29/11/2024
* মনস্তাত্ত্বিক মেটাফোর
শামসুদ্দিন হীরা
সূর্য ধীরে গড়িয়ে যায় আকাশে,
রক্তিম আলো ছুঁয়ে যায় বটবৃক্ষের মগডাল,
পলাশের আগুনে জ্বলে ওঠে মাটির রক্তাক্ত ক্যানভাস।
দাবা খেলা চলছে—
রাজা, মন্ত্রী, সৈনিক সবাই
তোমার মতোই নির্বাক।
তবু প্রতিটি চাল যেন
কোনো এক ধর্মগ্রন্থের পাতায় লেখা ভবিষ্যদ্বাণী।
ঝোপঝাড় থেকে ভেসে আসে
নাপিতের কাঁচির মতো শব্দ,
চুপচাপ কেটে ফেলা হয় স্বপ্নের কেশরাশি,
যেখানে প্রেম এক আড়ালে বন্দী
আর মনুষ্যত্ব এক তাসের প্যাকেট।
তুমি তাকিয়ে থাকো রংধনুর নীরবতায়—
সাতটি রঙে লেগে আছে সাতটি পাপ,
আর তার ফাঁকে ফাঁকে লুকিয়ে আছে
মানবিক প্রেমের আবছা ছায়া।
তবু সূর্যের গতি থামে না।
দাবার বোর্ডে কোনো বিজয় নেই,
ফলাফলহীন এক রাজনীতি
যা ধর্মের নামে মুখোশ পরিয়ে
মানবতার মাথা ঝুঁকিয়ে রাখে।
তুমি কি দেখো?
তোমার করোটির নীচে জমে থাকা শূন্যতা?
আমার প্রেম সে শূন্যতায় সেতু হতে চায়,
জাগাতে চায় এক পৃথিবী—
যেখানে ধর্ম কেবল শান্তি,
রাজনীতি কেবল ন্যায়ের প্রতিচ্ছবি,
আর মানবিক প্রেম এক উদ্ভাসিত সকাল।
তবু সূর্য গড়িয়ে যায় আকাশে,
আর আমরা অপেক্ষায় থাকি—
একটি চাল, একটি মুক্তি,
একটি সত্য।
* প্রেমের সূত্রাবলি
তুমি একটি কনস্ট্যান্ট, এক অখণ্ড মৌলিকতা,
যার জন্য সমীকরণে কোনো সীমা নেই,
তোমার উপস্থিতি অগণিত ডিগ্রীতে বিস্তৃত,
মহাজাগতিক বৃত্তের মতো—সর্বব্যাপী, অপরিসীম।
তোমার হাসি একটি সাইন ফাংশন,
যা সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়,
একটি অপ্রতিরোধ্য পিক,
যত্নে আঁকা এক অসীম রেখার অন্তর্গত।
তোমার চাহনি প্রাসঙ্গিকতা,
যার সমীকরণ খুঁজে পাই আমি,
কখনো বেড়ে চলে অ্যালগেব্রিক,
কখনো কমে যায় পিরামিডের মতো।
আমাদের ভালোবাসা দ্বিমাত্রিক নয়,
এটি কোণ, এই কোণটির মধ্যে
এক অদৃশ্য বিন্দু, গতি এবং গ্র্যাভিটি,
পৃথিবী ছাড়িয়ে মহাশূন্যে এক নক্ষত্রের মতো।
তুমি—একটি কোঅরডিনেট পয়েন্ট,
মৃত্যুর চেয়ে বেশি এবং
অজান্তেই আমি গুণিতক,
বৃদ্ধির মতো, যা কখনো কমে না।
প্রেমের প্রমাণ অঙ্কের সূত্র,
যা ধ্রুবক কিন্তু অতুলনীয়,
কিন্তু আমি জানি,
এই পিঁড়ি ভেঙে তোমার দিকে
এখান থেকে এগিয়ে যাওয়া—
এক অন্ধ মহাবিশ্বের নির্দিষ্ট গতি।
* নৈঋতের স্রোতে ভেসে যায় বসন্ত
অধিকার আছে কি তোমার,
এই রাতের গাঢ় অন্ধকারে আমাকে ছুঁয়ে যাওয়ার,
নৈঋতের স্রোতে ভেসে যাওয়ার?
আমার বুকের শূন্যতা, যেখানে স্বপ্নের চিতা জ্বলে,
সেখানে তুমি পুড়িয়ে দিতে চেয়েছিলে তোমার শীতল চুম্বন।
তুমি জানো না,
আমার ভাঙা হৃদয়ে কতো অন্ধ বিশ্বাসের চোরাবালি লুকিয়ে আছে,
যেখানে ঈশ্বরের নাম নেই,
শুধু রয়েছে কামনার অশ্লীল কাব্য।
তোমার শরীর, যেন এক আদিম দেবী,
যার নাভির চারপাশে জড়ো হয়েছে
অসংখ্য বিপন্ন দিনের গোপন আখ্যান।
নৈঋতের বাতাস বয়ে যায়,
আমার অস্থি-মজ্জায় জমে থাকা অতৃপ্তি ঝরে পড়ে,
তোমার নগ্ন পায়ের ছাপ মিশে যায় কাদামাটির মসৃণ ত্বকে।
তুমি কি জানো, এই দেহ, এই মন—
সবই একদিন হয়ে যাবে স্মৃতির ধ্বংসাবশেষ?
তবু আমি হাত বাড়াই,
তোমার কাঁধে রেখে দিতে চাই সমস্ত পাপ ও পূণ্য।
তুমি কি দেখেছো কখনো,
আকাশের বুক চিড়ে ঝরে পড়া শূন্যতার বৃষ্টিকে?
তোমার বুকের স্তব্ধ ঝড়গুলো আমার চোখে ঝলসে ওঠে,
আর আমি হারিয়ে যাই—
তোমার নিতম্বের বাঁকে,
যেখানে লুকিয়ে আছে
অজস্র নিষিদ্ধ কবিতার জন্মরেখা।
চারপাশের নির্লজ্জ আকাশ সাক্ষী থাকে,
আমি তোমার শরীর থেকে তুলে আনি
প্রেম আর পাপের অনন্ত সংজ্ঞা।
আমি জানি, তুমি দেবী নও,
তুমি শুধুই এক মানবী—
যার স্তনের কোলাজে আঁকা রয়েছে
আমার কবিতার শূন্য পঙক্তি।
তোমার উরুর ভাঁজে আমি খুঁজে পেয়েছি
নৈঋতের সুর,
যেখানে শরীর আর মনের দ্বন্দ্ব মিশে যায়
এক গভীর একান্তে।
তুমি কি সেই মুহূর্তগুলোকে মনে রেখেছো,
যখন আমি তোমার চুলের গন্ধে মিশে গিয়েছিলাম
এক বিপন্ন বসন্তের সন্ধানে?
ভাঙা গিটার,
যা তিন সেকেন্ডের সুরে তুলে আনে
তোমার কণ্ঠের অশ্রুত স্বর।
আমি জানি,
এই বসন্তও পেরিয়ে যাবে,
যেমন তুমি পেরিয়ে গেছো আমার শরীর,
আমার কামনা,
আমার সমস্ত উচ্চারণ।
তবু তোমার স্মৃতি,
যা চারতলার জানালায় রেখে গেছি
এক টুকরো চাঁদের আলোয়।
তোমার ব্রার হুক খুলে দেখেছিলাম
তোমার হৃদয়েও লুকিয়ে আছে
একাকিত্বের দগ্ধ ছায়া।
তুমি হয়তো ভুলে গেছো,
কিন্তু আমি এখনও সেই মায়াবী মুহূর্তে ফিরে যাই
প্রতি রাতে, প্রতি কবিতায়।
তোমার শরীরের বাঁকে বাঁকে
আমি খুঁজে পেয়েছি
এক নিষিদ্ধ ভাষা,
যা আমাকে কবি বানিয়েছে,
যা আমাকে পাপী বানিয়েছে,
যা আমাকে মানুষ করেছে।
তুমি কি জানো,
তোমার যোনীর গহ্বরে লুকিয়ে আছে
সমস্ত সৃষ্টির আদিকথা?
আমি সেখানেই পেতে চেয়েছি মুক্তি,
যেখানে তুমি লুকিয়ে রেখেছো
তোমার সমস্ত প্রেমহীন ভালোবাসা।
আজ নৈঋতের বাতাসে বয়ে যায়
আমাদের না-বলা কথারা।
তুমি দূরে সরে গেছো,
তবু তোমার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে
আমার কবিতারা ঘুমিয়ে থাকে।
আমি জানি,
একদিন এই বসন্তও মুছে যাবে,
কিন্তু আমার শব্দেরা বেঁচে থাকবে
তোমার স্মৃতির নিভৃত পাঁজরে।
* তোফাজ্জল
তোফাজ্জল। ক্ষুধা বেড়ে যায় ; মায়ের মুখ ভেসে উঠে। স্বপ্ন বড় হয়। ধোঁয়া উঠা সালুনে মাছটা নির্জীব থাকে। শরীরের ব্যথা নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে যায় স্মৃতি। দেশ তুমি বর্ণমালার অক্ষর হও। শব্দের ভেতর যেভাবে ভাষাটি শুয়ে থাকে। একটি আখ্যানের অপেক্ষা করতে করতে তোফাজ্জলের মুখ থেকে রক্ত ঝরে যায়; গণতন্ত্র , সাঈদের আত্নদান নিঃশেষ হয়ে যায়। তোফাজ্জল তোমার লাশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে কুখ্যাত খুনে বাহিনী। গাঢ় অন্ধকার হয়ে এসেছে চারিদিক। তোমার জন্য তুলে রাখি আঘ্রাণ। সকালের আহার। দুপুরের খাবার। তামাম চালের আড়তকে ভাত করে তুলি। এই শহরে ক্ষুধায় ঝুঁকে পড়ছে বৃক্ষগণ। ঘি হই আর ঢলে পড়ি কথা আর ধোঁয়ার ভেতর। অতঃপর তরুবর, অতঃপর পঞ্চবি ডাল— অতঃপর আমরা মানবচরিতে ঢুকে পড়ি। মব ট্রাইলে সব বিচার সম্পূর্ণ করি।
* অজস্র পথের গর্ভে
নিঃশব্দে সরে যাই—
তোমার ছায়ার পথে,
যেখানে রাত ফিসফিসিয়ে বলে
তারাদের গভীর অভিমান।
জলভরা মেঘের মতো মন
আবারও ভেঙে পড়ে,
তোমার চোখের ভিতরে
ঝরে যায় এক বুক বৃষ্টি।
ফুলঝুরির আলোয় মিশে থাকে
অতীতের গোপন শব্দ,
আমি খুঁজি সেখানে
পলাতক পথের আড়াল।
তুমি কি দেখেছো,
আমার ছায়া—
লতার মতো জড়িয়ে ধরতে চেয়েছিলো
তোমার ছেঁড়া হাসি?
নদীর জলের মতো আমার সময়
তোমার থেকে দূরে সরে যায়,
কিন্তু পায়ের নিচে জমে থাকে
শৈবালের মতো অভিমান।
চাঁদভাঙা রাতে
তোমার ছোঁয়া খুঁজি বাতাসের ঘ্রাণে,
তোমার ঠোঁটের রং হয়ে ওঠে
অপরিচিত লাল।
চলো, এইবার সত্যি পালাই—
পাখিদের অদৃশ্য ডানায় ভর করে।
দূরের কোনো সবুজ জঙ্গলে
লুকিয়ে ফেলি সমস্ত সংশয়,
যেখানে সূর্যাস্ত
তোমার মুখের মতো প্রখর নয়,
নরম—
ঠিক বালিশের আলতো গন্ধের মতো।
* মানবতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ মানি না!
লাল পাহাড় দেখেছো!
পৃথিবীতে কেমন করে লাল হয় মাটি?
কত শিশুর কান্না হারিয়ে যায় বাতাসে,
কত মায়ের বুক খালি হয় নির্যাতনের
বন্দিশালা আয়নাঘরে?
রোহিঙ্গার ভিটে পুড়ে ছাই হয়ে যায়,
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র, নীল নদের জলে
শরণার্থীদের স্বপ্নগুলো মিশে যায়।
সাগরের ঢেউ, পায়ে পায়ে কাঁদে,
মানবতার শব কাঁধে জাতিসংঘ হাটে।
ফিলিস্তিনের আকাশে বোমার আগুন,
একটি শিশুর খেলনা ছিটকে পড়ে ধূলায়।
আকাশ জানে, তার চাঁদ এখন রক্তিম,
সভ্যতার হাতেই তো তার পায়ের শিকল।
সিরিয়ার মরুভূমি সাক্ষী দেয়,
বালুকণার ওপর লুটিয়ে পড়া শরীরের।
যুদ্ধ কি শান্তি চায়?
নাকি শুধু তেল আর সীমানার মুনাফা বাড়ায়?
আফ্রিকার গহীন বনে শোনা যায় ক্ষুধার ক্রন্দন,
পুঁজির আগুনে দগ্ধ হয় সেইসব মানুষজন।
শস্যের বদলে উঠেছে কারখানার মেঘ,
উন্নয়নের মানচিত্রে কোথায় তারা আজ?
আশিয়ান হোক, ইউরোপ, কিংবা আমেরিকা,
মানবাধিকার যেন কেবল মুদ্রার খেলা।
যেখানে পুঁজির স্বার্থ, সেখানেই দাও সুরক্ষা,
আর বাকি পৃথিবী থাকে রক্তাক্ত—
খোলা প্রহরে নির্দয় নিরীক্ষা।
জাতিসংঘ মোমবাতি জ্বালায়,
মার্কিনীরা মেরে তারা মোমবাতি জ্বালায়,
সভ্যতার আদর্শ কি আদৌ সত্য?
রাষ্ট্রের খেলায় মানুষ বিনষ্ট।
সভ্যতার মিথ্যা শৃঙ্খল।
স্বপ্ন দেখি, এক নতুন ভোরের,
থাকবে না শিকলবন্দী প্রহর।
মানুষ হোক একবার সত্যিকারের মানুষ,
শান্তি ছুঁয়ে যাক তার প্রতিটি স্পর্শ।
মানবতা হোক ধর্ম, রাজনীতি নয়,
তোমার পৃথিবী হোক আলো, অন্ধকার নয়।
কিন্তু ততদিন,
এই কবিতা জ্বলবে প্রদীপ হয়ে,
যতক্ষণ পৃথিবী দেখবে মানবতার কবর,
ততক্ষণ আমার শব্দগুলো বিক্ষোভ হয়ে বাঁচবে।
* নির্লিপ্ত বাংলার গল্প
এই শীত সকাল, কুয়াশার চাদরে মোড়া,
মাঠের প্রান্তে দিগন্ত হারানো সীমানা,
বাংলার আকাশে ভেসে বেড়ায়
শালিকের ডানায় মেঘের শেষ ঘ্রাণ।
ধানখেতের শণশণ আওয়াজে জেগে উঠে
মাটির গন্ধ, পায়ের নিচে নরম কাদা,
নদীর বাঁকে দাঁড়িয়ে জেলেদের হাঁক
জেলের ছিপ ছুঁয়ে বয়ে চলে সময়ের ধারা।
পুকুরপাড়ের বুড়ো আমগাছটা,
অগণিত মিষ্টি স্মৃতির পাহারা দেয় আজও,
শীতের সকালের পিঠে আর ভাপা পিঠের গন্ধে
জীবনের সরলতায় বাঁধা পড়ে অবিরাম।
চাঁদপুরের পদ্মা কিংবা মেঘনা,
দুই স্রোত মিলেমিশে তৈরি করে গল্প,
কখনো জলের নিচে গ্রাস করে গ্রাম,
তবুও জেলে নৌকা ভাসায় স্বপ্নের খোঁজে।
রাত হলে, ঝুপড়ি ঘরের টিনের চালে
বৃষ্টির নাচ শুনে চুপ করে শোনে মন,
দূরের বটগাছের নিচে বাস করে
ভাঙ্গা মন্দিরের একটুকরো ইতিহাস।
বৃক্ষেরা কথা বলে, তাদের পাতা ঝরে
যেন স্মৃতির দাহন, শীত এসে দেয় সান্ত্বনা।
বর্ষার জলে ডুবে যায় মাটি,
তবু বাংলার কৃষক বুনে রাখে জীবনের বীজ।
পাখির ডাকে ভোর হয় বাংলার গ্রামে,
কৃষকের হাঁটুর গেরস্থালি শোনে ইতিহাস।
পিচঢালা রাস্তায় নগরীর আলো
তবু গ্রামের পথেই লুকায় জীবনের মানে।
বাংলা, তোর মাটি আমার বুকের ধন,
তোর গন্ধে মেশে আমার প্রতিটি নিশ্বাস।
তোর নদী আমার চোখের জলে মিশে,
তোর আকাশ আমার স্বপ্নের আঁধার।
তুমি সেই অবিনশ্বর, তুমি সেই চিরন্তন,
তোমার প্রতিটি ধূলিকণা গায় জীবনের গান।
তুমি আমার বেদনায়, তুমি আমার সুখে,
তোমার প্রতিটি মুহূর্তে আমি বেঁচে থাকি।
* বিস্মৃত ঋতুর মায়া
ঢেউয়ের নোনাজল ঘেঁটে একা একা সময় কাটাই,
আকাশে ছড়িয়ে থাকা বৃষ্টির গন্ধে
ভিজে যায় স্মৃতির কাঠামো।
তুমি যেন কোনো নামহীন ঋতু,
আমার দিনরাত্রির বুকের ভেতর
একটি ছায়া, একটি ঘূর্ণিপাক।
বনরক্ষিণীর মতো আগলে রাখো
অন্ধকারের গাঢ় নকশা,
আমি হারিয়ে যাই শব্দের বাঁকে।
এখানে নেই কোনো দুঃখ,
শুধু আছে কোলাহল আর
অস্পষ্ট উচ্চারণের ঘ্রাণ।
তোমাকে পেতে চাই
জনক রোডের নির্জনতার মতো,
অথচ তুমি কেবল আছো
আমার ভাঙা ভাবনার ছিটে ফোঁটায়।
তোমার ছোঁয়া যেন বাতাসে লুকানো,
তবু তোমার স্মৃতি দাঁড়িয়ে থাকে
কোনো সবুজ পোলের কাছে,
আমার একাকিত্বের পাহারায়।
নতুনের ভিতর পুরোনো স্পর্শ মিশে থাকে,
ঋতুর মায়ায় বুঁদ হয়ে থাকা উন্মাদ
চিবিয়ে খায় স্মৃতির বীজ।
এখানে সবুজ ঝরে, এখানে ভাষা থেমে যায়,
এখানে শুধুই তুমি—
উপমার আড়ালে অদেখা এক চিত্র।
* কল্পনার জোনাকি আলো হয়ে ভাসি
তোমাকে দেখলে মনে হয় কোনো গহীন বন:
যেন তারার আলোয় সিক্ত একটি স্নিগ্ধ স্বপ্ন।
তোমাকে দেখলে মনে হয় কোনো গভীর আকাশ:
তার চুপচাপ নীলিমায় লুকিয়ে আছে চিরকালীন গান।
তোমার নিকট আসি এক রহস্যভরা পাখির ডাকে,
ডানায় লেখা আছে অদৃশ্য নক্ষত্রপথের মানচিত্র।
বাইরে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে
প্রাচীন গাছের শাখায় শাখায়,
জীবন ও মৃত্যুর মাঝে এক নীরব কথোপকথন।
আমি তোমার গভীরে ডুব দিই,
একটি কল্পনার জোনাকি আলো হয়ে ভাসি।
তোমার অন্তরের আকাশে ঝরে পড়ে
অদেখা চন্দ্রালোকে মোড়ানো নীরবতা।
তোমার রহস্যময় গভীরতায় আমি খুঁজে পাই
আমারই হারিয়ে যাওয়া ছায়াকে,
যা একদিন তোমার আলোর সঙ্গে মিশে
এক সুরময় পথ তৈরি করবে—
যেখানে সময় থেমে থাকবে,
আর আমরা হব একে অপরের চিরন্তন।
* তোমার ছোঁয়ার প্রতিশ্রুতি
সবটুকু শব্দ জমিয়েছি তোমার জন্য
প্রবাহমান মানুষেরা কখনও থামে না,
তবু আমি থেমে গেছি, তোমার জন্য।
প্রতিক্ষায় দিন চলে যায়;
মেঘলা আকাশে চাঁদের লুকোচুরি
আধা আলো, আধা রহস্য।
ঘূর্ণন স্রোতে নাবিক যেমন কূল খুঁজে পায় না,
তুমি সেই প্রতিশ্রুতি—যাকে ছুঁতে গেলে
অভিমানী ঢেউয়েরা ফিরে আসে কূলে।
শরতের আকাশে কাশফুল দুলে ওঠে হাওয়ার ছন্দে,
আমি তখন দেখি তোমার মুখ,
যেখানে মিথগুলো মিশে যায় বাস্তবের রূপকথায়।
তুমি দুর্গার প্রতিমা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকো,
আর আমি কেবল দর্শক—প্রণামের অপেক্ষায়।
তুমি কি কোনো পৌরাণিক দেবী?
যে নদীর জলরেখায় বসে অপেক্ষা করে?
নাকি তুমি আধুনিক শহরের ব্যস্ততা,
যার ভিড়ে আমি নিজেকে বারবার হারাই?
তুমি আসো কুয়াশার মতো,
আবার মিলিয়ে যাও প্রভাতের রোদের ভিড়ে।
তোমার ছোঁয়া, অল্প একটু;
তবু তার গভীরতা মেপে শেষ করা যায় না।
তোমার অপেক্ষায় কত রাত!
দূরে দুলে ওঠা নৌকো দেখি,
আর ভাবি—তুমি কি কোনোদিন এসে বলবে,
“চলো, এবার আমাদের গল্পটা নতুন করে লিখি”?