে রেখেছিলো তাঁর একটা বন্ধুর মেয়ের সাথে।

যদিও আমি বিয়ের আগে এটা জানতাম তাই একটা সময় আমি উৎপলকে বিয়ে করতে রাজি হইনি কিন্তু শেষমেশ ওর জেদের কাছে আমি হার মেনে ওকে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলাম।

যাইহোক কয়েকদিন ধরে আমার শ্বাশুড়ি আমাকে আর উৎপলকে জ্বালিয়ে মারছে যেনো আমরা তাদের সাথে গিয়ে থাকি,আমাদের দেখে দেখে নাকি আমার শ্বশুর মশাইয়ের জিদ কমবে।

অবশেষে সবকিছু গুছিয়ে একদিন
শ্বশুরবাড়ি গিয়ে হাজির হলাম।

আমার শ্বাশুড়ি মা খুবই ভালো, মা ছাড়া কখনোই আমাকে ডাকতেন না।তিনিই আমাকে বিভিন্ন ধরনের পিঠা বানানো থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের খাবার রান্না করা শিখিয়েছিলেন।

আমার শ্বশুর মশাই ছিলো খুবই গম্ভীর এবং শৌখিন
প্রকৃতির
মানুষ।আয়রন করা পাঞ্জাবি আর শার্ট ছাড়া তাকে কখনো দেখিনি এমনকি তাঁর পকেটে একটা চিরুনী সবসময় ঝুলে থাকতো শুধু তাঁর চুলগুলো গোছগাছ রাখার জন্য।

টাইম মতো তাঁর খাবার আর চা চাই ই চাই। সে খুব কম কথা বলতো এমনি আমার ভাসুর,ননদ এবং উৎপল তাঁরা সবসময়ই বাবার ভয়ে তটস্থ হয়ে থাকতো।

রান্নার জগতে কাঁচা মরিচ ভাজি আমার বড্ড প্রিয়। প্রতিবছর কাঁচা মরিচের মৌসুমে আমি কাঁচা মরিচ তুলে এনে ওগুলোর বিচি ফেলে ভালোভাবে ধুয়ে তারপর নারকেল আর বড় চিংড়ি দিয়ে ভাজি করতাম। তো আজ ও তাই করলাম যদিও এবাড়িতে এসে এই প্রথম
আমি রান্না করলাম।

তো বরাবরের মতো আমার রান্নাও টেবিলে চলে গেলো। আমি তো ভয়ে শেষ! না জানি শ্বশুড় মশাই কি বলে কিন্তু না সেদিন বাবা আমার রান্নাটা খুব পছন্দ করেছিলো।

এরপর প্রায়ই বাবা নাকি শ্বাশুড়ি মাকে বলতো সেজুতিকে বলো ঐ রান্নাটা করতে।
কিন্তু কখনো বাবা আমার সাথে কথা বলেনি।

এরকম একদিন দুদিন করতে করতে জীবন থেকে কেটে গেলো অনেকগুলো বছর।

আমি এখন ২ সন্তানের জননী।ইফতি আর মিথি দু'ভাইবোন তাঁর দাদুর অনেক আদরের।পুকুরপাড়ে আমাদের আড্ডা দেয়ার জন্য একটা টি টেবিল আর দোলনা আছে।শেষ বিকেলে সবাই আমরা ওখানে বসি।আম কাঠালের মৌসুমে ঐ জায়গাটা পাকা আম কাঁঠালের গন্ধে মৌ মৌ করে।তাঁছাড়া সেখানে আছে অনেক ফল আর বিভিন্ন ফুলের গাছ।

আমরা বসতাম তাঁদের থেকে দূরে একটা টেবিলে আর তাঁরা দু'জন বসতো একসাথে।
যদিও এখন ইফতি,মিথি এবং আমার ভাসুরের ছেলেমেয়েরা তাঁদের সঙ্গী হয়েছে।

আমার বিয়ের এতগুলো বছর পার হয়ে গেলো আমি কখনো তাঁদের দেখিনি বিছানা আলাদা করতে এমনকি ঝগড়া করে অভিমান করে থাকতে।

প্রায়ই আমার শ্বাশুড়ি আমাকে তাঁর রুমে নিয়ে ছেঁড়া একটা ডাইরি বের করে তাঁদের লেখা পুরনো চিঠিগুলো দেখাতো আর হাসতো যদিও ডাইরির লেখা এবং চিঠিগুলো পড়ার সৌভাগ্য আমার এখনো হয়ে ওঠেনি তবে আমি কয়েকটা শুকনো গোলাপ আর বেলীফুল দেখেছি যা তাঁদের অনেক পুরনো আবেগ এবং ভালবাসার চিহ্ন।

আজ সকাল থেকে আমার বাড়িতে শোকের মাতম চলছে কারণ হঠাৎ স্ট্রোক করে গতকাল রাতে আমার শ্বাশুড়ি মারা গেছে। আমার শ্বাশুড়ি ছিলো আমার ২য় মা বাকিটা আর নাই বললাম।
চোখ থেকে আমার অনবরত পানি বেয়ে বেয়ে পড়তে লাগলো আর হৃদয়টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছিলো।

অতঃপর তাকে দাফন করে মাটির বিছানায় রেখে আসা হলো।স্ত্রী বিয়োগে আমার শ্বশুর বাবা একটুও কাঁদেনি কেবল গম্ভীর হয়ে বসেছিলো।

তাঁর ঠিক কয়েকদিন পর অনেক রাতে আমি বাবার রুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম বারান্দা থেকে কাপড় আনতে।যদিও এখন অনেক রাত, বাহিরে প্রচন্ড বাতাস হচ্ছে, বৃষ্টি হতে পারে এই ভেবে আমি বারান্দায় যাচ্ছিলাম কাপড় আনতে কিন্তু আমি তাঁর রুমের সামনে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম যখন আমি শুনছিলাম সে কাঁদছে।
বাহিরে দাঁড়িয়ে আমি স্পষ্ট শুনতে পেয়েছিলাম তাঁর গোঙানি এবং চাপা কান্নার আওয়াজ।

ভিতরে ভিতরে আমার হৃদয়টাও হুহু করে কেঁদে উঠলো কারণ সারাজীবন গম্ভীর একটা মানুষ দেখেছি যে আজ বাচ্চাদের মতো কাঁদছে তা-ও আবার তাঁর সঙ্গীর জন্য আসলে ব্যাপারটা খুবই হৃদয়বিদারক।

আমার শ্বাশুড়ি মায়ের মৃত্যুর ৩ মাস পরেই আমার জা আর ভাসুর আলাদা ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠলো যেটা এতদিন আমার শ্বাশুড়ির জন্য সম্ভব হয়নি কারণ সে সারাজীবন চেয়েছে সবাইকে নিয়ে এক ছাঁদের নিচে বসবাস করতে।

যাইহোক আমার শ্বশুর বাবা কেন যেনো স্ব শরীরে তাদের সাথে চলে গিয়েছিলো আমি অনেক সেধেছি কিন্তু আজ অবধি সে আমার সাথে একটা কথা এমনকি টু শব্দও করেনি।

কিন্তু হঠাৎ মাস পাঁচেক পর দেখা গেলো বাবা হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে আমার বাড়িতে এসে হাজির,আগের চেয়ে তাঁর শরীরটা অনেক শুঁকিয়ে গেছে।

এসে ধীরেধীরে সে তাঁর রুমে চলে গেলো আমি কিছুক্ষণ পর তাঁকে গরম এক কাপ দুধচা দিয়ে আসলাম।

আমার শ্বাশুড়িকে দেখতাম তাঁকে গোসলের আগে গরম পানি করে নিয়ে দিতে,টাইম মতো খাবার আর চা দিতে এমনকি সময়মতো সবকাজ করতে আমিও ঠিক তেমনটাই করতাম।

একদিন কিচেনে রান্না করছিলাম হঠাৎ শুনলাম কেউ একজন বললো,

সেঁজুতি একটু এদিকে আসো।

আমি সেদিন দৌড়ে বাবার কাছে গিয়েছিলাম কারণ এতোগুলো বছর পর আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন বাবা আমাকে ডেকেছে।

কাছে যেতেই বাবা বললো,

"আমার বন্ধুর মেয়ের সাথে উৎপলের বিয়ে দিতে চেয়েছিলাম কিন্তু সেটা হয়নি যদিও মেয়েটা আমার পছন্দের ছিলো সে এখনো আমার খোঁজ নেয়।ও এখন আছে ইতালিতে।

জানিনা সে আমাদের কেমন রাখতো কিন্তু তুমি আমাদের অনেক যত্ন আর দেখভাল করে এই সংসারটা টিকিয়ে রেখেছে।

সারাদিনের ব্যস্ততার শেষে আগে তোমার শ্বাশুড়ি মা তোমাদের সম্পর্কে অনেককিছুই আমাকে বলতো কিন্তু তারমধ্যে তোমার প্রশংসার ডালা টাই একটু বেশি ভারী ছিলো।

সবাই তো আর সবাইকে সম্মান আর ভালবাসা দিয়ে আগলে রাখতে পারেনা তাই শেষমেশ তোমার কাছেই চলে এলাম।

শোনো আজ একটু ওর কবরের কাছে আমাকে নিয়ে যেতে পারবে? আজকাল চোখে খুব একটা ঝাপসা দেখি শরীরেও তেমন একটা শক্তি পাইনা।

তাঁর ঠিক কয়েকদিন পর আমার শ্বশুর মারা গেলো।রেখে গেলো অসংখ্য স্মৃতি এই পুরো বাড়ি জুড়ে তাঁদের স্মৃতিরা কেমন যেনো ওড়াউড়ি করতে লাগলো।

এখনো বাগান জুড়ে টি-টেবিল খালি পরে আছে কিন্তু তাঁরা নেই।তাঁদের রুমটা দখল করেছে ইফতি কিন্তু একসময় এই রুমটাই ছিলো তাদের এক চিলতে সুখের নীড় যেখানে রচিত হতো হাজারো গল্প।

এরকম সবমানুষই একসময় পৃথিবী থেকে চলে যায় রেখে যায় জানা অজানা কতো স্বপ্ন এই পৃথিবীর হৃদয় জুড়ে তবে শেষমেশ তাঁদের ডাইরিটা আমার ভাগেই পড়েছিলো,

যেখানটার প্রতিটি পৃষ্ঠা ছিলো একটা একটা জীবন্ত গল্প।

গল্পঃ বেলাশেষে
লেখাঃ হামিদা ইমরোজ

22/09/2025

আজ আমার ছোট বোন ফারহানার বিয়ে। আমার খুশি হওয়া উচিত কিন্তু আমি দরজা লক করে বসে আছি। চোখ ফেটে কান্না আসছে কিন্তু কেন যেন কাঁদতে পারছি না।

আমি ফারিয়া, এই সংসারের বড় মেয়ে। মাস্টার্স শেষ করেছি বছর ছয়েক আগে। আল্লাহর সব সৃষ্টি সুন্দর আমি নিজেকে ঠিক অতুলনীয় সুন্দরী না বললেও একেবারেই চোখে না পড়ার মত মেয়ে আমি নই।

ফারহানার বিয়ের আয়োজন দেখে আমি খুব বেশি ঈর্ষাবোধ করছি হ্যাঁ আমি খুব ট্রান্সপারেন্ট মনের অধিকারী তাই সত্যি কথা বললাম। একেবারেই মেনে নিতে পারছি না। ইচ্ছে করছে জীবনটা শেষ করে দেই। সিলিং ফ্যান টার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলাম। তারপর ওড়নাটা খুলে নিলাম।

অনার্স ফার্স্ট ইয়ারে পড়া কালীন সময়ে পরিচয় হয় রাতুলের সাথে। অসম্ভব মেধাবী শান্তশিষ্ট চশমা পরা ছেলেটির সঙ্গে পরিচয় এবং বন্ধুত্ব হতে খুব বেশি একটা সময় লাগে না। এই বন্ধুত্বটা একটা সময়ে প্রেমের সম্পর্কে মোড় নিল।

রাতুলের সাথে কাটানো আমার প্রত্যেকটি মুহূর্ত ছিল স্বর্গের অনুভূতির মত। ওর সাথে খাওয়া আইসক্রিম বা ফুচকার স্বাদ যেন অন্যরকম। একটু রিক্সায় ঘুরে বেড়ানো অথবা কাশবনের মাঝে হেঁটে যাওয়া যেন এক নৈসর্গিক ছবির মত সুন্দর ছিল।

রাতুল বেশ মেধাবী হলেও ওর পরিবার ছিল খুবই অসচ্ছল। ওদের বড় পরিবার। ও মেজো ছেলে বড় ভাই দেশের বাইরে। বাবা সমস্ত জায়গা জমি বিক্রি করে বড় ভাইকে দেশের বাইরে পাঠিয়েছিলেন। সেই ছেলে দেশের বাইরে গিয়ে পরিবারের আর কোন খোঁজ রাখেনি। ওরা পড়ে যায় মহা মুশকিলে। দারিদ্রতার সাথে লড়াই করতে করতে দিন কাটতে থাকে। মেসের খরচ দিতে না পারার জন্য রাতুলকে যেদিন প্রায় মেস থেকে বের করে দিবে সেদিন হঠাৎ আমি গিয়ে উপস্থিত হয়েছিলাম। ওর অপমানিত মুখ দেখে আমি কান্না আটকে রাখতে পারিনি। ব্যাগে শুধুমাত্র রিকশা ভাড়ার রেখে বাকি সমস্ত টাই দিয়ে এসেছিলাম এবং পরের দিন বাকি টাকা শোধ করে দিব বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম। আমি কখনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করি না। রাতুলের জন্য প্রায়ই রান্না করে এটা সেটা নিয়ে যেতাম ওর পছন্দের খাবার গুলা। ও আমার দিকে এক পলকে তাকিয়ে থাকতো জিজ্ঞেস করলে কিছুই বলত না। বেশি জোরাজোরি করলে বলতো,

-ফারিয়া তোমার মধ্যে আমার মায়ের প্রতিচ্ছবি আছে, আমার মাও এমন জানো? আনন্দে আমার চোখে সেদিন জল চলে এসেছিল।

অনার্স শেষ বর্ষে হঠাৎ করে ও বললো পরীক্ষা দিবে না। আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।
-কেন পরীক্ষা কেন দেবে না?
-আমার প্রিপারেশন নেই
-তুমি এটা আমাকে বিশ্বাস করতে বলো!

রাতুলের মুখে আর কোন কথা নেই সে চুপ। পরে ওর এক কাছের বন্ধুর কাছ থেকে শুনেছিলাম ফর্ম ফিলাপের টাকা সে যোগাড় করতে পারেনি।
ছল ছল চোখে ওর হাতে সেদিন টাকা গুঁজে দিয়েছিলাম। লজ্জায় ও সেদিন মাটির সাথে মিশে যাচ্ছিল কিন্তু টাকাটা নেয়া ছাড়া ওর কাছে আর কোন অপশন ছিল না।

-ফারিয়া বিশ্বাস করো তোমাকে আমি অনেক সুখে রাখবো। একদিন আমাদের কোন অভাব থাকবে না। তুমি কি রাণীর মত থাকবে। পৃথিবীর কোন মলিনতাকে তোমাকে ছুঁতে দেব না।
আমি ওকে জড়িয়ে ধরেছিলাম।
দুজনে একসাথেই মাস্টার্স কমপ্লিট করলাম।

আর বাসা থেকে তখন প্রচন্ড বিয়ের চাপ এবং এটা খুবই স্বাভাবিক যদিও আগে থেকেই হচ্ছিল কিন্তু আমি পরীক্ষা পরীক্ষা করে সবাইকে থামিয়ে রেখেছিলাম। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে আমার আর কোন বাহানা তারা শুনতে চায় নি।

রেজাল্টের পর রাতুল তখন হন্য হয়ে চাকরি খুঁজছে। সে প্রায় প্রতি সপ্তাহে ইন্টারভিউ দেয় কিন্তু এ দেশের মেধার কদর কয়জন করে? সবই তো আগে থেকে লবিং করা থাকে। ওর অন্ধকার মুখের দিকে আমি আর তাকাতে পারি না তার মধ্যে নেমে এলো আরো এক যন্ত্রনা। ওর ইমিডিয়েট ছোট বোনটার বিয়ে ঠিক হলো কিন্তু পাত্র-পক্ষের ডিমান্ড অনেক। আমাদের দেশে মেয়েদের সৌন্দর্যের মাপকাঠি ধরা হয় গায়ের রং দিয়ে সেই তুলনায় মেয়েটি কালো তাই যৌতুকের পাল্লাটা ভারী। ওরা যে পরিমাণ গয়না ডিমান্ড করেছে তা দেয়া সম্ভব না তবে এর আগেও অনেকগুলো বিয়ে ভেঙে যাওয়াতে সবাই ভেঙে পড়েছে। আমি আমার বিয়ের জন্য রাখা গয়না গুলো রাতুলকে দিলাম, রাতুল কিছুতেই সেটা নেবে না, সাফ জানিয়ে দিলো।

-এটা আমার বিয়ের গয়না আমি যাকে ইচ্ছা তাকে দিব আর যখন তোমার সাথে আমার বিয়ে হবে তখন কিন্তু আমার বাড়ি থেকে কোন গয়না দেয়া হবে না সমস্ত গয়না তুমি দেবে এবার রাজি তো হেসে বললাম।
তবুও রাজিবের মুখ গোমরা হয়ে রইল।

এদিকে আমার বাসা থেকে বিয়ে ঠিক হয়ে গেল আমি রাতুল কে কিছুই জানালাম না, জানতাম ও ভেঙে পড়বে। বাড়িতে রাতুলের কথা কিছু বলতেও পারছি না কারণ আমার বাড়ির লোক নিশ্চয়ই বেকার কোন ছেলের সাথে আমাকে বিয়ে দেবে না । অন্যদিকে যে সমস্ত বিয়ের ঘর আসছিল তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়ার মত কোন কারণ ছিল না। শেষ পর্যন্ত পাত্রের সঙ্গে আমার পছন্দের ব্যাপারে কথা বললাম আর বিয়েটা ক্যান্সেল করতে বললাম, হলোও তাই কিন্তু বাসায় জানাজানি হয়ে গেল আর বাবার হাতে সেদিন প্রথম থাপ্পড় খেয়ে ছিলাম। তারা জানতে চায়নি আমার পছন্দের মানুষটির নাম পরিচয় শুধু জানতে চেয়েছিল ছেলে কি করে, পারিবারিক অবস্থা কেমন? ব্যাস এটুকু শুনেই সবাই স্তম্ভিত। এরপরেও আরো তিনবার আমি একই কাজ করেছি। প্রতিবারই মার খেয়েছি। দ্বিতীয়বারেই অবশ্য রাতুল জেনে গিয়েছিল। সে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেছিল,

- আর কয়েকটা দিন, আমার জন্য আল্লাহর কাছে একটু দোয়া করো আমিও এই যন্ত্রণা আর নিতে পারছি না, বাবা-মায়ের কষ্ট সহ্য করতে পারছি না, বেকারত্ব মানতে পারছি না, তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না।

আল্লাহর রহমতে বছর খানেক পরেই রাতুলের একটা চাকরি হয়ে গেল। আমিও একটা কলেজে লেকচারারের চাকরি পেয়ে গেলাম। ঠিক এমন সময় কালবৈশাখী ঝড়ের মত আমাদের পরিবারে ধেয়ে এলো এক অশনি ঘূর্ণিঝড়। মায়ের ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পরলো। আমার আর চাকরিতে যোগদান করা হলো না। বাবা একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন মাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি। এই ডাক্তার সেই ডাক্তার ইন্ডিয়া যাব নাকি বাংলাদেশে থাকবো, টাকা পয়সার টানাটানি সবমিলিয়ে আমরা তখন ভীষণ বিপর্যস্ত।

রাতুলের নতুন চাকরি সে ভীষণ ব্যস্ত তার মধ্যেও আমাকে ফোন দিয়ে সময় অসময়ে খোঁজ-খবর নেয়। শেষ পর্যন্ত মায়ের অপারেশনটা হবার পরে রেডিওথেরাপি চলতে লাগলো। কেটে গেছে অনেকগুলো দিন। রাতুলের অফিস থেকে ওকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল এক বছরের জন্য। সেখানে সে অনেক ব্যস্ত, ফেসবুকে আসতো না বললেই চলে। তিন চার দিন পর পর একবার কথা হয়। যতদিনে ও সেটেল হয়েছে আর দেশে ফিরে এসেছে তারপর আমি ওকে বিয়ের কথা বললাম।

-আমাকে আরেকটু সময় দিবে ফারিয়া। বাড়িটা একটু ঠিকঠাক করি। দোতলা একটা বাড়ি করবো। একটা ফ্লোরে বাবা-মা থাকবে আর একটা ফ্লোরে আমরা। ছোট বোনটারও বিয়ের কথা চলছে। তখন তো বাড়ি ফাঁকা তুমি গিয়ে বাবা-মায়ের মেয়ের অভাব পূরণ করে দেবে।

রাতুলের ছোট বোনের বিয়ে হলো, ওদের বাড়ি কমপ্লিট হলো। কিন্তু রাতুল তার কথা রাখলো না। আমার বাড়িতে বিয়ের প্রপোজাল পাঠালো না। প্রায় প্রতিদিনই যে কয়েক মিনিট ওর সাথে আমার কথা হয় তা শুধু ঝগড়া বাকি সময় ওর ফোনে আমি ওয়েটিং পাই। আমি কখনোই সন্দেহ বাতিকগ্রস্থ মেয়ে ছিলাম না অন্তত রাতুলকে নিয়ে না। একদিন ঝগড়ার ফাঁকে ও বলেই ফেললো,

-তোমাকে এতদিন বলিনি বাবা-মায়ের তোমাকে পছন্দ না।
-পছন্দ না! কেন? আমি খুবই অবাক হলাম
-দেখো ফারিয়া বুঝতে চেষ্টা করো তোমার বয়স এখন ৩২ কোন ৩২ বছর বয়সী বুড়ি মেয়েকে আমার বাবা-মা নিশ্চয়ই আমার বউ হিসেবে চাইবে না তাছাড়া নিজের চেহারা আয়নায় দেখেছো ,আমার সাথে তোমার যায়? আমি কথাগুলো তোমাকে এভাবে বলতে চাইনি কিন্তু তুমি নিজে শুনতে চেয়েছো। দয়া করে আমাকে আর বিরক্ত করো না।
আমি আর কিছুই বলিনি কার জন্য সারা জীবন এত সেক্রিফাইস করলাম! কিন্তু আমার দেখার আরো অনেক কিছু বাকি ছিল।

আমার বাসায় রাতুলের প্রপোজাল এসেছিল কিন্তু সেটা আমার জন্য না আমারই ২৩ বছর বয়সী ছোট বোন ফারহানার জন্য। ছেলে এস্টাবলিস্ট, বড় ভাই দেশের বাইরে সেটেল্ড, দুই বোনের বিয়ে হয়ে গেছে, বাড়িতে শুধু বাবা-মা এমন পরিবার কে ছাড়তে চায়? আমার পরিবার ব্যতিক্রম না।

আমি অবাক হলাম আর কেউ না জানুক অন্তত আমার বোন ফারহানা তো জানতো আমার সাথে রাতুলের সম্পর্কটা। রাতে কাঁদতে কাঁদতে বিধ্বস্ত হয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম,

-তুই এই বিয়েতে রাজি হলি কি করে?
-আপা তুই বোকা, দেখ আমার মত বয়সে তোরও অনেক ভালো ভালো সম্বন্ধ এসেছিল কিন্তু তুই সেগুলো বাতিল করে দিয়েছিস। আমিও একটা ছেলের সাথে সম্পর্কে আছি কিন্তু তার মানে এই না যে সেই ছেলে এস্টাবলিস্ট হওয়ার আগ পর্যন্ত আমি অপেক্ষা করবো। আমি তোর বয়সে পৌঁছাবো আর সে আমাকে রিজেক্ট করে দিবে। তার চেয়ে এই কি ভালো না এখনই একটা ভালো ছেলে বিয়ে করে নেই। এখানে রাতুল না হয়ে অন্য যেকোনো ছেলে হলেও আমি রাজি হয়ে যেতাম।
-তুই রাতুল রাতুল করছিস কেন? আগে তো ঠিক ভাইয়া সম্বোধন করতি।
-আমি আমার হবু বরকে নিশ্চয়ই ভাইয়া ডাকবো না। তির্যক একটা হাসি দিল ফারহানা যেটা আমার বুকে শুলের মত বিধলো।

আজ ওদের বিয়ে, সারা বাড়িতে উত্তেজনা সবাই ছোটাছুটি করছে। সিলিং ফ্যানটার দিকে অনেকক্ষণ ধরে তাকিয়ে ছিলাম এই জীবন রেখে আর কি লাভ?

হঠাৎ আমার ভ্রম ভাঙলো। আমার কি দোষ, আমি কেন মরবো? বাঁচার অধিকার আমার আছে। হ্যাঁ এখন যেটা করতে চলেছি সেটা হয়তো ভুল কিন্তু আমি করবো সজ্ঞানে করবো, উঠে রেডি হয়ে নিলাম। নিজের কিছু কাপড়চোপড় আর প্রয়োজনীয় সামগ্রী একটা ট্রলি ব্যাগে ভরলাম। চলে গেলাম মায়ের রুমে, জানি চাবি কোথায় থাকে। দ্বিতীয় বারের মতো গয়না চুরি করলাম যেগুলো ফারহানার জন্য রাখা হয়েছিল। এবং সেটা অতি দ্রুত করলাম কারণ পার্লার থেকে মেয়েরা চলে এসেছে। ওকে হয়তো সাজাচ্ছে এখনই গয়নার খোঁজে আসবে। ছোট্ট একটা চিরকুট রাখলাম।

"ফারহানা, আমার বিয়ের জন্য রাখা গয়না গুলো রাতুলের কাছে আছে। ওর কাছ থেকেই নাহয় নিয়ে নিস। মা তো একই রকম গড়িয়েছিল আমাদের দুজনের জন্য। তোরটা তোর রাতুলের কাছে আর আমারটা আমি নিয়ে গেলাম।"

ব্যাস বের হয়ে এলাম, কেটে গিয়েছিল আর আট বছর। কিছু জমানো টাকা আর গয়না বিক্রি করে একটা ছোটখাটো দোকান ভাড়া করে টেইলার্সের বিজনেস শুরু করেছিলাম। সেলাই টা আগেই শিখেছিলাম। কলেজ লাইফ থেকেই নিজের জামা কাপড় নিজেই সেলাই করতাম এবং বান্ধবীদেরকেও অনেক ড্রেস বানিয়ে দিয়েছি। প্রথমে আমি একা শুরু করলেও এখন আমার সাথে তিনটে মেয়ে কাজ করে। যেহেতু আমি খুব যত্ন নিয়ে ড্রেসগুলো সেলাই করি এবং মেয়েগুলো কেউ দেখিয়ে দেই তাই বিভিন্ন অকেশনে দিনরাত পরিশ্রম করতে হয়। এছাড়াও সারা বছর বিজনেস আমাকে ভালই লাভ দিয়েছে। না বিয়ে আমি করিনি, কাকে করব? হয়তো সেই ছেলেটা অন্য কোন মেয়েকে ঠকিয়ে এসেছে অথবা আমাকে ঠকানোর জন্য আসবে আমার এই ব্যবসা দেখে? আমি জানি সবাই একরকম হয় না কিন্তু সেই ভিন্ন মানুষটিকে আমি বাছাই করবো কি করে? তাই একা থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

শুনেছি ফারহানা আর রাতুলের ডিভোর্স হয়ে গেছে। আমার বুদ্ধিমতী মা তৎক্ষণাৎ বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ভয়ে গোল্ডের জায়গায় গোল্ডপ্লেটের গয়না মেয়েকে পরিয়ে বিদায় করেছিল। যদিও একটু খেয়াল করলেই সেটা বোঝা যায় হয়তো ফারহানার লাক ভালো ছিল ।নাকি খারাপ ছিল ? তা না হলে তো ডিভোর্স হত না। যখন রাতুল আর ওর ফ্যামিলি যখন বিষয়টা জানতে পারে তখন ওর গায়ে হাত তোলা শুরু করে। আমার বোনকে আমি ভাল করেই চিনি সে নিঃশব্দে মার খাওয়ার মেয়ে না। নারী নির্যাতন মামলা না করাটাই ওর জন্য অস্বাভাবিক। রাতুলের চাকরি গেছে, জেল খেটেছে, দুজনের ডিভোর্স হয়েছে।

আমি জানি আমি খারাপ। বোনের কথা চিন্তা করিনি প্রাণ উজাড় করে যাকে ভালবাসতাম তার কথাও চিন্তা করিনি। কিন্তু ওরা দুজন কি আমার কথা চিন্তা করেছিল? রাতুল না হইল ঠিক কিন্তু আমার নিজের বোন তো আমার কথা চিন্তা করতে পারতো। সে অন্য যেকোনো ছেলেকে বিয়ে করতো, রাতুলকেই কেন?

আমার মধ্যে কোন অনুশোচনা নেই আমি একা আছি, ভালো আছি, শান্তিতে আছি।

#অনুশোচনা
কলমে:সুবর্না শারমিন নিশী

22/09/2025

কিছু তিক্ত সত্য কথা বলছি!!
কেউ কষ্ট পেলে অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এটি একান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ। কাউকে আঘাত দেওয়া উদ্দেশ্য নয়!!
মেয়েদের অনার্স, মাস্টার্সে পড়ালেখার পাশাপাশি বিয়ে,সন্তান নিয়ে একটা প্লানিং করতে হবে। অনার্স ফার্স্ট ইয়ার থেকেই আলাদা সময় বের করতে হবে চাকরীর পড়াশোনার জন্য।
মাস্টার্স শেষ করার পর আরও ৫ বছর যদি সময় নেন চাকরী আর বিয়ের জন্য তাহলে ভীষণ রকম টাইমিং গ্যারাকলে ফেঁসে যাবেন।
ত্রিশের ছুঁই ছুঁই মাতৃত্ব খুব কষ্টকর। একটা বাচ্চা লালন-পালনের জন্য প্রচুর স্ট্যামিনা দরকার। প্রচুর মানে প্রচুর।
এই আমাকেই আমার রুমমেটরা আয়রন লেডি বলত। আমার বডি ওয়েট একটা নির্দিষ্ট ফ্রেমে বেঁধে রাখতাম। রাখী নামের এক বান্ধবী আফসোস করে বলতো এই মেয়ের কখনো জ্বর হয় না, না কখনো পিরিয়ডের ব্যথায় শুয়ে থাকে। এলওয়েজ একটিভ।

তখন সকাল সাড়ে আটটা থেকে দেড়টা পর্যন্ত ডিপার্টমেন্টে ক্লাস শেষ করে ক্যান্টিনে দুপুরে খেয়েই লাইব্রেরীতে বসতাম। রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত ওখানেই থাকতাম।

এরপর লাইব্রেরী থেকে রাতের খাবার খেয়ে রুমে ব্যাগ রেখে গোসল করে নামাজ পড়ে আবার গল্পের বই বা আউটবুক পড়ে রাত ১১ বা ১২ টায় ঘুমাতাম।

এই একঘেয়েমি রুটিন মোটামুটি ২০১২-২০১৮ এর শেষ পর্যন্ত। এই যে টানা ১৪ বা ১৫ ঘন্টা লাইব্রেরীতে বসে থাকা মানুষ প্রেগন্যান্সির সময় পুরোপুরি অসুস্থ হয়ে পরলাম। জেস্টেশনাল ডায়বেটিস, প্লাসেন্টাল ইনসাফিশিয়েন্সি, আয়রন স্বল্পতা, ব্লাড প্রেশার, উইকনেস, থাইরয়েডের সমস্যা সব একসাথে জেঁকে বসলো।

আমার মতন সুপার সুস্থ মানুষের ও যে এতো অসুখ হতে পারে, এটা আমার শত্রুর কাছেও অবিশ্বাস লাগবে। আর বাচ্চা হবার পর তার যত্ন নেওয়ার জন্য যে পরিশ্রম করা দরকার তা মধ্যবয়সে তা করা খুবই কঠিন।

আমার এরপর আর একটা বাচ্চা নিতে হবে এটা ভাবলেই কান্না আসে। মনে মনে কল্পনা করি ঘুম থেকে উঠে দেখতাম আমি ছেলে হয়ে গেছি...! এমন আজব কল্পনাও আসে মাঝে মাঝে।

তাই আমার বোন সকল,

নিজের খেয়াল রাখবেন। মেকাপ বক্সের পাশাপাশি সুপার ফুড যেমন ডিম,বাদাম,দুধ (আমি এগুলো মেইনটেইন করেও ভীষণ ক্লান্ত) নিজেকে উপহার দিন। মানসিক এবং শারীরিক স্বাস্থ্যের প্রতি যত্নবান হোন।আর ভার্সিটির সময়ে শুধু আড্ডায় থেকে এবং অযত্ন আর অবহেলায় সময় নষ্ট না করে...নিয়মিত পড়াশোনায় থাকতে হবে এবং ক্যারিয়ার প্ল্যান করতে হবে। ২৭/২৮ বছরে মাস্টার্স শেষ করে ৩২ বছর পর্যন্ত বিসিএসের প্রস্তুতি নেওয়া বোকামি। যদি চাকরী করতেই হয় তবে জীবনের শুরু থেকেই অর্থাৎ ফার্স্ট ইয়ার থেকে শুরু করতে হবে।

একটা মেয়েকে অনেক দায়িত্ব নিতে হয়। নারীকে জীবনের নানা বাঁক পারি দিতে হয়। এই পথে পা দিতে হলে টাইমিং এর দিকে নজর দিতে হবে, নিজেকে ভালোবাসতে হবে, নিজের খেয়াল রাখতে হবে!!

©️ Mansura Mou

21/09/2025

"রায়ান, আমার খুব ভয় করছে। ওরা হয়তো জেনে গেছে।"

ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে আসা চাপা, আতঙ্কিত কণ্ঠস্বরটা রায়ানের হৃৎপিণ্ডটাকে এক মুহূর্তের জন্য থামিয়ে দিলো।

নীলাঞ্জনা! সাত বছর! পুরো সাতটা বছর পর এই কণ্ঠস্বর শুনছে সে। যে কণ্ঠস্বর একদিন তার সকাল-সন্ধ্যার সঙ্গী ছিলো, যে কণ্ঠস্বর শোনার জন্য সে উন্মুখ হয়ে থাকতো, সেই কণ্ঠেই আজ রাজ্যের ভয় আর অবসাদগ্রস্ত।

শ্রীমঙ্গলের চা বাগানে ঘেরা তার কাঠের বাংলোর বারান্দায় বসেছিলো রায়ান। চারপাশে তখন কুয়াশা আর নীরবতার এক শীতল চাদর। এই নীরবতাই গত সাত বছর ধরে তার একমাত্র সঙ্গী। সে কফি কাপটা নামিয়ে রেখে শক্ত গলায় বললো,
"নীলাঞ্জনা? এতো বছর পর... কী জেনে গেছে? কারা জেনে গেছে?"

"আমি সবটা ফোনে বলতে পারবো না।"
নীলাঞ্জনার গলা কাঁপছিলো।
"রায়ান, আমি কি তোমার কাছে আসতে পারি? মাত্র দুটো দিনের জন্য। প্লিজ! আমার আর কেউ নেই যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি।"

রায়ানের ভেতরটা তোলপাড় হয়ে গেলো। যে মেয়েটা সাত বছর আগে এক ঝড়বৃষ্টির রাতে তার জীবন থেকে চিরদিনের মতো হারিয়ে গিয়েছিলো, তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো তার দেওয়া শেষ চিঠিটা, আজ সে-ই তার কাছে আশ্রয় চাইছে! রায়ানের কঠিন, আবেগহীন মুখোশের আড়ালে লুকিয়ে থাকা পুরোনো ক্ষতটা চিনচিন করে উঠলো। তার বলতে ইচ্ছে করছিলো, ‘না’। বলতে ইচ্ছে করছিলো, ‘যে চলে গেছে, তার ফেরার পথ থাকে না’। কিন্তু সে পারলো না।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে শুধু বললো,
"ঠিকানাটা তোমার মনে আছে?"

"আমার সবকিছু মনে আছে, রায়ান।"
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক ভেজা কণ্ঠ।

পরদিন বিকেলে, যখন চা বাগানের ওপর বিকেলের নরম আলো এসে পড়েছে, তখন একটা গাড়ি এসে থামলো রায়ানের বাংলোর সামনে। গাড়ি থেকে নামলো নীলাঞ্জনা। আগের মতোই সুন্দর, আগের মতোই অভিজাত। পরনে দামী সিল্কের শাড়ি, চোখে ব্র্যান্ডেড সানগ্লাস। শুধু সেই আগের উচ্ছলতাটা নেই। তার পুরো শরীরে যেনো এক অদৃশ্য ভয়ের চাদর জড়ানো।

রায়ান দরজা খুলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। নীলাঞ্জনা তার দিকে তাকিয়ে একটা ফ্যাকাশে হাসি হাসার চেষ্টা করলো।

"ভেতরে আসতে বলবে না?"
নীলাঞ্জনার গলায় অভিমানের সুর।

রায়ান সরে দাঁড়িয়ে পথ করে দিলো।
"ভেতরে এসো।"

ঘরের ভেতরে ঢুকে নীলাঞ্জনা চারদিকে তাকালো। সবকিছু আগের মতোই আছে। বইয়ের তাক, পুরোনো গ্রামোফোন, দেয়ালে ঝোলানো সাদা-কালো ছবিগুলো। শুধু মানুষ দুটো বদলে গেছে। তাদের মাঝে এখন সাত বছরের এক অদৃশ্য দেয়াল।

"কফি খাবে?"
রায়ানের সংক্ষিপ্ত প্রশ্ন।

" খাবো।"
নীলাঞ্জনা সোফায় বসতে বসতে বললো।

রান্নাঘর থেকে কফি বানানোর শব্দ আসছিলো। নীলাঞ্জনা তাকিয়ে দেখছিলো রায়ানকে। পিঠটা আগের চেয়ে একটু ঝুঁকে গেছে, চুলে রুপোলি ছাপ পড়েছে। চোখের নিচে কালি। সেই আগের দুরন্ত, জেদি সাংবাদিক রায়ান আর নেই। তার জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে এক ক্লান্ত, পরাজিত মানুষ।

কফি নিয়ে এসে রায়ান সামনের চেয়ারে বসলো। দুজনেই চুপ। বাইরের ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই।

অবশেষে রায়ানই নীরবতা ভাঙলো।
"এবার বলো, কী হয়েছে?"

নীলাঞ্জনা কফি কাপটা হাতে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলতে শুরু করলো।
"বাবা মারা যাওয়ার আগে আমাকে একটা বাক্স দিয়ে গিয়েছিলেন। বলেছিলেন, খুব বিপদে না পড়লে যেনো না খুলি। বাবা ছিলেন একজন আর্ট রেস্টোরার, মনে আছে?"

রায়ান মাথা নাড়লো।

"গত সপ্তাহে আমার টাকার খুব দরকার হওয়ায় আমি বাক্সটা খুলি। ভেবেছিলাম, হয়তো পুরোনো গয়না আছে। কিন্তু ভেতরে ছিলো একটা ডায়েরি আর একটা মেমোরি কার্ড। ডায়েরিটা বাবার লেখা। আর সেখানে লেখা আছে... লেখা আছে সাত বছর আগের সেই রাতের কথা।"

রায়ানের হাতটা শক্ত হয়ে মুষ্টিবদ্ধ হয়ে গেলো। সাত বছর আগের সেই রাত! যে রাতে তাদের পত্রিকার প্রধান সোর্স, একজন নিরীহ আর্ট ডিলার, এক ভয়ংকর ‘সড়ক দুর্ঘটনায়’ মারা গিয়েছিলো। যে রাতে রায়ান আর নীলাঞ্জনাও প্রায় মরতে বসেছিলো।

নীলাঞ্জনা বলতে লাগলো,
"বাবা আসলে আর্ট ডিলার ছিলেন না, রায়ান। তিনি ছিলেন একজন আন্ডারকভার এজেন্ট। তিনি দেশের বাইরে থেকে চুরি হয়ে যাওয়া পুরোনো দিনের শিল্পকর্ম উদ্ধার করতেন। তিনি কাজ করছিলেন শহরের সবচেয়ে নামকরা শিল্পপতি, ‘শিল্পায়ন’ এর মালিক, জনাব কবীর চৌধুরীর বিরুদ্ধে।"

কবীর চৌধুরী! নামটা শুনে রায়ানের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেলো। শহরের সবচেয়ে সম্মানিত, সবচেয়ে বড়ো লোকহিতৈষী মানুষ। যার হাসিমুখের ছবি ছাড়া কোনো পত্রিকা সম্পূর্ণ হয় না।

"কবীর চৌধুরী লোকদেখানো শিল্পের ব্যবসা করে। কিন্তু এর আড়ালে সে আন্তর্জাতিক চোরাচালান চক্রের মূল হোতা। বাবা তার সব প্রমাণ জোগাড় করে ফেলেছিলেন। সেই রাতে বাবা আমাদের সাথে দেখা করতে আসছিলেন সব প্রমাণ তুলে দেওয়ার জন্য। কিন্তু কবীর চৌধুরী আগেই খবর পেয়ে যায়। সে বাবাকে..."
নীলাঞ্জনার গলা ধরে এলো।
"সেদিনের ওই দুর্ঘটনাটা ছিলো একটা সাজানো খুন, রায়ান।"

রায়ান স্তব্ধ হয়ে বসে রইলো। তাহলে এই ছিলো সত্যি! যেটাকে তারা একটা মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ভেবে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিলো, সেটা ছিলো একটা ঠান্ডা মাথার খুন।

"ডায়েরিটা পড়ার পর আমি কবীর চৌধুরীকে ফোন করেছিলাম।"
নীলাঞ্জনা বললো।
"আমি বোকার মতো তাকে বলেছিলাম, আমার কাছে সব প্রমাণ আছে। আমি শুধু চেয়েছিলাম, সে যেনো তার অপরাধ স্বীকার করে। কিন্তু সে আমাকে হুমকি দিলো। বললো, প্রমাণগুলো তার হাতে তুলে না দিলে আমার অবস্থাও আমার বাবার মতো হবে। আমি ভয় পেয়ে তোমার কাছে চলে এসেছি, রায়ান। আমি জানি না, আমার কী করা উচিত।"

রায়ান উঠে গিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ালো। বাইরে অন্ধকার ঘনিয়ে আসছে। চা বাগানের ওপর কুয়াশা নামছে। তার মনে হচ্ছিলো, এই কুয়াশার মতোই এক ভয়ংকর বিপদ তাদের ঘিরে ধরছে।

সে নীলাঞ্জনার দিকে না ফিরেই বললো,
"তুমি খুব বড়ো ভুল করেছো, নীলাঞ্জনা। কবীর চৌধুরীকে ফোন করে তুমি তাকে জানিয়ে দিয়েছো, প্রমাণগুলো কোথায় আছে। সে এখন চুপ করে বসে থাকবে না।"

"তাহলে আমরা এখন কী করবো?"
নীলাঞ্জনার কণ্ঠে তীব্র আতঙ্ক।

"জানি না।"
রায়ান শান্ত গলায় বললো।
"তবে একটা কথা জানি। সাত বছর আগে আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। ভয় পেয়েছিলাম। আমার ভুলের জন্যই হয়তো তোমার বাবার খুনের বিচার হয়নি। কিন্তু আজ রাতে আমি পালাবো না।"

সেই রাতটা ছিলো ভয়ংকর। বাংলোর চারপাশে অচেনা পায়ের শব্দ, শুকনো পাতার ওপর দিয়ে হেঁটে যাওয়ার খসখস আওয়াজ। ফোনের লাইন ডেড, মোবাইল নেটওয়ার্ক জ্যাম করে দেওয়া হয়েছে। তারা বুঝতে পারছিলো, তারা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন, আটকা পড়েছে।

নীলাঞ্জনা ভয়ে রায়ানের শার্টের খুঁট ধরে বসেছিলো। রায়ান তাকে সাহস দিয়ে বললো,
"ভয় পেয়ো না। আমি আছি।"

"আমার ভয়ের কারণটা অন্য, রায়ান।"
নীলাঞ্জনা ফিসফিস করে বললো।
"সেদিন... সাত বছর আগে, আমি কেনো তোমাকে ছেড়ে গিয়েছিলাম, জানো?"

রায়ান চুপ করে রইলো।

"কবীর চৌধুরী সেদিন আমাকেও হুমকি দিয়েছিলো। সে বলেছিলো, আমি যদি তোমার জীবন থেকে সরে না যাই, তাহলে সে তোমাকে মেরে ফেলবে। আমি তোমাকে বাঁচানোর জন্য সেদিন তোমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলাম, রায়ান। আমি স্বার্থপরের মতো অভিনয় করেছিলাম।"

রায়ানের বুকের ভেতরের সব অভিমান, সব রাগ এক মুহূর্তে গলে পানি হয়ে গেলো। সে নীলাঞ্জনার দিকে ফিরলো। তার মায়াবী চোখ দুটো জলে ভরে আছে। রায়ান আলতো করে তার চোখের পানি মুছিয়ে দিলো।

"আমিও বোকা ছিলাম।"
রায়ান বললো।
"আমি ভেবেছিলাম, তুমি আমার ব্যর্থতার জন্য আমাকে ছেড়ে গেছো। আমি তোমার ওপর রাগ করে নিজেকে এই জঙ্গলে নির্বাসন দিয়েছিলাম।"

সাত বছরের জমে থাকা সব ভুল বোঝাবুঝি, সব না বলা কথা যেনো সেই ভয়ংকর রাতে তাদের এক করে দিলো। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তারা প্রথমবারের মতো অনুভব করলো, তারা একে অপরকে কতটা ভালোবাসে।

ভোররাতের দিকে বিপদটা এলো। বাংলোর দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকলো কয়েকজন মুখোশধারী লোক। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র।

কিন্তু রায়ান এবার প্রস্তুত ছিলো। সে জানতো, এমন কিছুই ঘটবে। সে তার পুরোনো সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছিলো। সে বাংলোর বিভিন্ন জায়গায় কয়েকটা গোপন ক্যামেরা লাগিয়ে রেখেছিলো আর একটা শক্তিশালী অ্যালার্ম সিস্টেম তৈরি করেছিলো, যা সরাসরি স্থানীয় পুলিশ স্টেশনের সাথে যুক্ত ছিলো।

লোকগুলো ভেতরে ঢোকার সাথে সাথেই তীব্র স্বরে অ্যালার্ম বেজে উঠলো। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই রায়ান আর নীলাঞ্জনা পেছনের একটা গোপন দরজা দিয়ে বেরিয়ে চা বাগানের গভীরে মিলিয়ে গেলো।

কিন্তু মূল বিপদটা ছিলো বাইরে। স্বয়ং কবীর চৌধুরী তার গাড়ি নিয়ে দাঁড়িয়েছিলো। সে জানতো, পুলিশ আসতে সময় লাগবে।

সে রায়ান আর নীলাঞ্জনাকে বাগানের মধ্যে খুঁজে বের করলো। তার হাতে একটা পিস্তল।

"খেলা শেষ, রায়ান।"
কবীর চৌধুরী হাসলো।
"ডায়েরি আর মেমোরি কার্ডটা আমাকে দাও। তোমাদের দুজনকে আমি শান্তিতে মরতে দেবো।"

রায়ান নীলাঞ্জনাকে তার পেছনে আড়াল করে বললো,
"আপনার খেলা অনেক আগেই শেষ হয়ে গেছে, কবীর সাহেব। আপনি হয়তো জানেন না, গত দুই ঘণ্টা ধরে আপনার প্রতিটি কথা, আপনার প্রতিটি পদক্ষেপ সরাসরি ইন্টারনেটে লাইভ স্ট্রিম হচ্ছে।"

কবীর চৌধুরী চমকে উঠলো।
"কী!"

"হ্যাঁ।"
রায়ান তার শার্টের বোতামের আড়ালে লুকিয়ে রাখা একটা ক্ষুদ্র ক্যামেরা দেখালো।
"সারা দেশ এখন আপনার আসল রূপ দেখছে। আপনার লোকহিতৈষী মুখোশের আড়ালের খুনি চেহারাটা সবাই চিনে গেছে।"

কবীর চৌধুরীর পায়ের নিচের মাটি যেনো সরে গেলো। সে মরিয়া হয়ে পিস্তলটা রায়ানের দিকে তাক করলো। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে চা বাগানের ভেতর থেকে পুলিশের হুইসেলের শব্দ ভেসে এলো।অবশেষ এক দুর্ধর্ষ অপারেশনের পর কবীর আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা পুলিশের হাতে ধরা পড়লো।

এক বছর পর।

ঢাকার এক আর্ট গ্যালারিতে নীলাঞ্জনার আঁকা ছবির প্রদর্শনী চলছে। প্রদর্শনীর নাম ‘সাত বছর পর’। প্রতিটি ছবিতে ফুটে উঠেছে শ্রীমঙ্গলের সেই চা বাগান, সেই কুয়াশা, সেই কাঠের বাংলো আর দুটো মানুষের ভয়, আশা আর ভালোবাসার প্রতিচ্ছবি।

প্রদর্শনীর সবচেয়ে বড়ো ছবিটার সামনে এসে দাঁড়ালো নীলাঞ্জনা। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে, ভোরের আলোয় একটা কাঠের বাংলোর বারান্দায় দুটো কাপ থেকে ধোঁয়া উড়ছে।

পেছন থেকে একটা পরিচিত কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
"ছবিটা অসমাপ্ত মনে হচ্ছে, তাই না?"

নীলাঞ্জনা ঘুরে তাকালো। রায়ান। তার মুখে এখন আর সেই ক্লান্তি বা পরাজয়ের ছাপ নেই। বরং সেখানে এক গভীর শান্তি।

নীলাঞ্জনা হাসলো।
"অসমাপ্ত কেনো?"

"কারণ ছবিটায় দুটো মানুষ নেই।"
রায়ান নীলাঞ্জনার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললো।
"যে দুটো মানুষ ওই কফি কাপের উষ্ণতা ভাগ করে নেওয়ার জন্য সাত বছর অপেক্ষা করেছে।"

রায়ান তার পকেট থেকে একটা পুরোনো, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া ট্রেন টিকিট বের করলো। সাত বছর আগের সেই টিকিট, যেটাতে করে তাদের একসাথে শ্রীমঙ্গল যাওয়ার কথা ছিলো।

সে টিকিটটা নীলাঞ্জনার হাতে দিয়ে বললো, "আমাদের শেষ ট্রেনটা হয়তো আমরা মিস করেছিলাম, নীলাঞ্জনা। কিন্তু জীবন আমাদের জন্য নতুন একটা যাত্রা শুরু করার সুযোগ দিয়েছে। যাবে আমার সাথে?"

নীলাঞ্জনার চোখ দিয়ে টপ করে এক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়লো। সে কোনো কথা না বলে রায়ানের হাতটা শক্ত করে ধরলো। গ্যালারির বড়ো কাঁচের জানালা দিয়ে তখন শেষ বিকেলের আলো এসে পড়ছিলো। সেই আলোয় তাদের দুজনের ছায়া এক হয়ে মিশে গিয়েছিলো। যে হুইসেল একদিন তাদের বিচ্ছেদের সঙ্কেত দিয়েছিলো, সেই হুইসেলই যেনো আজ নতুন করে একসাথে পথ চলার গান শোনাচ্ছিলো। তাদের হৃদয় তখন আর ভয়ে বা উত্তেজনায় নয়, বরং এক শীতল, গভীর শান্তিতে পূর্ণ।

( #সমাপ্ত.....)

#১পর্বের_গল্প
#শেষ_ট্রেনের_হুইসেল
#ইয়াছির_আরাফাত_রামিম

Address


Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Dropout's Canvas posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Dropout's Canvas:

  • Want your business to be the top-listed Media Company?

Share