09/01/2026
দুঃশীল ভিক্ষুদের দান করলে ফল হয় কি?
- আসীন অগ্রবংশ
শিরোনামে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে আমাদের প্রথমে জানতে হবে, দুঃশীল মানেটা কী। ভিক্ষুর দুঃশীল মানেটা হচ্ছে, ব্রহ্মচারী হয়ে ব্রহ্মচারীর নিয়ম পালন করে না বলে তাকেই দুঃশীল বলা হয়। তাই এই দুঃশীল ভিক্ষু অপায়ে পড়ে, নরকে স্থান পায়। (ই.বু.২.৪৮)
আরেকটু সহজভাবে বুঝাতে গেলে যাঁরা কণ্ঠে কাষায়বস্ত্র পরেও অসংযত হয় ও পাপাচরণ করে অর্থাৎ প্রাণীহত্যাকারী হয়, অদত্তবস্তু গ্রহণ করে, অব্রহ্মচারী হয়, মিথ্যা ভাষণ করে এবং সুরা-মৈরেয়-মদ্যপায়ী হয় তাঁরাই নরকে যায়। এবং সেখান থেকে চ্যুত হয়ে বিপাকাবশেষে প্রেতলোকেও উৎপন্ন হয়ে মহাদুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করে। (ধর্মপদ.৩০৭; অ.নি.৫.২৮৬)
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে। দান দেওয়া কিন্তু উভয়ই পক্ষে বিচার করা হয়। অর্থাৎ যেকোনে দান করার সময় দানের ফল দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের উপর নির্ভর করে বৃদ্ধি ও হ্রাস পায়। সেজন্য বুদ্ধ বলেছেন, ‘হে আনন্দ, বিশুদ্ধ চার প্রকার। সেগুলো হলো,
১। দাতা শীলবান ও কল্যাণধর্মী কিন্তু গ্রহীতা দুঃশীল ও পাপধর্মী হয়। (অর্থাৎ যেই শীলবান ব্যক্তি কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে সম্যকভাবে জীবন-জীবিকা করে উপার্জিত ধন-সম্পদ (টাকা-পয়সা) প্রসন্নচিত্তে দুঃশীলকে দান করেন, তাহলে সেই দান দাতার থেকে বিশুদ্ধ হয়, কিন্তু গ্রহীতা থেকে নয়।)
২। গৃহীতা শীলবান ও কল্যাণধর্মী কিন্তু দাতা দুঃশীল ও পাপধর্মী হয়। (অর্থাৎ যেই দুঃশীল ব্যক্তি মিথ্যাভাবে জীবন-জীবিকা করে উপার্জিত ধন-সম্পদ (টাকা-পয়সা) কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস না রেখে প্রসন্নচিত্তে শীলবানকে দান করেন, তাহলে সেই দান গ্রহীতা থেকে বিশুদ্ধ হয়, কিন্তু দাতার থেকে নয়।)
৩। দাতা ও গ্রহীতা দুজনেই দুঃশীল ও পাপধর্মী হয়। (অর্থাৎ যেই দুঃশীল ব্যক্তি মিথ্যাভাবে জীবন-জীবিকা করে উপার্জিত ধন-সম্পদ (টাকা-পয়সা) কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস না রেখে প্রসন্নচিত্তে দুঃশীলকে দান করেন, তাহলে সেই দান বিপুল ফলপ্রসু (উপকারী) হয় না। কারণ তারা উভয়ই দুঃশীল ও পাপাধর্মী।)
৪। দাতা ও গ্রহীতা দুজনেই শীলবান ও কল্যাণধর্মী হয়। (অর্থাৎ যেই শীলবান ব্যক্তি কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে সম্যকভাবে জীবন-জীবিকা করে উপার্জিত ধন-সম্পদ (টাকা-পয়সা) প্রসন্নচিত্তে শ্রদ্ধা-সহকারে শীলবান ব্যক্তিকে দান করেন, তাহলে সেই দান বিপুল ফলপ্রসু (উপকারী) হয়। কারণ তারা উভয়ই শীলবান ও কল্যাণধর্মী।) (ম.নি.৩.৩৮১)
আবার যেই বীতরাগ ব্যক্তি কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে সম্যকভাবে জীবন-জীবিকা করে উপার্জিত ধন-সম্পদ (টাকা-পয়সা) প্রসন্নচিত্তে, শ্রদ্ধা-সহকারে ও উদার হৃদয়ে বীতরাগ ব্যক্তিকে দান করেন, তাহলে সেই দান আরো শ্রেষ্ঠ হয়। (ম.নি.৩.৩৮২)
এখান থেকে পরিষ্কার বুঝা যায়, কর্মফলের প্রতি বিশ্বাস রেখে চেতনাকে পরিশুদ্ধ করে তবেই দান দিতে হয়। যেমন ত্রিচেতনা (আগে বর্তমান ও পরে) পরিশুদ্ধ হলে দানের ফল আরো আশানুরূপ হয়। তাই উভয়ের প্রতি নির্ভর করে দানের ফলাফল হয়।
সুতরাং দান কাকে দিবেন সেটা আপনার চেতনার উপর নির্ভর করে। সেজন্য বুদ্ধ দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে বলেছেন, চৌদ্দ প্রকার পুগ্গলি দানের মধ্যে দুঃশীল ব্যক্তিকেও দান দেয়া যায়। সেই চৌদ্দ প্রকার ব্যক্তি দান গ্রহণের যোগ্য কারা? যথা—
১। সম্যসম্বুদ্ধকে,
২। পচ্চেক (প্রত্যক) বুদ্ধকে,
৩। অর্হত্ব ফলে স্থিত ব্যক্তিকে,
৪। অর্হত্ব মার্গে স্থিত ব্যক্তিকে,
৫। অনাগামী ফলে স্থিত ব্যক্তিকে,
৬। অনাগামী মার্গে স্থিত ব্যক্তিকে,
৭। সকৃতাগামী ফলে স্থিত ব্যক্তিকে,
৮। সকৃতাগামী মার্গে স্থিত ব্যক্তিকে,
৯। স্রোতাপত্তি ফলে স্থিত ব্যক্তিকে,
১০। স্রোতাপত্তি মার্গে স্থিত ব্যক্তিকে,
১১। শাসন বহির্ভূত সময়ে ধ্যানলাভী ঋষিকে,
১২। শীলবান পৃথকজনকে,
১৩। দুঃশীল পৃথকজনকে এবং
১৪। তির্যক প্রাণীকে। (ম.নি.৩.৩৭৯)
এখানে লক্ষ্য করুন, বুদ্ধ কিন্তু দানের ফল পার্থক্য হওয়াটা এখানে বলেছেন। কিন্তু যে দুঃশীল ব্যক্তিকে দান দিলে ফল হবে না এমন কথা বুদ্ধ বলেননি। শুধু দানের ফলাফল প্রভেদ হয় এই কথা বলেছেন। তাই বুদ্ধ বলেছেন দান দেওয়ার আগে কাকে দিবেন, কাকে দিলে দানের ফল বেশি হয় সেটা দাতার উপর নির্ভর করে।
"এখন প্রশ্ন হচ্ছে দুঃশীল ভিক্ষু তাঁর দানকে কতটা বিশুদ্ধ করতে পারেন।" দশটি গুণ থাকার কারণে তাঁর নিজের প্রাপ্ত দান বিশুদ্ধ করেন।
১। ভিক্ষুবেশ বা নির্দোষ পোষাক ধারণ হেতু নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ কনে।
২। ঋষিচিহ্নের ন্যায় মুণ্ডিতমস্তক ধারণের দরুন দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৩। ভিক্ষুসংঘের অন্তর্গত হওয়ায় তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৪। বুদ্ধ, ধর্ম ও সংঘের শরণাপন্ন হওয়ার দরুন তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৫। চরম লক্ষ্যে উপনীত হবার পরিবেশে বাসের নিমিত্ত তিনি দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৬। জিনশাসনের উচ্চ বিষয় অন্বেষণে নিরত থাকায় তিনি দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৭। উত্তম ধর্মোপদেশ দিয়েও তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৮। ধর্মদ্বীপে গতিশীলতার দরুন তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
৯। বুদ্ধ সর্বাপেক্ষা শ্রেষ্ঠ’ এই বিষয়ে একান্ত সোজা ধারণা পোষণের দরুন তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন। এবং
১০। উপোসথ ব্রত পালন করার নিমিত্ত তিনি নিজের দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
যেমন যত ঘন কলল কর্দম রজ ময়লা হোক না কেন জল সমস্তই পরিষ্কার করে, সেইরূপ ভিক্ষু দুঃশীল হলেও নিজে বিপন্ন হয়ে দাতাদের প্রদত্ত দক্ষিণা সফল করে তোলেন।
যেমন সুপক্ব গরম জল প্রজ্বলিত বৃহৎ অগ্নিস্কন্ধকে নির্বাপিত করে, সেইরূপ নিজেকে বিপন্ন করেও দুঃশীল ভিক্ষু দাতাদের প্রদত্ত দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
যেমন খাদ্য সুস্বাদু না হলেও মানুষের ক্ষুধার দুর্বলতা নিবৃত্ত করে, সেইরূপ নিজের জীবন বিপন্ন করেও দুঃশীল ভিক্ষু দাতাদের প্রদত্ত দক্ষিণা বিশুদ্ধ করেন।
কারণ ভিক্ষু দুঃশীল হলেও বুদ্ধের প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ হন, ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ হন, সংঘের প্রতি শ্রদ্ধাপরায়ণ হন, সতীর্থগণের প্রতি বিশ্বাস রাখেন, ধর্মবিষয়ে অধ্যয়নশীল ও গবেষণায় উদ্যোগী হন, ধর্ম শ্রবণে বহু আগ্রহন্বিত হন, ভিক্ষু শীলভ্রষ্ট হলেও দুঃশীল অবস্থায় সভায় গমন করলে তিনি শিষ্ট ব্যবহার করেন। পরনিন্দার ভয়ে দৈহিক ও বাচনিক সংযম রক্ষা করেন, তার চিত্ত উন্নতি অভিমুখী থাকে এবং তিনি ভিক্ষু-সংজ্ঞার অন্তর্গত হন। (মি.প.৪৩-৪৪.দুঃশীলতার পার্থক্য)
একারণেই দক্ষিণাবিভঙ্গ সুত্রে গৌতমী যখন বুদ্ধকে চীবর দান করতে চেয়েছিলেন তখন বুদ্ধ বলেছিলেন, সঙ্ঘকে দাও। সঙ্ঘকে দিলে আমিও পূজিত হব, সঙ্ঘও পূজিত হবে। আবার সঙ্ঘদানের ক্ষেত্রেও ভাগ আছে। বুদ্ধসহ ভিক্ষু ও ভিক্ষুণীসঙ্ঘকে দিলে সেটা হয় সর্বশ্রেষ্ঠ সঙ্ঘদান। এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সঙ্ঘদান আর নেই। (ম.নি.৩.৩৭৬)
অতএব, গলায় অথবা এক টুকরো চীবর পরিধান করা এমন দুঃশীল ভিক্ষুদেরও যদি লোকজন অগাধ শ্রদ্ধা মনে ভিক্ষুসঙ্ঘের উদ্দেশ্য করে দান দেয় সেই দানের ফলও হয় অপরিমেয়। তবে সেখানে একটাই মনে রাখা উচিত, বর্তমানের দুঃশীল ভিক্ষুদেরকে দেখে নয়, বরং যে ভিক্ষুসঙ্ঘের মধ্যে সারিপুত্র, মোগ্গলায়ন ইত্যাদি আর্যব্যক্তিগণও আছেন, তাদের উদ্দেশ্য করে দান দেওয়া উচিত। তাহলে সেই দানের ফল হবে অগাধ, অপরিমেয়।
(কপি করার অনুমতি নেই)