30/11/2016
পুরুষরা গুম, নারীরা আসছেন সম্ভ্রম হারিয়ে - * ১০ হাজার রোহিঙ্গা পুরুষকে সৈন্যরা ধরে নিয়ে গেছে *৩০ হাজার পালিয়েছে প্যারাবন, খাল ও গহীন পাহাড়ে *লাশ পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে, কাউকে পুঁতে ফেলছে]মিয়ানমারে চলমান সেনা নৈরাজ্যে রাখাইন প্রদেশের একটি সেনানিবাসে রোহিঙ্গা পুরুষদের গণহারে ধরে নেওয়া হচ্ছে। অনেক নারীকেও তুলে নিয়ে যাচ্ছে সৈন্যরা। এসব নারীদের কেউ কেউ সম্ভ্রম হারিয়ে ফিরছেন। তবে যেসব পুরুষকে সৈন্যরা ধরেনিয়ে গেছে তাদের কাউকে এখনো পর্যন্ত ফিরতে দেখা যায়নি। আরযারা সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচতে পালিয়ে গেছেন; তারা একমাস ধরে প্যারাবন, খাল ও গহীন পাহাড়ে লুকিয়ে আছেন। টেকনাফ-উখিয়ায় অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গারা এমনটাই বলছেন।অনুপ্রবেশকারীদের ভাষ্য- সেনানিবাসে ধরে নেওয়া এসব রোহিঙ্গা পুরুষদের অনেককেই হত্যা করে মাটি চাপা দেওয়া হতেপারে, অনেককে পুড়িয়েও ফেলতে পারে। অন্যথায়- এতদিন ধরে তাদের আটকে রাখার কথা না। আর যেসব নারীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে তাদেরও পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হচ্ছে। এরকম অনেক রোহিঙ্গা নারীর বেওয়ারিশ লাশ উত্তর মংডুর বিভিন্ন গ্রামে পড়ে থাকতে দেখা গেছে। আর যেসব পুরুষ সৈন্যদের হাত থেকে বাঁচতে প্রদেশটির উপকূলীয় প্যারাবন, পাহাড়সহ দুর্গম এলাকাগুলোতে পালিয়ে আছে তারাও খাবারদাবারের অভাবে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে। আবার হত্যার বিষয়টি যাতে ইন্টারনেট-ফেইসবুকে না যায়, সে বিষয়েও সৈন্যরা এখন অনেক বেশি সচেতন।রাখাইনের রাইম্যাবিল থেকে এসে টেকনাফের লেদা বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া মোহাম্মদ হোসেন ইত্তেফাককে জানান, সৈন্যদের হাত থেকে প্রাণে বাঁচতে উত্তর মংডুর শীলখালি, কুইরখালি, জীবংখালী, খোয়ারবিল, ফুরমা, লোদাইন, চিংড়িপাড়া, বুইশ্চর গ্রামের পার্শ্ববর্তী দুর্গম এলাকাগুলোতে আশ্রয় নিয়েছেন পুরুষরা। তারা সৈন্যদের ভয়ে বাংলাদেশেও আসতে পারছেন না, আবার নিজ বাড়িতেও যেতে পারছেন না। সেখানে খাবার, পানির অভাবে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও ওষুধ পাচ্ছেন না। তার উপর শীত নামতে শুরু করায় দুর্ভোগ আরো বাড়ছে। তার আত্মীয় রফিক মিয়া, সাইফুল্লাহ, জাহিদুর রহমানও একটি দুর্গম এলাকায় আটকে আছেন বলে দাবি করেন তিনি।দুইদিন আগে উখিয়ার কুতুপালং বস্তিতে আশ্রয় নেওয়া নুর আলম দাবি করেছেন, পুরুষদের সেনানিবাসে ধরে নিয়ে মধ্যযুগের দাসের মতো সেনা ব্যারাকের উন্নয়ন কাজে খাটানো হচ্ছে। ঠিকমতো খাবার-দাবার না পেয়ে অনেক রোহিঙ্গা শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে কাজে অক্ষম হয়ে যাচ্ছে। তখন তাদের মেরে মাটিতেপুঁতে ফেলা হচ্ছে।রাখাইন রাজ্যে চলমান সেনা নৈরাজ্যে মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত ৮০ জন রোহিঙ্গাকে সন্ত্রাসী আখ্যাদিয়ে হত্যার কথা স্বীকার করা হলেও গণমাধ্যমের দাবি, ১৩০ জনরোহিঙ্গাকে ইতোমধ্যে হত্যা করা হয়েছে। তবে সেখান থেকে আসারোহিঙ্গাদর ভাষ্য- জনসমক্ষে যাদের হত্যা করা হয়েছে কেবল তাদের সংখ্যাটাই সামনে এসেছে। এর বাইরে সেনানিবাসে কিংবা সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় গোপনে অনেককে হত্যা করা হচ্ছে। রোহিঙ্গারা বলছেন- যে হারে রোহিঙ্গাদের ধরে নেওয়া হয়েছে, মৃতের সংখ্যা কয়েক হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে। যদিও এখনো পর্যন্ত গণমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রাখাইন প্রদেশে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় হতাহতের প্রকৃত সংখ্যাসামনে আসছে না।কুতুপালং রোহিঙ্গা বস্তির ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভাপতি আবু সিদ্দিক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, যারা এখানে অনুপ্রবেশকরছে তারা এবং মিয়ানমারে তার পরিচিতজনদের সঙ্গে কথা বলে তিনি জানতে পেরেছেন, সেনাবাহিনী অন্তত ১০ হাজার রোহিঙ্গা পুরুষকে সেনানিবাস ও সেনা নিয়ন্ত্রিত এলাকায় ধরে নিয়ে গেছে। আর নারীদের সম্ভ্রম কেড়ে নিয়ে নির্যাতনের পর কাউকে কাউকে ছেড়ে দেওয়া হলেও অনেককে পুড়িয়ে মারা হচ্ছে। এছাড়াও অন্তত ৩০ হাজার রোহিঙ্গা গৃহহীন হয়ে মিয়ানমার উপকূলের প্যারাবন ও পাহাড়ে লুকিয়ে আছে বলে জানান তিনি।জানতে চাইলে গতকাল বিকালে বিজিবি টেকনাফ ব্যাটেলিয়ন-২ এর অধিনায়ক আবুজার আল জাহিদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘অনুপ্রবেশের কোনো খবর নেই। বিজিবি সতর্ক পাহারা অব্যাহত রেখেছে। রবিবার রাত থেকে সোমবার বিকাল পর্যন্ত নাফ নদীর চারটি পয়েন্ট দিয়ে রোহিঙ্গাদের বহনকারী আটটি নৌকাকে মিয়ানমারেরদিকে ফেরত পাঠানো হয়েছে।’