30/12/2025
জুলফিকার আলি -মালদা জেলার দক্ষিণাংশে, বিশেষ করে কালিয়াচক এলাকায় শিক্ষার ক্ষেত্রে এক অদ্ভুত দ্বৈত চিত্র দেখা যাচ্ছে। গত এক দশকে এই অঞ্চলের শিক্ষার চেহারা ব্যাপকভাবে বদলে গেছে। কালিয়াচকের তিনটি ব্লককে এখন শিক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাব হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। এখানে অসংখ্য মিশন স্কুল, আবাসিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় সমাজের শিক্ষা বিস্তারে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে।
কালিয়াচকের অধিবাসীরা মূলত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ভুক্ত, অত্যন্ত পরিশ্রমী এবং কর্মঠ। এখানকার অনেক পরিবার জীবিকার জন্য ব্যবসা বা পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে অন্য রাজ্যে চলে যান। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে তারা মিশন স্কুলগুলোতে সন্তানদের ভর্তি করে দিয়ে নিশ্চিন্তে বাইরে চলে যান। এই প্রতিষ্ঠানগুলো প্রায়শই আবাসিক ব্যবস্থা সুবিধা প্রদান করে, যা দূরে থাকা অভিভাবকদের জন্য আকর্ষণীয়।
বিগত দশকে এই অঞ্চলে শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক মিশন স্কুল সমাজসেবার উদ্দেশ্য নিয়ে শুরু হয়েছে এবং গরিব ও প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে।
কালিয়াচককে বেসরকারি আবাসিক স্কুলের একটি হাব হিসেবে বর্ণনা করা হয়, যা রেশম, আম, লিচু ও ব্যবসা ছাড়াও শিক্ষাকে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ করে তুলেছে।
কিন্তু এই উন্নয়নের আড়ালে গভীর উদ্বেগের কথাও উঠে আসছে। স্থানীয় অভিভাবক ও সমাজের একাংশের অভিযোগ,
অনেক মিশন স্কুল শিক্ষার আড়ালে ব্যবসা চালাচ্ছে।
মাসিক ফি ছাড়াও বিভিন্ন অজুহাতে উন্নয়ন ফি, পরীক্ষা ফি, অতিরিক্ত কার্যক্রম ফি প্রচুর অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
বাৎসরিক ভর্তির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা অবৈধভাবে আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ট্রাস্ট/সোসাইটির আড়ালে লুকিয়ে ব্যক্তিগত ব্যবসা চালানো হচ্ছে। অভিযোগ
সরকারি স্কুলে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে ছাত্র ছাত্রীদের পরীক্ষার ব্যবস্থা করে লাভের অংশ হিসেবে বিপুল অর্থ উপার্জন করা হচ্ছে।আইন অনুসারে, সোসাইটি বা ট্রাস্ট আইনে নিবন্ধিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনো লভ্যাংশ ব্যক্তিগতভাবে ভাগ করে নেওয়া যায় না — সবকিছু মানবসেবা ও শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করতে হয়। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে যে, এই নিয়ম লঙ্ঘন করে কিছু প্রতিষ্ঠান ব্যবসায়িক মনোভাবে চলছে।
এই সব অভিযোগগুলো নিয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর প্রায় চুপচাপ রয়েছে বলে অভিযোগ। ফলে প্রশ্ন উঠছে
মিশনের শিক্ষা কি এখনও সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে?
নাকি অত্যধিক ফি ও অবৈধ আদায়ের কারণে গরিব ও মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য শিক্ষা আরও দূরের স্বপ্ন হয়ে দাঁড়াবে?
কালিয়াচকের মিশন স্কুলগুলো শিক্ষা বিস্তারে যে অবদান রেখেছে তা অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু ব্যবসায়িক চিন্তাভাবনা যদি প্রাধান্য পায়, তাহলে শিক্ষার আসল উদ্দেশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। স্থানীয় সমাজ, অভিভাবক ও সরকারের উচিত এই বিষয়ে সচেতন হওয়া এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষাকে সত্যিকারের সমাজসেবামূলক রাখা।
এটি শুধু কালিয়াচকের নয়, পুরো মালদা জেলার শিক্ষা ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। সময় এসেছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার।