13/10/2025
সেন্ট মার্টিনের অতিজাগতিক এক রাত।
রাত তখন অনেক গভীর। ক্যালেন্ডারের তারিখ ছাপিয়ে সময় যেন থেমে গেছে এক নির্জন সৈকতে। আমার কাছে কিছুই নেই—না ভয়, না হারানোর কিছু—শুধু এক অদ্ভুত শান্তি ঘিরে রেখেছে শরীর ও মনকে।
সমুদ্রের বালুতে খালি পায়ে হাঁটছি। আকাশ এতটাই পরিষ্কার যে মনে হচ্ছে এক ঝলমলে ক্যানভাসে কোটি কোটি তারা জ্বলে উঠেছে একসাথে। সেই আকাশে খালি চোখে ধরা দিচ্ছে আকাশগঙ্গা—যেন দূরের কোনো স্বপ্ন হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। আমি আর অনুজ—আমাদের দু’জনের নিঃশব্দ উপস্থিতি যেন এই অতল নীরবতারই অংশ।
জোয়ার চলছে ধীরে ধীরে, ঢেউ এগিয়ে আসছে তাবুর দিকে। নারিকেল বাগানের ভেতরে ছোট্ট এক কোণে আমরা তাবু ফেলেছি। বাতাসে কাঁচা নারিকেলপাতার গন্ধ, আর তার সঙ্গে লবণমিশ্রিত সমুদ্রের হালকা সুরভি—মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অদ্ভুত আবেশ।
উপরে তাকালে নারিকেল গাছের ফাঁক গলে দেখা যায় তারা, যেগুলোর দীপ্তি কোনো শহরের আলোক দূষণ মুছে দিতে পারে না। তাবু থেকে হাত পনেরো দূরে গর্জন করে ভাঙছে ঢেউ—দিনে যেটা এত সাধারণ মনে হয়, রাতের নিস্তব্ধতায় সেটাই যেন বুকের ভেতর কাঁপন ধরিয়ে দেয়।
মাঝেমাঝে চোখের কোণায় ধরা পড়ছে উল্কা—একটি ঝলক, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছে অনন্ত অন্ধকারে। দূরের সমুদ্রে মাছ ধরার নৌকাগুলোয় মিটি মিটি জ্বলছে নীল, লাল আর সবুজ আলো। কোনো রিসোর্ট তখনও সেখানে গড়ে ওঠেনি। চারপাশ জুড়ে নিখাদ একাকিত্ব—অপরূপ, কাঁচা, আদিম প্রকৃতি।
সবকিছু মিলে সেই রাতটা হয়ে উঠেছিল অবিশ্বাস্য—এক ধরনের অতিজাগতিক সৌন্দর্য। এমন সৌন্দর্য যা চোখ ভরিয়ে দেয়, কিন্তু মনকে অদ্ভুতভাবে কাঁপিয়ে তোলে। ভয় আর সৌন্দর্যের মাঝামাঝি এক মোহময় মুহূর্ত।
রাতভর আমরা তাবুর ভেতর বসে ছিলাম। পাশের নারিকেল গাছে বাঁধা হ্যামকে দুলছিলাম নীরবে। চারপাশে ঢেউয়ের গর্জন, নারিকেল পাতার হালকা শো শো শব্দ, আর মাথার ওপরে অসংখ্য তারা। শেষরাতের দিকে আকাশে ধীরে ধীরে উঠল কৃষ্ণ পক্ষের ক্ষীণ চাঁদ। সেই রূপালি আলো বালুর ওপর পড়ে পুরো সৈকতটা যেন সাদা এক পর্দায় মোড়ানো হয়ে গেল। ঢেউ গলে পড়ছে ধীরলয়ে—শব্দহীন কোনো প্রাচীন গানের মতো।
সেই রাতটা আজও চোখে ভাসে।
মনে হয়, আমি যেন কোনো পৃথিবীর নয়—বরং আকাশ আর সমুদ্রের মাঝখানে এক চিরন্তন মুহূর্তে আটকে গিয়েছিলাম।
গলাচিপা | সেন্ট মার্টিন | ডিসেম্বর, ২০২০