22/03/2024
নারী ও জল
✍️ কাবেরী বিশ্বাস
২০০ মিলিয়ন ঘন্টা = ৮.৩ মিলিয়ন দিন = ২২৮০০ বছর। সুকুমার রায় থাকলে বলতেন, কাক্কেশ্বর কুচকুচের মতো এসব আবোলতাবোল কিসের হিসাব লিখছ? না না, মোটেই আবোল তাবোল নয়। এ হল সময়ের হিসাব। কিসের সময়? মেয়েদের অপচয় হওয়া সময়। যে সময় পৃথিবীর এক বিরাট অংশের মেয়ে প্রতিদিন জল ভরতে, জল আনতে খরচ করে। তাদের সকলের একদিনের জল আনার সময় একত্রিত করে এই সময়ের হিসাব পাওয়া গেছে। ইউনিসেফ এই তথ্য দিয়েছে। একে বলছে ‘সময়ের বিপুল অপচয়।’ জল আনতে একটি মেয়ের প্রতিটি পদক্ষেপ তাকে ক্রমশঃ সরিয়ে নিয়ে যায় পড়াশোনা, খেলাধূলা আর নিরাপত্তা থেকে।
যুগে যুগে দেশে দেশে সংসারের জলের চাহিদা পূরণ যে শুধুমাত্র মেয়েদেরই কাজ।তাই তাদের জীবন থেকে বিপুল সময় জলে ভেসে যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় শৈশব, কৈশোর, স্কুলজীবন, নানা বিষয়ে দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ, সোনালী ভবিষ্যৎ, সব। সব যায় জলে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের যৌথ কমিটি ২০২২ সালের রিপোর্টে জানিয়েছিল যে, পৃথিবীর ২.২ বিলিয়ন মানুষ নিরাপদ পানীয় জল পান না। এবছর বিশ্ব জল দিবসের থিম ‘শান্তির জন্য জল’। রাষ্ট্র সংঘ এই থিমের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রতিবেশী রাজ্যে রাজ্যে, দেশে দেশে জলের জন্য কত শত সংঘর্ষের কথা বলেছেন। কিন্তু আমি বলবো শুধু মেয়েদের কথা, বিশ্ব জুড়ে তাদের কাঁধেই সংসারের জল যোগানের গুরুভার। বাড়ীর মধ্যে, কাছে জল না থাকা তাদের কত অশান্তি, কত মানসিক, শারীরিক চাপে ফেলে দেয় সে কেবল ভুক্তভোগী মেয়েরাই জানে। ভারতের রাজস্থান, কর্ণাটক হোক বা আফ্রিকার ঘানা, সবাই একই অশান্তির শিকার। পূর্ণ বয়স্ক নারী আর বাড়ন্ত বালিকাদের উপর এর প্রভাব মারাত্বক। কারণ তারাই সংসারের জলের ভার বয়। তাদের শুধু হাঁটার কষ্ট বা সময় নষ্ট হয় তাই নয়, এই ভার আক্ষরিক অর্থে তাদের শরীর পঙ্গু করে দেয়। সাধারণ ভাবে জলের যে জেরিক্যান গুলো জল আনার জন্য ব্যবহৃত হয় তাতে ৫ গ্যালন জল ধরে, যার ওজন ভর্তি অবস্থায় ৪০ পাউন্ড (২০ কেজি)। বেশীর ভাগ সময় যা মাথায় করে বয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। এই ভার তাদের ঘাড়, মেরুদণ্ড, কোমরের দফারফা করে দেয়। এছাড়াও বেশী ওজন তোলা, ভারী বোঝা নিয়ে উঁচু নীচু পথে হাঁটার ফলে জরায়ুর স্থানচ্যুতি বা জরায়ুর নেমে আসা খুব বেশী দেখা যায় এসব মহিলাদের মধ্যে (১৯%)। গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে গর্ভস্থ সন্তানের বৃদ্ধি ও বিকাশের উপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, গর্ভপাতের সম্ভাবনা বাড়ে। জরায়ূ নীচে নেমে আসলে মহিলারা অবর্ননীয় শারীরিক কষ্ট ভোগ করেন। এতে তাদের ওঠা-বসা, হাঁটা-চলা কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। জল আনা, ঘরের কাজ করতে প্রচন্ড অসুবিধা হয়। সংসারের কাজে পরিবারের লোকরা সন্তুষ্ট না হলে জোটে লাঞ্ছনা গঞ্জনা। যারা অসুস্থ নয় তারাও তীব্র রোদে, গরমে হেঁটে, ঘেমে ঘেমে, শরীরে জলের অভাবে ধুঁকতে থাকে।তাতেও রেহাই পায় না। বাড়ী ফিরে সংসারের হাজারো কাজ সারতে সারতে রাত নামে। জলের যোগান কম থাকায় পরিবারের স্বামী সন্তানের প্রয়োজন মিটিয়ে অনেক সময় তারা তৃষ্ণা নিয়েই শুতে যায়।রাতে ঘুম হয় না। রাত তিনটে চারটেয় উঠে বেরিয়ে পড়তে হয় জল সংগ্রহে।
ঘানার একটি জায়গার একটি কমিউনিটিতে জলের লাইন বসেছে ২০১৮ সালে। তার আগে তাদের অভিজ্ঞতা তারা জানিয়েছে। আসুন দেখি –
প্রথম জন:- আমি ভোর সাড়ে চারটেয় উঠে জল আনতে যেতাম। দেরী হলে লম্বা লাইন পড়ে যেত, জল পেতাম না।
দ্বিতীয় জন:- কোন কোন দিন এত কম জল পেতাম যে বাড়ীতে রান্না হতো না।
তৃতীয় জন: আমাদের কেউ কেউ ছোট বাচ্চাকে পিঠে বেঁধে নিয়ে যেতো। জলের ভারী পাত্র নিয়ে হাঁটার সময় বাচ্চা বেশী নড়াচড়া করলে সামলাতে গিয়ে জলের পাত্র পড়ে যেত। কষ্টে দুঃখে কেঁদে ফেলতো কেউ কেউ।
চতুর্থ জন:- দূর থেকে জল এনে ক্লান্ত হয়ে গেলেও সংসারের কাজ থেকে ছুটি মিলতো না। আমরা সবাই ঘাড়ে, কোমরের ব্যথায় অস্থির হয়ে থাকতাম।
শারীরিক পরিশ্রম বা অসুস্থতা ছাড়াও জল সংগ্রহ করতে গিয়ে মহিলা এবং বালিকাদের অন্য বিপদও কম নয়। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, রাস্তায় বন্য পশুর আক্রমণ বা পশুরও অধম মানুষের হাতে যৌন নির্যাতনের ভয়ও কম নয়। সব থেকে করুণ অবস্থা বোধহয় আমাদের দেশের মহারাষ্ট্রের ডেঙ্গানমাল গ্রামের পানি বাঈদের। তারা বুঝি মানুষও নয়, শুধু বাড়ীর ট্যাপ কলের মতো এক পণ্য বা পরিষেবা। যা তারা শুধু দুমুঠো খাবার আর আশ্রয়ের বিনিময়ে গৃহস্থকে দিয়ে থাকেন। তারা গৃহস্বামীর বিবাহিত স্ত্রী পরিচয়ে সমাজে বাস করেন। যদিও প্রথম বা আইনত বৈধ স্ত্রী নন। দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্ত্রী। স্বামীর শয্যার অধিকার, সম্পত্তির অধিকার কোন কিছুই নেই তাদের। আছে শুধু কাকভোরে উঠে কলসী মাথায় মাইলের পর মাইল রুক্ষ, পাহাড়ি পথে হাঁটা। ভারী বোঝা নিয়ে উঁচু নীচু, বিপদজনক পথে বাড়ী ফেরা। পা পিছলে গেলে, পড়ে গিয়ে হাত পা ভাঙলে তাদের অবস্থা কি হয় তা অনুমান করতে অসুবিধা হয় না। অসুস্থ হলে, পঙ্গু হয়ে গেলে আশ্রয়দাতা, অন্নদাতা স্বামী আর একটি সক্ষম পানি-বউ ঘরে আনে। পুরুষ মানুষটির যুক্তি হল, গ্রামে কোনো জলের পাইপলাইন নেই, নেই অন্য কোন জলের উৎস। বৈধ প্রথমা স্ত্রীর যদি সারাদিন জল আনতেই কেটে যায়, তাহলে সংসারের বাকী কাজ, রান্নাবান্না, শিশু ও বয়স্কদের দেখভাল কে করবে? তারা তো সকাল হতেই জন খাটতে যায় অন্য কোথাও। তাই বহু বছর ধরে এই বহু বিবাহ প্রথা তাদের সমাজে স্বীকৃত। মনে প্রশ্ন জেগেছিল, পানি বাঈরা কেন এ জীবন বেছে নেয়! উত্তর পেয়েছি বিভিন্ন লেখায়। তারাই পানিবাঈ হয় – পণের জন্য যাদের বিয়ে হয়নি, পরিবারে যাদের উপস্থিতি অবাঞ্ছিত, যারা বিধবা, যারা আশ্রয়হীন একা মহিলা। সমাজ তাদের অমুকের স্ত্রীর শূন্যগর্ভ পরিচয়ে ভুলিয়ে নিজেদের দায়িত্ব সেরে ফেলে। তারাও ভোলার ভান করে। নইলে যে আরো ক্লেদাক্ত জীবন বেছে নিতে হবে। এ যেন মন্দের ভালো। একটি NGO এর উদ্যোগে ঘানার মেয়েদের কাছে জলের লাইন পৌঁছে গেছে। এখন তাদের মনে নেই চাপ, সংসারে এসেছে শান্তি।
আজ বিশ্ব জল দিবসে, পৃথিবীর সেই সব মানুষ যাদের কাছে এখনও নেই নিরাপদ জল, তাদের জন্য চাই নিরাপদ জল। শান্তি আসুক সবার ঘরে।
[2024-03-22]