Rasel Munshi

Rasel Munshi আঞ্চলিক ভাষায় মায়ের ভাষায় সত্য প্রকাশ �

27/12/2025

# ইনসাফের হাদি: একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের গল্প

# # প্রস্তাবনা: যে মানুষটি স্বপ্ন দেখতেন

২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। পবিত্র জুম্মার দিন। হাদি জুম্মার নামাজ পড়ে বের হয়েছেন। একটি অটোরিক্সায় করে যাচ্ছেন। তাঁর মনে একটাই প্রতিজ্ঞা - ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে হবে। আজও রাজপথে যাবেন। আজও মানুষের কাছে যাবেন। আজও ইনসাফের ডাক দেবেন।

হঠাৎ পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এগিয়ে আসে। গুলির শব্দ। একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে হাদির মাথায়। কাপুরুষের মতো পেছন থেকে গুলি। কারণ সামনে থেকে গুলি করার সাহস ছিল না তাদের। হাদির চোখে চোখ রেখে গুলি করার সাহস ছিল না।

পবিত্র জুম্মার দিনে, নামাজের পরে, এভাবে একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হলো। কিন্তু হত্যাকারীরা জানত না, তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি। তারা জন্ম দিয়েছে লক্ষ লক্ষ হাদির। তারা সৃষ্টি করেছে এক অমর কিংবদন্তির।

হাদি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন - মিছিলে, সবার সামনে, ইনসাফের জন্য লড়তে লড়তে শহীদ হওয়ার - সেই স্বপ্ন হুবহু সেভাবে পূর্ণ না হলেও, তিনি শহীদ হলেন ইনসাফের পথে। পবিত্র জুম্মার দিনে। আল্লাহর ঘর থেকে ফেরার পথে। এবং এই শাহাদাত হয়ে উঠলো আরও বেশি পবিত্র, আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।

ছয় দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ছিল একটি নতুন বাংলাদেশের প্রথম শ্বাস। তাঁর মৃত্যু ছিল একটি আন্দোলনের জন্ম। তাঁর শাহাদাত ছিল লক্ষ লক্ষ হাদির জাগরণ।

এই হলো হাদির গল্প। এক অসমাপ্ত বিপ্লবের গল্প। এক ইনসাফের স্বপ্নের গল্প। এক মানুষের গল্প যিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেলেন কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়।

# # অধ্যায় ১: কবির জন্ম, বিপ্লবীর উত্থান

শরীফ ওসমান বিন হাদী। এই ছিল তাঁর পুরো নাম। কিন্তু সবার সুবিধার জন্য তিনি নাম ছোট করেছিলেন - ওসমান হাদি। নামের পেছনে ছিল একটা দর্শন। তিনি চাইতেন সহজ হতে। সাধারণ মানুষের কাছাকাছি হতে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, "সহজ কথা যায় না বলা সহজে।"

কিন্তু হাদি শুধু একটা নাম ছিল না। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে, যখন কথা বলা মানে মৃত্যু, তখন হাদির ছিল আরেকটা পরিচয় - "সীমান্ত শরীফ"। এই ছদ্মনামে তিনি লিখতেন। লিখতেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। লিখতেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। লিখতেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।

তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা "রজস্রাবের রাষ্ট্র"। এই কবিতায় তিনি তুলে ধরেছিলেন ফ্যাসিবাদী শাসনের নোংরামি, অন্যায়, অত্যাচার। এই কবিতা হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য দলিল। মানুষ পড়ত। মানুষ ছড়িয়ে দিত। মানুষ সাহস পেত।

হাদি ছিলেন একজন কবি। কিন্তু তিনি ছিলেন সাধারণ কবি নন। তিনি ছিলেন এমন এক কবি যিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং পরিবর্তনের জন্য। তিনি ছিলেন এমন এক লেখক যিনি জানতেন লেখা একটা অস্ত্র। আর তিনি সেই অস্ত্র ব্যবহার করতেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।

হাদির অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনজন মহান ব্যক্তি। প্রথমে কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের কবিতা হাদির হৃদয়ে গেঁথে ছিল। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, নজরুলের সাম্যের বাণী, নজরুলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস - এসব হাদিকে শিখিয়েছিল কীভাবে লড়তে হয়।

দ্বিতীয়ত জসিমউদ্দীন। হাদি মনে করতেন, জসিমউদ্দীন ছিলেন একজন বড় বিপ্লবী। কেন? কারণ তিনি গ্রামীণ শব্দকে সাহিত্যে নাগরিক মর্যাদা দিয়েছেন। যে ভাষা মানুষ সাধারণ মনে করত, সেই ভাষাকে তিনি কবিতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটাই ছিল তাঁর বিপ্লব। এবং হাদি সেই বিপ্লব থেকে শিখেছিলেন - সাধারণ মানুষের ভাষাই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।

তৃতীয়ত আল মাহমুদ। তাঁর লোকজ শব্দের ব্যবহার এবং গদ্যশৈলী হাদীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কীভাবে দেশীয় শব্দ দিয়ে শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, সেটা হাদি শিখেছিলেন আল মাহমুদের কাছ থেকে।

হাদি নিজেও লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা। তাঁর "ছোট্ট বোর্ডিং" এবং "বোবার চক্ষু" কবিতা দুটিতে তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের হাহাকার ফুটে উঠেছে। পড়লে মনে হয় যেন হাদি নিজে একজন সাধারণ মানুষ, যিনি প্রতিদিন বাজারে যান, প্রতিদিন দাম বাড়তে দেখেন, প্রতিদিন কষ্ট পান।

এটাই ছিল হাদির শক্তি। তিনি সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারতেন। যে বিষয় অন্যদের কাছে তুচ্ছ মনে হতো, হাদি সেই বিষয়কেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। এটাই ছিল তাঁর "আউট অফ দ্য বক্স" চিন্তা।

# # অধ্যায় ২: জুলাই বিপ্লব - এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন

২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন নামে শুরু হলেও এটি দ্রুত পরিণত হয় একটি গণঅভ্যুত্থানে। হাজারো তরুণ রাজপথে নেমে আসে। তাদের দাবি - ইনসাফ। তাদের স্বপ্ন - নতুন বাংলাদেশ।

এই আন্দোলনে হাদি ছিলেন একজন অগ্রসেনানী। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন "ইনকিলাব মঞ্চ"। এই মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন লক্ষ লক্ষ তরুণের কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রতিটি বক্তব্য মানুষের হৃদয় স্পর্শ করত। তাঁর প্রতিটি কথা মানুষকে সাহস দিত।

জুলাই বিপ্লবের পর হাদি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন "রোল মডেল" তৈরি করতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার মাধ্যম হওয়া উচিত।

শুরুতে তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন। একা ছিলেন। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় তাঁর এই যাত্রা এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। তিনি প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত তিনি যেতেন প্রতিটি মসজিদে, প্রতিটি স্কুলে, প্রতিটি অলিতে-গলিতে। দরজায় দরজায় মানুষের সাথে কথা বলতেন। তাদের সুখ-দুঃখ শুনতেন। তাদের স্বপ্ন জানতেন।

এভাবেই হাদি জিতেছিলেন মানুষের হৃদয়। টাকা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে। ঘুষ দিয়ে নয়, সততা দিয়ে। ক্ষমতা দিয়ে নয়, সেবা দিয়ে।

হাদি দেখিয়েছিলেন এক নতুন রাজনীতি। আগে রাজনীতি ছিল টাকা আর ঘুষের খেলা। রাজনীতিবিদরা জনগণকে টাকা দিয়ে ভোট কিনতেন। কিন্তু হাদির রাজনীতি ছিল উল্টো। জনগণ নিজেরাই হাদিকে টাকা দিত। তাঁকে সাহস জোগাত। তাঁকে বলত, "তুমি ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলো, টাকার চিন্তা করো না। আমরা আছি।"

এটাই ছিল টাকার রাজনীতি বনাম ভালোবাসার রাজনীতি। এবং হাদি প্রমাণ করেছিলেন যে ভালোবাসার রাজনীতিই প্রকৃত রাজনীতি।

# # অধ্যায় ৩: ঢাকা-৮ - চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশের প্রতীক

হাদি যখন ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি একটি সাহসী ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, "ঢাকা-৮ আসনে কোনো সবজি বিক্রেতা বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেউ চাঁদা তুলতে পারবে না।"

এটা শুধু একটা প্রতিশ্রুতি ছিল না। এটা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। চাঁদাবাজদের প্রতি চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতিবাজদের প্রতি চ্যালেঞ্জ। পুরনো রাজনীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ।

হাদি আরও বলেছিলেন, তিনি যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তাহলে "সংসদে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রতিটি চাঁদাবাজের নাম প্রকাশ করে দেবেন।" কজন রাজনীতিবিদের এই সাহস আছে? কজন নেতা সংসদে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজদের নাম ধরে ধরে প্রকাশ করার সাহস রাখেন?

কিন্তু হাদি শুধু কথা বলতেন না। তিনি কাজও করতেন। তিনি মানুষকে বলেছিলেন, "যদি কেউ তোমাদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার চেষ্টা করে, তাহলে তার নাম আমাকে জানাও। আমি তাকে সামলাবো।"

এটাই ছিল হাদির সাহস। এটাই ছিল হাদির নেতৃত্ব। তিনি শুধু প্রতিশ্রুতি দিতেন না। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকতেন। তিনি জানতেন এতে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসত না। কারণ তাঁর কাছে দেশ ছিল সবার উপরে।

# # অধ্যায় ৪: পরিবার যেখানে ১৮ কোটি মানুষ

হাদির কাছে "দেশ" মানেই ছিল "পরিবার"। তিনি বলতেন, "দেশটাকে যদি আমার নিজের পরিবার মনে করি, তাহলে অবশ্যই পরিবারের কেউ ক্ষতি চাইবে না।"

এটা শুধু কথা ছিল না। এটা ছিল তাঁর জীবনের দর্শন। হাদি নিজের সন্তানের জন্য আলাদা কিছু ভাবেননি। নিজের স্ত্রীর জন্য, ভাই বোনের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কিছু ভাবেননি। তিনি ভেবেছেন, "দেশের ১৮ কোটি মানুষ যদি শান্তি পায়, সে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে আমার সন্তান, আমার স্ত্রী, আমার বাবা-মা, পরিবারের সবাই।"

কিন্তু এই দর্শনের মূল্য ছিল ভয়াবহ। হাদির তিন মাস বয়সী একটি সন্তান ছিল। তিনি সেই সন্তানকে মাত্র ৩০ মিনিটও কোলে নিতে পারেননি। কারণ তাঁর কাছে সময় ছিল না। সময় ছিল শুধু দেশের জন্য, ইনসাফের জন্য, ১৮ কোটি মানুষের জন্য।

একবার এক সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, চোখের পানি সামলাতে না পেরে, "মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয়। আমার তিন মাসের একটি বাচ্চা আছে। তাকে ৩০ মিনিট কোলে নিতে পারি নাই।"

এই কথা বলার সময় হাদির চোখে পানি চলে এসেছিল। কণ্ঠ ভারী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর সংকল্পে কোনো দুর্বলতা ছিল না। তিনি জানতেন কী করছেন। তিনি জানতেন কেন করছেন।

হাদি বলতেন, "আমার খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল - আল্লাহ যদি আমাকে নিয়ে যায়, বাচ্চাটার দিকে খেয়াল রাখবেন। তবে কথাটা বলতে পারি নাই।" কেন বলতে পারেননি? কারণ এই কথা বলা মানে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা। আর হাদি চাইতেন না মানুষ তাঁর দুর্বলতা দেখুক। তিনি চাইতেন মানুষ তাঁর শক্তি দেখুক।

এখানেই হাদির মহত্ত্ব। তিনি জানতেন তাঁর শিশু পিতৃহীন হবে। তাঁর স্ত্রী বিধবা হবে। তাঁর মা সন্তানহারা হবে। কিন্তু তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর একটি শিশুর পিতৃহীন হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ শিশু পাবে একটি ভালো দেশ। তাঁর একটি স্ত্রীর বিধবা হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ পরিবার পাবে শান্তি।

# # অধ্যায় ৫: হাজার বছরের প্রভাব - জীবনের মূল্য বনাম দৈর্ঘ্য

হাদির চিন্তাধারা ছিল অসাধারণ গভীর। তিনি একবার বলেছিলেন এমন একটা কথা যা তাঁর দর্শনের সারমর্ম প্রকাশ করে।

তিনি বলেছিলেন, "আমি জন্ম নেয়ার পর যদি পঞ্চাশ বছর, ৬০ বছর, ১০০ বছর বেঁচে থাকি, এবং আমার দ্বারা কোন দেশের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে ইমপ্যাক্ট সৃষ্টি না হয়, তাহলে কি লাভ হবে? অন্তত আমাকে শহীদ করে দেয়ার পরে যদি এমন একটা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয় যা আগামী ১০০০ বছর পর্যন্ত ইনশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে, লক্ষ কোটি কোটি মানুষ দুহাত তুলে আমার জন্য দোয়া করবে।"

এই কথার মধ্যে লুকিয়ে ছিল হাদির সম্পূর্ণ দর্শন। তিনি ভাবতেন না নিজের জীবনের দৈর্ঘ্য নিয়ে। তিনি ভাবতেন জীবনের গভীরতা নিয়ে, প্রভাব নিয়ে, অর্থ নিয়ে।

হাদি প্রায়ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদাহরণ দিতেন। তিনি বলতেন, "দেখো জিয়া কত অল্প সময় ছিলেন, কিন্তু তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে এমন জায়গা করে নিয়েছেন যে আজও মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর জন্য দোয়া করে।"

হাদিও চেয়েছিলেন তেমনি একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে। স্বল্প সময়ে হলেও, এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা বংশ পরম্পরায় মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে। এবং সত্যিই, তিনি সফল হয়েছেন। আজ তাঁর শাহাদাতের মাত্র কয়েক দিন পরেই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে মনে রাখছে, তাঁর জন্য দোয়া করছে, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হচ্ছে।

হাদি ১০০ বছর বেঁচে থেকে নিজের পরিবারের জন্য সম্পদ জমা করতে পারতেন। নিজের সন্তানদের জন্য বিশাল ব্যবসা গড়তে পারতেন। নিজের জন্য আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু হাদি সেই পথ বেছে নেননি।

হাদি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছোট হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রভাব হবে বিশাল। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর সন্তান হয়তো পিতৃহীন হবে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ সন্তান পাবে অনুপ্রেরণা।

# # অধ্যায় ৬: মায়ের কাছে স্বপ্নের কথা - শাহাদাতের প্রার্থনা

হাদির মায়ের সাথে তাঁর কথোপকথন ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তিনি তাঁর মাকে বলতেন, "মা, যারা রাজনীতি করে দেশের জন্য, তাদের ঘরে মৃত্যু হওয়া সেটা ভালো কিছু নয়। তাদের তো রাস্তায়, আন্দোলনে মৃত্যু হতে হয়। তাদের শহীদ হতে হয়।"

একজন মা তাঁর সন্তানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কী অনুভব করেন? একজন মা যিনি চান তাঁর সন্তান নিরাপদে বাসায় থাকুক, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকুক, তাঁর সন্তান বলছে রাস্তায় শহীদ হওয়াই তাঁর কাম্য।

কিন্তু হাদির মা বুঝতেন। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান সাধারণ কোনো মানুষ নয়। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান একটা উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মেছে।

হাদি তাঁর মাকে আরও বলতেন, "আমি স্বপ্ন দেখি, প্রার্থনা করি - একটা বিশাল আন্দোলনের মিছিল, সকলের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, দুহাত উঁচু করে, দেশের স্বার্থে, ইনসাফ বাস্তবায়নে। ওখানে আমি গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ইনসাফের হাসি হেসে, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে, শহীদ হয়ে চলে যাচ্ছি। এটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।"

এই ছিল হাদির স্বপ্ন। এই ছিল হাদির প্রার্থনা। তিনি প্রার্থনা করতেন শহীদ হওয়ার জন্য। প্রার্থনা করতেন ইনসাফের পথে মৃত্যুবরণ করার জন্য।

হাদি আরও বলতেন, "কেউ শহীদ হলে পরে, কিছু ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে যাবে। তখন আর অবস থাকবে না কেউ।" তিনি জানতেন যে তাঁর জীবদ্দশায় সবাই তাঁকে বুঝবে না। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের পরে, শয়তান ছাড়া সবাই বুঝে যাবে হাদি কে ছিলেন, তিনি কী চেয়েছিলেন।

এবং ঠিক তাই হলো। ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫। পবিত্র জুম্মার দিন। হাদি জুম্মার নামাজ পড়ে বের হলেন। একটি অটোরিক্সায় করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এগিয়ে আসে। এবং কাপুরুষের মতো পেছন থেকে গুলি করা হয় হাদির মাথায়।

তাঁর স্বপ্ন ছিল মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে, দুহাত তুলে, সবার সামনে শহীদ হওয়ার। কিন্তু হত্যাকারীদের সেই সাহস ছিল না। তারা পেছন থেকে গুলি করল। কারণ সামনে থেকে হাদির চোখে চোখ রেখে গুলি করার সাহস তাদের ছিল না। তারা জানত, সামনে থেকে গুলি করতে গেলে হাদির চোখের দিকে তাকাতে হবে। আর হাদির চোখে ছিল সত্য, সাহস, ইনসাফ। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে গুলি করার সাহস কোনো হত্যাকারীর থাকে না।

তাই তারা পেছন থেকে গুলি করল। পবিত্র জুম্মার দিনে। নামাজের পরে। একজন নিরস্ত্র মানুষকে। এটা ছিল তাদের কাপুরুষতার প্রমাণ। এটা ছিল তাদের ভয়ের প্রমাণ। তারা ভয় পেত হাদিকে। ভয় পেত হাদির আদর্শকে। ভয় পেত হাদির প্রভাবকে।

কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, হাদিকে মেরে তারা আসলে হাজার হাজার হাদি সৃষ্টি করেছে। পবিত্র জুম্মার দিনে হাদির এই শাহাদাত হয়ে উঠেছে আরও বেশি পবিত্র, আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আর সত্যিই, ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে গেছে হাদি কে ছিলেন। আজ পুরো বাংলাদেশ বুঝেছে, পুরো জাতি জেগে উঠেছে।

# # অধ্যায় ৭: চিন্তক হাদি - বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন

হাদি শুধু একজন রাজনীতিবিদ বা কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন গভীর চিন্তক। তিনি সমাজের প্রতিটি অসংগতি, প্রতিটি বৈষম্য, প্রতিটি অন্যায় নিয়ে চিন্তা করতেন।

হাদি একটি মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর মতে, "এ দেশে একজন নারী পেটের দায়ে শরীর বিক্রি করলে সেই লজ্জা পুরো জাতির।" এই কথার মধ্যে ছিল তাঁর সামাজিক চেতনার গভীরতা। তিনি বুঝতেন যে একজন মানুষের দুর্দশা আসলে পুরো সমাজের ব্যর্থতা।

হাদি বিশ্বাস করতেন, "মানুষের ন্যূনতম অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটলে ভালো সমাজ গঠন সম্ভব নয়।" তিনি জানতেন যে একটা সমাজে যতদিন কেউ অনাহারে থাকবে, যতদিন কেউ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না, ততদিন সেই সমাজে ইনসাফ আসবে না।

হাদি বৈষম্য নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার নষ্ট করা দেখলে তীব্র ক্ষোভ অনুভব করতেন। কারণ তিনি জানতেন, ঠিক সেই সময়ে কোনো শিশু হয়তো ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে।

একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "এক দিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজার হাজার টাকার খাবার নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে একটা শিশু ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে। এটা কোন সমাজ? এটা কোন বাংলাদেশ?"

এই বৈষম্য, এই অসমতা হাদির হৃদয়কে রক্তাক্ত করত। তাই তিনি লড়েছেন এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে। লড়েছেন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়তে যেখানে সবাই সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।

হাদির একটি বড় স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি জ্ঞানের আর্কাইভ বা গাইডলাইন তৈরি করা। যেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য, সিনেমা বা থিয়েটার নিয়ে যারা পড়তে চায়, তারা সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তিনি চেয়েছিলেন তরুণদের জন্য এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে তারা বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিক পথে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।

হাদি বলতেন, "যার যার অবস্থান থেকে ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে শরিক হতে হবে।" একজন কবি কবিতা লিখে লড়াই করবে। একজন শিক্ষক শিক্ষা দিয়ে লড়াই করবে। একজন ব্যবসায়ী সৎ ব্যবসা করে লড়াই করবে। প্রত্যেকে তার নিজের জায়গা থেকে ইনসাফের জন্য লড়লে, একদিন ইনসাফের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

# # অধ্যায় ৮: যোদ্ধা হাদি - জবাবদিহিতার দাবিদার

কিন্তু হাদি শুধু স্বপ্ন দেখতেন না। তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কঠোর এবং নির্ভীকভাবে লড়াই করতেন। তিনি কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করতেন না।

যখন সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হলো, হাদি তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে তিন দিনের আল্টিমেটাম দেন। দাবি করেন, "কার নির্দেশে বা কার ফোনের মাধ্যমে হামিদকে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেটা স্পষ্ট করতে হবে।"

হাদি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যদি সরকার এই অপরাধীদের নাম প্রকাশ করে তাদের গ্রেফতার না করে, তবে জনগণ মনে করবে সরকার নিজেই এর সাথে জড়িত।"

এটাই ছিল হাদির সাহস। তিনি সরকারকেও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে ভয় পেতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতায় থাকুক আর না থাকুক, সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে।

হাদি ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং মাহফুজুল আলমকে পদত্যাগ করে জনতার কাতারে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "এই ছাত্র উপদেষ্টারা ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার, রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর অপসারণ বা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মতো দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তাহলে তারা ক্ষমতায় থেকে কি করছেন?"

হাদি সতর্ক করে দেন, "কেউ যেন জুলাই আন্দোলনের 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে নিজেকে দাবি না করে। আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হলো ১৮ কোটি জনতা এবং শহীদরা।" এই ছিল হাদির বিনয়। তিনি জানতেন বিপ্লব কোনো একজনের সৃষ্টি নয়। বিপ্লব সমগ্র জনগণের সৃষ্টি।

হাদি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে দাবি করেন যে, জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক মানের প্রসিকিউটর এবং বিচারক নিয়োগ দেওয়া হোক। তিনি তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "সরকার উন্নয়নের জন্য বিদেশী এক্সপার্ট আনলেও গণহত্যার বিচারের জন্য কেন এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক মানের টিম আনেনি?"

এই প্রশ্নটা ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং যুক্তিযুক্ত। উন্নয়নের জন্য বিদেশী এক্সপার্ট আসবে, কিন্তু শহীদদের বিচারের জন্য আসবে না? এটা কোন অগ্রাধিকার?

# # অধ্যায় ৯: শহীদদের মায়েদের কাছে করা ওয়াদা

অনেকে হাদীকে "ভায়োলেন্ট" বা উগ্র কথা বলার জন্য সমালোচনা করতেন। তাঁর ভাষা কঠোর ছিল, এটা সত্য। কিন্তু কেন?

হাদি নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "যখন গণহত্যাকারীদের পালাতে দেওয়া হয় এবং শহীদদের রক্তের অবমাননা করা হয়, তখন অসভ্য ভাষা ছাড়া এদের কানে কথা পৌঁছানো সম্ভব নয়।"

হাদির কঠোর ভাষার পেছনে ছিল শহীদদের মায়েদের কাছে করা ওয়াদা। তিনি শহীদ আবু সাঈদ এবং মুগ্ধদের মায়েদের সাথে কথা বলেছিলেন। সেই মায়েরা তাঁদের সন্তানদের রক্তের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।

একজন মা যিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, তিনি কী চান? তিনি চান তাঁর সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার হোক। তিনি চান তাঁর সন্তানের রক্ত বৃথা না যাক। তিনি চান তাঁর সন্তান যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক।

হাদি সেই মায়েদের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে তাদের সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। এখন যখন হাদি দেখতেন যে গণহত্যাকারীরা পালিয়ে যাচ্ছে, যখন তিনি দেখতেন যে বিচার হচ্ছে না, তখন তাঁর হৃদয় রক্তাক্ত হতো।

তিনি ভাবতেন, "শহীদদের মায়েদের মুখের দিকে কীভাবে তাকাবো? কীভাবে বলবো যে তাদের সন্তানদের বিচার হচ্ছে না?"

তাই হাদির ভাষা কঠোর হতো। কারণ তিনি লড়ছিলেন শহীদদের জন্য। লড়ছিলেন ইনসাফের জন্য। লড়ছিলেন সেই মায়েদের জন্য যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন।

# # অধ্যায় ১০: চূড়ান্ত সংগ্রামের ঘোষণা

হাদি ঘোষণা দিয়েছিলেন, "যদি তিন দিনের মধ্যে দাবিগুলো মানা না হয়, তবে আমরা সচিবালয় ঘেরাও করবো। এবং এবার সচিবালয়ে গেলে আর বাড়ি ফিরবো না। হয় দাবি আদায় হবে নতুবা সরকারের পতন হবে।"

এটা কোনো ফাঁকা হুমকি ছিল না। এটা ছিল হাদির দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, "জুলাই বিপ্লবের সাথে কোনো গাদ্দারি বরদাশত করা হবে না, তা নিজের বাবা বা ভাই হলেও।"

এটাই ছিল হাদির আপসহীন অবস্থান। এটাই ছিল হাদির নীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের সাথে আপস করা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।

হাদি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, "ইনসাফ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত হাদিরা রাজপথ ছাড়বে না।"

এবং তিনি রেখে গেছেন সেই আপসহীন মনোভাব, সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, সেই অদম্য সাহস। আজ যারা হাদির পথে চলছে, তারা সেই মনোভাব নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।

# # অধ্যায় ১১: হাদির শেষ দাবি - বিচারের অঙ্গীকার

হাদি একটাই দাবি করেছিলেন। একটাই আবেদন রেখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমাকে যদি কেউ মেরে ফেলে, শহীদ করে ফেলে, কোন দুঃখ থাকবে না। কিন্তু এই হত্যার যাতে বিচার হয়।"

এটা শুধু হাদির ব্যক্তিগত আবেদন ছিল না। এটা ছিল ভবিষ্যতের সব হাদিদের জন্য নিরাপত্তার আবেদন। এটা ছিল ইনসাফের বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের আবেদন।

হাদি জানতেন, "যদি আমার হত্যার বিচার না হয়, তাহলে এই দেশে আর কোনো হাদি জন্ম নিতে সাহস পাবে না। কোনো তরুণ এগিয়ে আসবে না ইনসাফের জন্য লড়তে। কোনো মা তার সন্তানকে দেশপ্রেমিক হওয়ার সাহস দেবে না।"

হাদির এই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে। তাঁর ভাই ওমর বিন হাদি বলেছেন, "আমি যদি আবার আমার ভাইয়ের হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথে নামি, আমাকেও হত্যা করা হবে; এই ভয় আমার মায়ের মধ্যে কাজ করছে। মা ইতোমধ্যে এক সন্তান হাদীকে হারিয়েছেন, আরেকটাকেও হারানোর আশঙ্কায় ভীত।"

এই কথাটা ভয়াবহ। হাদির মা এক সন্তান হারিয়েছেন। এখন ভয় পাচ্ছেন আরেক সন্তান হারাবেন কিনা। কারণ তিনি জানেন যে এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া মানে মৃত্যু।

এটাই তো সেই প্রশ্ন যা হাদি রেখে গেছেন। যদি হাদির হত্যার বিচার না হয়, তাহলে আর কে এগিয়ে আসবে? কোন মা তার সন্তানকে এই পথে আসতে দেবে?

হাদির হত্যার বিচার শুধু একটা আইনি প্রক্রিয়া না। এটা একটা সামাজিক চুক্তি। এটা একটা জাতীয় অঙ্গীকার। এটা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি।

যদি হাদির হত্যার বিচার হয়, তাহলে বার্তা যাবে পুরো দেশে: এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া নিরাপদ। এই দেশে সত্য বলা সম্মানিত। তখন হাজার হাজার তরুণ এগিয়ে আসবে। হাজার হাজার হাদি জন্ম নিবে এই মাটিতে।

কিন্তু যদি বিচার না হয়? তাহলে বার্তা যাবে ভিন্ন: এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া মানে মৃত্যু। এই দেশে সত্য বলা মানে বিপদ। তখন কোনো মা তার সন্তানকে এই পথে আসতে দেবে না। ভয়ে, আতঙ্কে সবাই চুপ থাকবে। আর চুপ থাকার মধ্যে মরে যাবে ইনসাফের বাংলাদেশ।

# # অধ্যায় ১২: পরিবারের দাবি - টাকা নয়, বিপ্লব চাই

হাদির মেজো ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি বলেছেন এমন কথা যা হাদির আদর্শের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রকাশ করে। তিনি বলেছেন, "আমরা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অনুদান চাই না। ওসমান যে বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য জীবন দিয়েছে, সেই অসমাপ্ত বিপ্লবকে সমাপ্ত করাই আমাদের একমাত্র দাবি।"

এটাই তো হাদির পরিবার। এখানে টাকা-পয়সার মূল্য নেই। এখানে ক্ষমতার মূল্য নেই। এখানে শুধু আদর্শের মূল্য আছে। হাদির ভাই বলছেন, "আমরা টাকা চাই না। আমরা চাই হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক।"

ওমর বিন হাদি আরও বলেছেন, "আমি চেয়েছিলাম রাজপথে বিপ্লবী ওসমানের পাশে থেকে, এই বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদ মুক্ত করতে। আমি চেয়েছিলাম ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়বো না। কিন্তু আজকে ওসমান চলে গেছেন।"

কিন্তু ওসমান চলে গেলেও ওসমানের স্বপ্ন থেমে নেই। ওসমানের ভাই সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ওসমানের সহযোদ্ধারা সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে লড়ছে।

# # অধ্যায় ১৩: জাতির কাছে অঙ্গীকার - ড. ইউনূসের প্রতিশ্রুতি

হাদির জানাজায়, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন এমন কথা যা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিনি বলেছেন, "বীর ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছ এবং চিরদিন বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে।"

তিনি আরও বলেছেন, "আমরা আজকে তোমাকে প্রিয় হাদি, বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছ, সেটি যেন আমরা পূরণ করতে পারি।"

এটা শুধু একটা বক্তৃতা না। এটা একটা জাতীয় অঙ্গীকার। একটা প্রতিশ্রুতি যে হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। হাদি যা বলে গেছেন, তা পূরণ হবে।

আর জাতি হাদিকে সম্মান জানিয়েছে এক অনন্য উপায়ে। শাহবাগের সেই ঐতিহাসিক চত্বর, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু, সেই চত্বরকে এখন বলা হয় "শহীদ ওসমান হাদি চত্বর"।

এটা শুধু একটা নামকরণ না। এটা একটা প্রতীক। একটা স্মারক। একটা অঙ্গীকার যে হাদির নাম, হাদির স্বপ্ন, হাদির আদর্শ চিরকাল বাংলাদেশের হৃদয়ে থাকবে।

# # অধ্যায় ১৪: এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে

আজ পুরো বাংলাদেশ স্লোগান দিচ্ছে - "এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে।"

এই স্লোগান শুধু কথা না। এটা বাস্তব। এক হাদি চলে গেছেন, কিন্তু লক্ষ লক্ষ হাদি জন্ম নিচ্ছে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি গ্রামে।

হাদির শাহাদাত যে বীজ বপন করে গেছে, সেই বীজ থেকে এখন লক্ষ লক্ষ গাছ জন্ম নিচ্ছে। প্রতিটি তরুণ যে আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে ইনসাফের দাবি তুলছে, সে একজন হাদি। প্রতিটি মা যে তার সন্তানকে সৎ হতে শেখাচ্ছে, সে হাদির শিক্ষা বাস্তবায়ন করছে। প্রতিটি লেখক যে লিখছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সে হাদির উত্তরাধিকার বহন করছে।

হাদি বলে গেছেন, "চলতে থাকো, দৌড়াতে থাকো। দৌড়াতে না পারলে হাঁটো, হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দাও। কিন্তু থেমে যেও না।"

এবং আজকের হাদিরা থেমে নেই। তারা চলছে। তারা দৌড়াচ্ছে। তারা লড়ছে। কারণ তারা জানে, থামলেই শেষ। চললেই জয়।

# # অধ্যায় ১৫: একজন অনুসারীর আত্মজিজ্ঞাসা - "আমি কীভাবে হাদি হব?"

হাদির শাহাদাতের পর, হাজারো মানুষের জীবনে ঘটছে এক অদ্ভুত পরিবর্তন। একজন যুবক, যিনি সারাজীবন প্রতিজ্ঞা করে এসেছেন কখনো রাজনীতি করবেন না, কখনো নির্বাচন করবেন না, আজ রাতের পর রাত ঘুমাতে পারছেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলছেন। তাঁর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: "আমি কীভাবে হাদি হব?"

এই যুবক লিখছেন তাঁর বন্ধুকে। লিখছেন সেই কথা যা তিনি সাধারণত কাউকে বলেন না। তিনি লিখছেন:

"আর আমার কেন যেন মনে হইতেছে অনেকদিন বসে রইলাম। এই মুহূর্তে হাদী হইয়া কাজ করা দরকার।"

কিন্তু কীভাবে? তাঁর মোটরসাইকেল নষ্ট। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। একসময় লক্ষ লক্ষ টাকা লেনদেন করতেন, আজ ৫০০ টাকা ধার চাইতে পারবেন এমন কাউকে খুঁজে পান না পরিবার ছাড়া।

কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়ছেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: "মা-বাবা ভাই-বোন পরিবারের দোয়া নিয়ে প্রত্যেকদিন বাসে চলে যাব। বাসে যাতায়াত করেই কাজ করব যতদিন নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না হয়।"

এটাই তো হাদির শিক্ষা। এটাই তো হাদির বাংলাদেশ। যেখানে একজন মানুষ নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই কাজ করে যায়। দৌড়াতে না পারলে হাঁটে। হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দেয়। কিন্তু থামে না।

তিনি লিখছেন তাঁর সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের কথা:

"সবশেষে ওই যে অসুস্থ হয়ে পড়ছি অনেকদিন ঘুমাইতে পারি নাই। শুধু একটা কথা মনকে বুঝাইতে পারি নাই - হাদি শহীদ হয়ে গেছে, হাদীর মত করে হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করার চেষ্টা করলে বেইমানি হবে। হাদিসের সাথে বেইমানী হবে। হাদির অবুঝ শিশুর সাথে বেইমানী হবে। আর এই বেইমানি শুধু হাদি অথবা হাদির শিশুর সাথে নয়, এই বেইমানি ১৮ কোটি হাদির সাথে, ১৮ কোটি শিশুর সাথে বেইমানি। এই বেইমানি বাংলাদেশের সাথে বেইমানি।"

এই উপলব্ধি তাঁকে পাগল করে দিচ্ছে। রাত জেগে তিনি ভাবছেন। কীভাবে কাজ করবেন? কোন কৌশলে? কোন পথে?

এবং তিনি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত:

"আমার জীবনে অনেকগুলো প্রতিজ্ঞা আছে। তার মধ্যে অন্যতম দুইটি প্রতিজ্ঞা: নাম্বার ওয়ান - কখনো রাজনীতি করবো না। নাম্বার টু - কখনো নির্বাচন করব না, মেম্বার-চেয়ারম্যান-এমপি-মন্ত্রী কিছুই না। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে প্রতিজ্ঞাগুলো ভাঙতে হবে। প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো রাজনীতি করব না - ভাবছি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব, রাজনীতি শুরু করব হাদীর মত করে। প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো নির্বাচন করব না - প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব, নির্বাচন করব, শুধুমাত্র হাদীর মত করে।"

এটা কত বড় পরিবর্তন! একজন মানুষ যিনি সারাজীবন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন, আজ হাদির জন্য, হাদির স্বপ্নের জন্য, তিনি রাজনীতিতে নামতে প্রস্তুত। এটাই তো হাদির প্রভাব। এটাই তো হাদির বিপ্লব।

এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর মায়ের কাছে যাবেন। মাকে বলবেন গোসল করিয়ে দিতে। ঠিক যেভাবে একজন মা তাঁর সন্তানকে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন, সেভাবে। এবং সেই গোসলের সময় তিনি মাকে বলবেন:

"মা, তুমি কি চাও না হাদির বিচার হোক? তুমি কি চাও না হাদির মত আর কেউ জীবন না হারাক? কোন মায়ের বুক খালি না হোক? কোনো যুবতী বোন বিধবা না হোক? কোন সন্তান তার বাবার আদর্শ আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত না হোক?"

এবং তিনি মাকে বলবেন:

"মা, আজকে গোসল করিয়ে আমাদেরকে অনুমতি দাও। আমার মনে হচ্ছে, কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে, হাদী ভাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা ঝাপিয়ে না পড়লে হাদী ভাইয়ের সাথে বেইমানি হবে। শহীদ না হয়ে মৃত্যু কামনা করো না মা। বেইমান হয়ে মৃত্যুবরণ করি, এটা তো অবশ্যই চাইবে না।"

এই হলো হাদির বাংলাদেশ। এই হলো হাদির প্রভাব। একজন মানুষ, যিনি কখনো রাজনীতি করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আজ হাদির জন্য সেই প্রতিজ্ঞা ভাঙতে প্রস্তুত। কারণ তিনি বুঝে গেছেন, হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করা মানে বেইমানি। বেইমানি হাদির সাথে। বেইমানি হাদির শিশুর সাথে। বেইমানি ১৮ কোটি মানুষের সাথে।

এই যুবকের মতো আজ হাজারো মানুষ একই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হাজারো মানুষ রাতের পর রাত ঘুমাতে পারছে না। হাজারো মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে: "আমি কীভাবে হাদি হব?"

এবং প্রত্যেকে তাদের নিজের উত্তর খুঁজে নিচ্ছে। কেউ রাজনীতিতে নামছে। কেউ লেখালেখি শুর

 # ইনসাফের বাংলাদেশ: একটি রণসংগীত # # হাদীদের ডাকচল চল চল হাদী, তোরা এগিয়ে চল। তোরা চিন্তা করিস না, তোরা ভাবিস না, তোরা...
27/12/2025

# ইনসাফের বাংলাদেশ: একটি রণসংগীত

# # হাদীদের ডাক

চল চল চল হাদী, তোরা এগিয়ে চল। তোরা চিন্তা করিস না, তোরা ভাবিস না, তোরা বিচলিত হোস না। তোরা মনে করিস না যে দেশের জনগণ তোদের সাথে নেই। যদিও তোরা এটা বেঁচে থাকতে বুঝবি না, তোরা বুঝলেও বুঝবে না। কেউ শহীদ হলে পরে তখন কিছু ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে যাবে। তখন আর অবস থাকবে না কেউ।

চল চল চল চল হাদী, চলা চল। তোরা ভাবিস না, তোরা চিন্তা করিস না, তোরা বিচলিত হোস না। তোরা মনে করিস না তোদের সাথে নেই কেউ। তোদের সাথে দেশ আছে, দেশের জনগণ আছে, ইনসাফ আছে। আর এটাই হাদীদের ইনসাফের বাংলাদেশ। যে বুঝার সে বুঝুক, না বুঝলে না বুঝুক বা কেউ।

চল চল হাদী, তোরা চল। তোরা এগিয়ে চল। থেমে গেলে হবে না। হাদি বলেছিল চলতে থাকো, দৌড়াতে থাকো। দৌড়াতে না পারলে হাঁটো, হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাও। কিন্তু থেমে যেও না। চল চল চল হাদী, চলাচল। তোরা এগিয়ে চল।

# # নতুন রাজনীতির সূর্যোদয়: রোল মডেলের জন্ম

হাদি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন রোল মডেল তৈরি করতে। জুলাই বিপ্লবের পর তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার মাধ্যম হওয়া উচিত। শুরুতে তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন, একা ছিলেন। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় তাঁর এই যাত্রা এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছে।

হাদি প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত, প্রতিটি মসজিদে, প্রতিটি স্কুলে, প্রতিটি অলিতে-গলিতে তিনি গেছেন। দরজায় দরজায় মানুষের সাথে কথা বলেছেন। তাদের সুখ-দুঃখ শুনেছেন। তাদের স্বপ্ন জেনেছেন। এভাবেই হাদি জিতেছেন মানুষের হৃদয়, টাকা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে।

তোরা দেখস না, রাজনীতি করেছে যারা পূর্বে, তারা জনগণকে নিরবে ঘুষ দিয়ে, টাকা দিয়ে নির্বাচন করত। হাদি দেখিয়েছেন ভোট কেনা-বেচা করার দরকার নেই। তোরা দেখস না এখন জনগণ তোদেরকে টাকা দেয়, তাদেরকে বলে সাহস দেয়। ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলো, টাকার চিন্তা করো না। টাকা তো জনগণ দিবে, ঘরে তুলবে হাদির ইনসাফের বাংলাদেশ।

এটাই হলো টাকার রাজনীতি বনাম ভালোবাসার রাজনীতি। আগে রাজনীতি ছিল ঘুষ আর টাকার খেলা। কিন্তু হাদি দেখিয়েছেন, জনগণ যখন নেতাকে ভালোবাসে, তারা নিজেরাই নেতাকে টাকা দেয় এবং সাহস জোগায়। জনতাই নির্বাচন করে কে তাদের নেতা হবে, ব্যালট বাক্স নয়, হৃদয়ই হয় আসল ভোটকেন্দ্র।

চল চল হাদী, তোরা এগিয়ে চল। তোরা থেমে যাস নি। তোরা এগিয়ে চল। তোদের সাথে দেশ আছে, দেশের জনগণ আছে। হাদির যে দেখেছিল স্বপ্ন, সেই স্বপ্ন তো তোদের চোখে এখন। হাদির যে বলেছিল কথা, সেই কথাই তো তোদের মুখে এখন।

# # পরিবার যেখানে ১৮ কোটি মানুষ

দেশটাকে যদি আমার নিজের পরিবার মনে করি, অবশ্যই আমার পরিবারের কেউ বা কোন সদস্য পরিবারের ক্ষতি চাইবে না। সেটা হোক সৌন্দর্যের ক্ষতি, সেটা হোক পারিবারিক বিষয়। অন্য পরিবার যাতে নাক না গলাতে পারে এ বিষয়ে।

হাদীর মত মানুষ দেশটাকে নিজের পরিবারই মনে করেছে। নিজের সন্তানের জন্য আলাদা কিছু ভাবেননি। ভাবেননি নিজের স্ত্রীর জন্য, ভাই বোনের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কিছু। হাদিরা ভেবেছেন, দেশের ১৮ কোটি মানুষ যদি শান্তি পায়, সে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে আমার সন্তান, আমার স্ত্রী, আমার বাবা-মা, পরিবারের সবাই।

সেজন্যই তো তার মধ্যে ছিল না ছেলে মেয়ের চিন্তা, স্ত্রীর চিন্তা, বাবা মায়ের জন্য আলাদা কোনো চিন্তা। শুধু চিন্তা ছিল ইনসাফের বাংলাদেশের বাস্তবায়ন। এটাই তো হাদির ইনসাফের বাংলাদেশ।

# # পিতার উত্তরাধিকার: শক্তির প্রথম উৎস

কিন্তু হাদিকে বুঝতে হলে সবার আগে বুঝতে হবে তাঁর পিতাকে। হাদি নিজেই বলেছেন, তাঁর পিতা ছিলেন তাঁর "দুনিয়ার সমস্ত শক্তি"। তাঁর পিতা ছিলেন একজন কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল, কিন্তু শুধু একজন শিক্ষক নন। তিনি ছিলেন প্রচণ্ড সমাজসচেতন এবং সংগ্রামী এক ব্যক্তিত্ব।

হাদির যে স্লোগান আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে মুখে, সেই স্লোগানের শক্তি আসলে তাঁর পিতার কাছ থেকেই পাওয়া। হাদি নিজেই স্বীকার করেছেন যে তাঁর পিতা তাঁর চেয়েও দুর্দান্ত এবং তেজস্বী স্লোগান দিতেন। এমনকি বার্ধক্যকালেও তাঁর পিতার সেই তেজ বিন্দুমাত্র কমেনি। একজন বৃদ্ধ মানুষ, কিন্তু হৃদয়ে তারুণ্য, কণ্ঠে বজ্র, চোখে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের আগুন।

হাদি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন, তখন তাঁর পিতা ইন্তেকাল করেন। কিন্তু সেই শেষ দিনগুলোর স্মৃতি হাদির মনে গভীরভাবে খোদাই হয়ে গিয়েছিল। তিনি তাঁর পিতার মসজিদে খুতবা দেওয়ার মুহূর্তগুলো মনে রেখেছিলেন। বিশেষ করে দ্বিতীয় খুতবায় যখন তাঁর পিতা উচ্চকণ্ঠে প্রার্থনা করতেন, হাদি তখন বুঝতে পেরেছিলেন যে তাঁর পিতা হয়তো খুব শীঘ্রই তাঁদের ছেড়ে চলে যাবেন। একজন সন্তান যখন বুঝতে পারে তার পিতা আর বেশিদিন নেই, সেই অনুভূতি কতটা যন্ত্রণাদায়ক।

কিন্তু হাদির পিতা শুধু একটা স্মৃতি রেখে যাননি। তিনি রেখে গেছেন একটা আদর্শ। একটা সংগ্রামী চেতনা। একটা অদম্য সাহস। হাদির আজকের যে তেজ, যে বজ্রকণ্ঠ, যে নির্ভীক চলা - এসবই তাঁর পিতার দেওয়া উত্তরাধিকার।

হাদির পিতা শিখিয়ে গেছেন যে শিক্ষক হওয়া মানে শুধু বই পড়ানো নয়। শিক্ষক হওয়া মানে সমাজের বিবেক হওয়া। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। মানুষের পক্ষে কথা বলা। এবং এই শিক্ষা হাদি কেবল মনে রাখেননি, তিনি জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন।

পিতার মৃত্যুর পর হাদি যখন একা হয়ে গেলেন, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে তাঁর কাঁধে এখন একটা দায়িত্ব এসে পড়েছে। পিতার সেই সংগ্রামী চেতনাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্ব। পিতার স্বপ্নগুলোকে বাস্তব করার দায়িত্ব। পিতার আদর্শকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ছড়িয়ে দেওয়ার দায়িত্ব।

এবং হাদি সেই দায়িত্ব পালন করেছেন। পিতার সেই তেজস্বী কণ্ঠ হাদির মধ্যে জীবিত হয়ে উঠেছিল। পিতার সেই সমাজসচেতনতা হাদিকে রাজপথে নামিয়েছিল। পিতার সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস হাদিকে শাহাদাত পর্যন্ত নিয়ে গিয়েছিল।

আজ যখন আমরা হাদির কথা শুনি, তাঁর স্লোগান শুনি, তাঁর তেজ দেখি - আমরা আসলে তাঁর পিতারও প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। হাদি ছিলেন তাঁর পিতার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার। এবং এখন হাদির আদর্শ হচ্ছে লক্ষ লক্ষ তরুণের কাছে পৌঁছানো। পিতার শেখানো সংগ্রামী চেতনা এখন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

# # মায়ের জন্য আর্তি: বিপ্লবীর মানবিক হৃদয়

আরজে কিবরিয়ার সাক্ষাৎকারে হাদি এমন একটি কথা বলেছিলেন যা তাঁর মানবিক দিকটি প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন, "ফিরে আসার সময় মারে দেখি নাই, আমার একটাবার মন চায় আমার মারে দেখি।" একজন বিপ্লবী নেতা, যিনি পুরো দেশের জন্য লড়ছেন, যিনি রাজপথে দিনের পর দিন কাটাচ্ছেন, তিনিও তো মানুষ। তিনিও মায়ের স্নেহের জন্য আকুল হন।

এই আর্তি শুনলে বোঝা যায় হাদি কত বড় ত্যাগ স্বীকার করছিলেন। তিনি তাঁর মায়ের সাথেও সময় কাটাতে পারছিলেন না। নিজের পরিবার, নিজের প্রিয়জন সবকিছু ছেড়ে তিনি ছুটে চলেছিলেন দেশের জন্য, ইনসাফের জন্য। কিন্তু তাঁর হৃদয়ে ছিল মায়ের জন্য গভীর ভালোবাসা। মায়ের মুখ দেখার জন্য আকুল আকাঙ্ক্ষা।

এই একটি বাক্যই প্রমাণ করে যে হাদি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন সন্তান। একজন মানবিক মানুষ। যিনি নিজের আবেগকে দমিয়ে রেখে দেশের জন্য কাজ করে চলেছিলেন। কিন্তু তাঁর হৃদয় কাঁদছিল মায়ের জন্য।

# # কবি হাদি: সীমান্ত শরীফের কলম

কিন্তু হাদি শুধু একজন রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন কবি, একজন লেখক, একজন চিন্তক। তাঁর পুরো নাম শরীফ ওসমান বিন হাদী। কিন্তু সবার সুবিধার জন্য তিনি নাম ছোট করে ওসমান হাদী হয়েছিলেন।

ফ্যাসিবাদী শাসনামলে, যখন কথা বলা মানে মৃত্যু, যখন লেখা মানে বিপদ, তখন হাদি লিখতেন "সীমান্ত শরীফ" ছদ্মনামে। এই ছদ্মনামেই তিনি লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা "রজস্রাবের রাষ্ট্র"। এই কবিতা ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য দলিল। এই কবিতায় তিনি তুলে ধরেছিলেন স্বৈরাচারী শাসনের নোংরামি, অন্যায়, অত্যাচার।

কিন্তু হাদির শক্তি ছিল অন্য জায়গায়। তিনি বলতেন, "সহজ কথা যায় না বলা সহজে।" তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সাধারণ মানুষের মনের কথা সহজ ভাষায় ফুটিয়ে তোলা। তিনি আম জনতার জন্য সহজ করে কথা বলতে এবং চিন্তা করতে ভালোবাসতেন। যে বিষয় অন্যদের কাছে তুচ্ছ বা মামুলি মনে হতো, হাদি সেই বিষয়কেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। এটাই ছিল তাঁর আউট অফ দ্য বক্স চিন্তা।

হাদি তাঁর জীবনে তিনজন মহান ব্যক্তি দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। প্রথমে ছিলেন কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের কবিতা তাঁর জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা ছিল। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, নজরুলের সাম্যের বাণী, নজরুলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস - এসব হাদিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।

দ্বিতীয়ত ছিলেন জসিমউদ্দীন। হাদি মনে করতেন, জসিমউদ্দীন ছিলেন একজন বড় বিপ্লবী। কারণ তিনি গ্রামীণ শব্দকে সাহিত্যে নাগরিক মর্যাদা দিয়েছেন। যেসব শব্দ মানুষ সাধারণ মনে করত, যেসব ভাষা মানুষ অশিক্ষিত মনে করত, জসিমউদ্দীন সেই ভাষাকে, সেই শব্দকে কবিতায়, সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটাই ছিল তাঁর বিপ্লব।

তৃতীয়ত ছিলেন আল মাহমুদ। আল মাহমুদের লোকজ শব্দের ব্যবহার এবং তাঁর গদ্যশৈলী হাদীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। কীভাবে দেশীয় শব্দ, লোকজ ভাষা ব্যবহার করে শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, সেটা হাদি শিখেছিলেন আল মাহমুদের কাছ থেকে।

হাদি নিজেও লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা। তাঁর "ছোট্ট বোর্ডিং" এবং "বোবার চক্ষু" কবিতা দুটিতে তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের হাহাকার ফুটে উঠেছে। এই কবিতাগুলো পড়লে বোঝা যায় হাদি কতটা সাধারণ মানুষের কাছাকাছি ছিলেন, তাদের দুঃখ-কষ্ট কতটা গভীরভাবে অনুভব করতেন।

# # চিন্তক হাদি: বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন

কিন্তু হাদি শুধু কবিতা লিখতেন না। তিনি চিন্তা করতেন। গভীরভাবে চিন্তা করতেন সমাজ নিয়ে, দেশ নিয়ে, মানুষ নিয়ে। তিনি একটি মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর মতে, এ দেশে একজন নারী পেটের দায়ে শরীর বিক্রি করলে সেই লজ্জা পুরো জাতির।

হাদি বিশ্বাস করতেন, মানুষের ন্যূনতম অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটলে ভালো সমাজ গঠন সম্ভব নয়। একটা সমাজে যতদিন কেউ অনাহারে থাকবে, যতদিন কেউ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না, ততদিন সেই সমাজে ইনসাফ আসবে না। ততদিন সেই সমাজে শান্তি আসবে না।

হাদি বৈষম্য নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার নষ্ট করা দেখলে তীব্র ক্ষোভ অনুভব করতেন। কারণ তিনি জানতেন, ঠিক সেই সময়ে কোনো শিশু হয়তো ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে। এই বৈষম্য, এই অসমতা তাঁর হৃদয়কে রক্তাক্ত করত। তাই তিনি লড়েছেন এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে। লড়েছেন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়তে যেখানে সবাই সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।

হাদির আরেকটি বড় স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য একটি জ্ঞানের আর্কাইভ বা গাইডলাইন তৈরি করা। যেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য, সিনেমা বা থিয়েটার নিয়ে যারা পড়তে চায়, তারা সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তিনি চেয়েছিলেন তরুণদের জন্য এমন একটা প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে যেখানে তারা বিভ্রান্ত না হয়ে, সঠিক পথে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।

হাদি বিশ্বাস করতেন, একজন লেখকের বা চিন্তকের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর মৃত্যুর পর। তিনি মরে যাওয়ার পর মানুষ তাঁকে কীভাবে মনে রাখবে, সেটিই ছিল তাঁর বড় চিন্তা। এবং আজ আমরা দেখছি, হাদির সেই চিন্তা বাস্তব হয়েছে। মৃত্যুর পরে হাদিকে সত্যিই মানুষ মনে রেখেছে। শুধু মনে রাখেনি, হাদিকে হৃদয়ে ধারণ করেছে। হাদির আদর্শকে জীবনের মূলমন্ত্র বানিয়েছে।

হাদি সবাইকে বলতেন, যার যার অবস্থান থেকে ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে শরিক হতে। একজন কবি কবিতা লিখে লড়াই করবে। একজন শিক্ষক শিক্ষা দিয়ে লড়াই করবে। একজন ব্যবসায়ী সৎ ব্যবসা করে লড়াই করবে। একজন রাজনীতিবিদ সৎ রাজনীতি করে লড়াই করবে। প্রত্যেকে তার নিজের জায়গা থেকে ইনসাফের জন্য লড়লে, একদিন ইনসাফের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।

এই ছিল হাদির বহুমুখী প্রতিভা। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, চিন্তক, রাজনীতিবিদ। কিন্তু সবার উপরে তিনি ছিলেন একজন মানুষ। এমন একজন মানুষ যিনি অন্যের কষ্ট অনুভব করতে পারতেন। অন্যের জন্য লড়াই করতে পারতেন। নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে দেশের জন্য সব কিছু দিতে পারতেন।

# # চূড়ান্ত বিপ্লবের স্বপ্ন: হাদির দূরদর্শী পরিকল্পনা

আরজে কিবরিয়ার সাক্ষাৎকারে হাদি তাঁর সবচেয়ে দূরদর্শী চিন্তাভাবনা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব কেবল শুরু ছিল। এটি ছিল প্রথম পদক্ষেপ, কিন্তু আসল লক্ষ্য অনেক দূরে। তিনি বলেছিলেন, সামনে একটি "চূড়ান্ত বিপ্লব" অনিবার্য। এবং সেই বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে এখন থেকেই।

হাদির মতে, সত্যিকারের সার্বভৌম বাংলাদেশ গড়তে হলে আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। এটা শুধু রাজপথের লড়াই নয়। এটা একটা সার্বিক লড়াই। অর্থনৈতিক লড়াই। সাংস্কৃতিক লড়াই। বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই। এবং এই লড়াইয়ে জিততে হলে প্রস্তুত হতে হবে সব দিক থেকে।

হাদি মনে করতেন বিপ্লবের প্রথম ধাপ হলো নিজেকে যোগ্য করে তোলা। তিনি বলতেন, বিশ্বমানের সিনেমা বানাতে হবে। উপন্যাস লিখতে হবে যা বিশ্বসাহিত্যে জায়গা করে নেবে। প্রতিটি সেক্টরে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে হবে। এটাই হবে প্রকৃত বিপ্লব। কারণ যখন একটি জাতি প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে, তখন সেই জাতিকে আর কেউ দমিয়ে রাখতে পারে না।

হাদি তরুণদের ভূমিকাকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। তিনি বলতেন, হাজার হাজার দক্ষ তরুণ যখন প্রতিটি সেক্টরে নেতৃত্ব দেবে, তখনই বিপ্লব সফল হবে। শুধু রাজনীতিতে নয়, ব্যবসায়ে, সাহিত্যে, শিল্পে, প্রযুক্তিতে, প্রতিটি ক্ষেত্রে যোগ্য তরুণদের নেতৃত্ব স্থাপন করতে হবে। তখনই বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের সার্বভৌম।

এই ছিল হাদির বিপ্লবের সংজ্ঞা। এটা শুধু ক্ষমতা পরিবর্তন নয়। এটা মানসিকতার পরিবর্তন। এটা একটা জাতির পুনর্জাগরণ। এটা প্রতিটি ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের মাধ্যমে বিশ্বদরবারে নিজের অবস্থান প্রতিষ্ঠা করা। এবং হাদি বিশ্বাস করতেন যে এই বিপ্লব অনিবার্য। কারণ জুলাই বিপ্লব যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে, সেই আগুন আর নেভানো সম্ভব নয়।

# # শহীদদের উত্তরাধিকার: বিপ্লবের প্রকৃত নেতৃত্ব

হাদি সেই সব ভাই-বোনদের কথা স্মরণ করতেন যারা আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন বা পঙ্গু হয়েছেন। তিনি বলতেন, এই শহীদদের পরিবার এবং আহতরাই হবেন চূড়ান্ত বিপ্লবের প্রকৃত নেতৃত্ব। যারা ভাইয়ের লাশ কাঁধে নিয়ে মিছিল করেছে, যারা দৃষ্টি হারিয়েছে, যারা পঙ্গুত্ব বরণ করেছে - তাদের নেতৃত্বেই ইনশাআল্লাহ চূড়ান্ত বিপ্লব আসবে।

কেন? কারণ তারাই সবচেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছেন। তারাই সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন। তারাই জানেন ইনসাফের দাম কত। তারাই বুঝেন স্বাধীনতার মূল্য কী। তাদের চোখে আছে সেই আগুন যা কখনো নেভে না। তাদের হৃদয়ে আছে সেই সংকল্প যা কখনো দুর্বল হয় না।

হাদি বিপ্লবের এই পথে কোনোভাবেই আপস না করার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন। তিনি বলতেন, যত বাধাই আসুক, যত চাপই আসুক, ইনসাফের প্রশ্নে কোনো আপস হবে না। কারণ আপস করা মানে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করা। আপস করা মানে আহতদের ত্যাগকে অসম্মান করা। আপস করা মানে আগামী প্রজন্মের সাথে প্রতারণা করা।

আর সত্যি বলতে, যারা ভাই হারিয়েছে তাদের চোখের যে জল, যারা সন্তান হারিয়েছে সেই মায়েদের বুকের যে হাহাকার, যারা পঙ্গু হয়েছে তাদের দেহের যে যন্ত্রণা - এসবই হবে চূড়ান্ত বিপ্লবের জ্বালানি। এই ব্যথা, এই কষ্ট, এই ত্যাগ - এসব মিলেই তৈরি হবে সেই শক্তি যা কোনো আধিপত্যবাদ ঠেকাতে পারবে না।

# # সেনাবাহিনী ও জাতীয় প্রতিষ্ঠান: হাদির সরাসরি সমালোচনা

হাদি সেনাবাহিনীর ভেতরে লুকিয়ে থাকা দুর্নীতির বিরুদ্ধে খুবই সোচ্চার ছিলেন। তিনি বলতেন, পিলখানা হত্যাকাণ্ড এবং গুমের সুস্পষ্ট তদন্ত হলে অনেক সেনা কর্মকর্তা ফেঁসে যাবেন। এবং সেই তদন্ত হওয়া উচিত। কারণ ন্যায়বিচার ছাড়া কোনো প্রতিষ্ঠানই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হতে পারে না।

তবে হাদি একটা বিষয় খুব স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, তাঁর ক্ষোভ পুরো সেনাবাহিনীর ওপর নয়। তাঁর ক্ষোভ সেই কিছু ব্যক্তির ওপর যারা আধিপত্যবাদের দোসর হিসেবে কাজ করে। যারা দেশের স্বার্থের চেয়ে নিজের স্বার্থকে বড় মনে করে। যারা জনগণের সেবক না হয়ে জনগণের ওপর প্রভু সেজে বসে।

হাদি একটা সতর্কবাণীও দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, যদি কেউ আবার ওয়ান-ইলেভেনের মতো পরিস্থিতি তৈরির চেষ্টা করে, তবে জনতা তা রুখে দেবে। কারণ ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর জনগণ জেগে গেছে। তারা এখন আর চুপ করে থাকবে না। তারা এখন বুঝে গেছে তাদের শক্তি কত বড়। এবং সেই শক্তি তারা ব্যবহার করতে জানে।

হাদির এই সতর্কবাণী ছিল একটা বার্তা। একটা স্পষ্ট বার্তা যে জনগণ এখন আর আগের মতো নেই। তারা এখন সচেতন। তারা এখন সংগঠিত। তারা এখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এবং তারা যদি আবার দেখে যে কেউ তাদের বিপ্লব কেড়ে নিতে চাইছে, তাহলে তারা আবার রাজপথে নামবে। এবং এবার তারা থামবে না যতক্ষণ না পুরোপুরি বিজয় অর্জন করে।

# # আধিপত্যবাদের মূল: হাদির বিশ্লেষণ

হাদি বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের মূলে ভারতীয় আধিপত্যবাদকে দায়ী করতেন। তবে তিনি এটাও বলতেন যে এই আধিপত্যবাদ একদিনে তৈরি হয়নি। অতীতের শাসকগোষ্ঠীর কর্মকাণ্ডই এই ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছে। দশকের পর দশক ধরে যে দুর্নীতি হয়েছে, যে আপস করা হয়েছে, যে স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়া হয়েছে - তারই ফল আমরা আজ ভোগ করছি।

হাদির মতে, ফ্যাসিবাদের এই কাঠামো একদিনে তৈরি হয়নি। এটা তৈরি হয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে। প্রতিটি আপস, প্রতিটি সমঝোতা, প্রতিটি দুর্নীতি - এসব মিলে তৈরি হয়েছে এই দানব। এবং এই দানবকে পরাজিত করতে হলে শুধু একটা সরকার পরিবর্তন করলে হবে না। পুরো সিস্টেমটাকেই বদলাতে হবে।

কিন্তু হাদির একটা মানবিক দিক ছিল যা অনেকেই হয়তো বুঝতে পারেনি। তিনি আওয়ামী লীগের গণহত্যার সমর্থকদেরও সামাজিক ও রাজনৈতিক স্পেস দেওয়ার কথা বলতেন, যদি তারা ভুল স্বীকার করে ফিরে আসে। এটা ছিল তাঁর উদারতা। তাঁর ক্ষমাশীলতা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে মানুষ ভুল করতে পারে। কিন্তু মানুষ সংশোধনও হতে পারে।

তবে এই ক্ষমা শুধুমাত্র তাদের জন্য যারা সত্যিকার অর্থে অনুতপ্ত। যারা নিজেদের ভুল স্বীকার করে নতুন করে শুরু করতে চায়। যারা বুঝে গেছে যে তারা যা করেছিল তা ভুল ছিল। কিন্তু যারা এখনো অবিচলভাবে গণহত্যাকে সমর্থন করে, যারা এখনো ফ্যাসিবাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে - তাদের জন্য কোনো জায়গা নেই ইনসাফের বাংলাদেশে।

হাদি বিশ্বাস করতেন যে প্রকৃত বিপ্লব হলো সেই বিপ্লব যা মানুষের মন পরিবর্তন করে। যা মানুষকে সংশোধনের সুযোগ দেয়। কিন্তু একই সাথে যে বিপ্লব কঠোর হাতে অপরাধীদের বিচার করে। এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রাখাই হলো প্রকৃত ন্যায়বিচার।

# # হাজার বছরের প্রভাব: জীবনের মূল্য বনাম অর্থ

হাদি বলেছিলেন এমন একটা কথা যা তাঁর চিন্তার গভীরতা প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন, "আমি জন্ম নেয়ার পর যদি পঞ্চাশ বছর, ৬০ বছর, ১০০ বছর বেঁচে থাকি, এবং আমার দ্বারা কোন দেশের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে ইমপ্যাক্ট সৃষ্টি না হয়, তাহলে কি লাভ হবে? অন্তত আমাকে শহীদ করে দেয়ার পরে যদি এমন একটা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয় যা আগামী ১০০০ বছর পর্যন্ত ইনশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে, লক্ষ কোটি কোটি মানুষ দুহাত তুলে আপনার জন্য দোয়া করবে।"

হাদি প্রায়ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদাহরণ দিতেন। তিনি বলতেন, "দেখো জিয়া কত অল্প সময় ছিলেন, কিন্তু তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে এমন জায়গা করে নিয়েছেন যে আজও মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর জন্য দোয়া করে।" হাদিও চেয়েছিলেন তেমনি একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে। স্বল্প সময়ে হলেও, এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা বংশ পরম্পরায় মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে।

এই কথাটা শুনে তোরা বুঝতে পারো হাদি কীভাবে ভাবতেন? হাদি ভাবতেন না নিজের জীবনের দৈর্ঘ্য নিয়ে। হাদি ভাবতেন জীবনের গভীরতা নিয়ে, প্রভাব নিয়ে, অর্থ নিয়ে। একশো বছর বেঁচে থেকে কোনো পরিবর্তন না আনতে পারার চেয়ে, তিনি বরং চেয়েছিলেন এমন একটা আত্মত্যাগ করতে যা হাজার বছর ধরে মানুষকে অনুপ্রাণিত করবে।

আর ঠিক তাই হচ্ছে। হাদি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর প্রভাব শুরু হয়েছে। তাঁর শাহাদাত যে ইমপ্যাক্ট তৈরি করেছে, সেটা শুধু আজকের জন্য না। সেটা আগামী প্রজন্মের জন্য। সেটা আগামী শত বছরের জন্য। সেটা আগামী হাজার বছরের জন্য।

হাদির এই চিন্তা দেখায় যে তিনি শুধু একজন রাজনীতিবিদ ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন দার্শনিক। তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী। তিনি ছিলেন এমন একজন মানুষ যিনি বুঝতেন যে জীবনের মূল্য তার দৈর্ঘ্যে নয়, তার প্রভাবে। একদিনের জীবন যদি লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করে, সেটা হাজার বছরের নিষ্ক্রিয় জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান।

আর দেখো না, হাদির এই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হচ্ছে। আজ লক্ষ লক্ষ মানুষ হাদির জন্য দোয়া করছে। কোটি কোটি মানুষ হাদির আদর্শে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। সারা দেশে তরুণরা এগিয়ে আসছে ইনসাফের জন্য লড়তে। হাদির শাহাদাত যে ইমপ্যাক্ট তৈরি করেছে, সেটা কয়েক দিনের না। সেটা কয়েক বছরের না। সেটা প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য।

তোরা যারা হাদির পথে চলছো, তোরা যারা ইনসাফের জন্য লড়ছো, তোরা ভেবে দেখো। হাদি ১০০ বছর বেঁচে থেকে নিজের পরিবারের জন্য সম্পদ জমা করতে পারতেন। নিজের সন্তানদের জন্য বিশাল ব্যবসা গড়তে পারতেন। নিজের জন্য আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু হাদি সেই পথ বেছে নেননি।

হাদি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছোট হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রভাব হবে বিশাল। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর সন্তান হয়তো পিতৃহীন হবে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ সন্তান পাবে অনুপ্রেরণা। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর পরিবার হয়তো কষ্ট পাবে, কিন্তু কোটি কোটি পরিবার পাবে মুক্তি।

এটাই তো হাদির মহত্ত্ব। এটাই তো হাদির দূরদর্শিতা। এটাই তো হাদির আত্মত্যাগ। তিনি নিজের স্বল্পমেয়াদী স্বার্থকে বিসর্জন দিয়েছিলেন দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় স্বার্থের জন্য। তিনি নিজের ব্যক্তিগত সুখকে বিসর্জন দিয়েছিলেন লক্ষ লক্ষ মানুষের সুখের জন্য।

আর এখন তোদের পালা। তোরা হাদির এই দর্শন নিয়ে এগিয়ে চলো। তোরা শুধু আজকের কথা ভেবো না, ভাবো আগামী ১০০ বছরের কথা। তোরা শুধু নিজের লাভ-ক্ষতির কথা ভেবো না, ভাবো পুরো জাতির কল্যাণের কথা। তোরা শুধু জীবনের দৈর্ঘ্যের কথা ভেবো না, ভাবো জীবনের প্রভাবের কথা।

হাদি বলে গেছেন যে তাঁর আত্মত্যাগের প্রভাব ১০০০ বছর পর্যন্ত থাকবে। আর এটা নির্ভর করছে তোদের উপর। যদি তোরা হাদির পথে চলো, হাদির আদর্শ ধরে রাখো, হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন করো, তাহলে সত্যিই হাদির প্রভাব হাজার বছর ধরে চলবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম হাদিকে মনে রাখবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ইনসাফের বাংলাদেশ টিকে থাকবে।

কিন্তু যদি তোরা থেমে যাও, যদি হাদির আত্মত্যাগকে বৃথা যেতে দাও, তাহলে হাদির সেই ১০০০ বছরের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যাবে। তাই তোদের দায়িত্ব শুধু আজকের জন্য না। তোদের দায়িত্ব আগামী হাজার বছরের জন্য।

# # মায়ের কাছে স্বপ্নের কথা: শাহাদাতের প্রার্থনা

হাদি তাঁর মাকে বলেছিলেন এমন একটা কথা যা তাঁর চরিত্রের গভীরতা প্রকাশ করে। তিনি বলেছিলেন, "মা, যারা রাজনীতি করে দেশের জন্য, তাদের ঘরে মৃত্যু হওয়া সেটা ভালো কিছু নয়। তাদের তো রাস্তায়, আন্দোলনে মৃত্যু হতে হয়। তাদের শহীদ হতে হয়।"

একজন মা তাঁর সন্তানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কী অনুভব করেন? একজন মা যিনি চান তাঁর সন্তান নিরাপদে বাসায় থাকুক, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকুক, তাঁর সন্তান বলছে রাস্তায় শহীদ হওয়াই তাঁর কাম্য। কিন্তু হাদির মা বুঝতেন। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান সাধারণ কোনো মানুষ নয়। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান একটা উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মেছে।

হাদি তাঁর মাকে আরও বলেছিলেন, "আমি স্বপ্ন দেখি, প্রার্থনা করি - একটা বিশাল আন্দোলনের মিছিল, সকলের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, দুহাত উঁচু করে, দেশের স্বার্থে, ইনসাফ বাস্তবায়নে। ওখানে আমি গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ইনসাফের হাসি হেসে, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে, শহীদ হয়ে চলে যাচ্ছি। এটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।"

হাদি আরও বলতেন, "কেউ শহীদ হলে পরে, কিছু ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে যাবে। তখন আর অবস থাকবে না কেউ।" তিনি জানতেন যে তাঁর জীবদ্দশায় সবাই তাঁকে বুঝবে না। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের পরে, শয়তান ছাড়া সবাই বুঝে যাবে হাদি কে ছিলেন, তিনি কী চেয়েছিলেন, কেন তিনি লড়েছিলেন।

এই ছিল হাদির স্বপ্ন। এই ছিল হাদির প্রার্থনা। তিনি প্রার্থনা করতেন শহীদ হওয়ার জন্য। প্রার্থনা করতেন ইনসাফের পথে মৃত্যুবরণ করার জন্য। প্রার্থনা করতেন সবার সামনে, মিছিলে, দুহাত তুলে, হাসিমুখে শাহাদাত লাভ করার জন্য।

আর দেখো না, হাদির সেই স্বপ্ন, সেই প্রার্থনা কীভাবে বাস্তবায়িত হলো। ১২ ডিসেম্বর, আন্দোলনে, মিছিলে, ইনসাফের জন্য লড়তে লড়তে, তিনি গুলিবিদ্ধ হলেন। তাঁর স্বপ্ন পূর্ণ হলো। তাঁর প্রার্থনা কবুল হলো। তিনি শহীদ হলেন ঠিক যেভাবে তিনি চেয়েছিলেন। আর সত্যিই, ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে গেছে হাদি কে ছিলেন। আজ পুরো বাংলাদেশ বুঝেছে, পুরো জাতি জেগে উঠেছে।

কিন্তু এখানেই শেষ নয়। হাদির আরেকটি দিক ছিল যা তাঁকে আরও মানবিক করে তোলে।

# # পিতার হৃদয়: শিশুর জন্য শেষ আবেদন

সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, চোখের পানি সামলাতে না পেরে, কান্না কান্না কণ্ঠে, "আমার যদি কিছু হয়, আমার ছোট্ট শিশুটাকে তোরা দেখে রাখিস।" হাদি চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না। তিনি কাঁদছিলেন। কেন? কারণ তিনি জানতেন তাঁর শিশুকে হয়তো তিনি বড় হতে দেখতে পারবেন না।

হাদি আরও বলেছিলেন, অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে, "মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয়। আমার তিন মাসের একটি বাচ্চা আছে। তাকে ৩০ মিনিট কোলে নিতে পারি নাই। সম্প্রতি আমার এক বড় ভাই জোর করে বাচ্চাকে কিছু উপহার দিয়েছে।" একজন পিতা তাঁর সন্তানকে ৩০ মিনিটও কোলে নিতে পারেননি। কারণ তাঁর কাছে সময় ছিল না। সময় ছিল শুধু দেশের জন্য, ইনসাফের জন্য, ১৮ কোটি মানুষের জন্য।

হাদি বলেছিলেন, "আমার খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল - আল্লাহ যদি আমাকে নিয়ে যায়, বাচ্চাটার দিকে খেয়াল রাখবেন। তবে কথাটা বলতে পারি নাই।" কেন বলতে পারেননি? কারণ এই কথা বলা মানে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা। এই কথা বলা মানে স্বীকার করা যে তিনি ভয় পাচ্ছেন তাঁর শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে। এই কথা বলা মানে দেখানো যে তিনিও একজন সাধারণ পিতা যিনি তাঁর সন্তানকে ভালোবাসেন, তাঁর জন্য চিন্তিত।

এখানেই হাদির মহত্ত্ব। তিনি জানতেন তাঁর শিশু পিতৃহীন হবে। তিনি জানতেন তাঁর স্ত্রী বিধবা হবে। তিনি জানতেন তাঁর মা সন্তানহারা হবে। কিন্তু তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন যে তাঁর একটি শিশুর পিতৃহীন হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ শিশু পাবে একটি ভালো দেশ। তাঁর একটি স্ত্রীর বিধবা হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ পরিবার পাবে শান্তি। তাঁর একটি মায়ের সন্তানহারা হওয়ার বিনিময়ে, কোটি কোটি মা পাবে নিরাপত্তা।

এই দ্বন্দ্ব তোরা কল্পনা করতে পারো? একদিকে একজন পিতা হিসেবে সন্তানের জন্য ভালোবাসা, অন্যদিকে একজন নেতা হিসেবে দেশের জন্য দায়িত্ব। একদিকে নিজের পরিবারের জন্য চিন্তা, অন্যদিকে ১৮ কোটি মানুষের পরিবারের জন্য চিন্তা। একদিকে নিজের শিশুকে বাঁচানোর ইচ্ছা, অন্যদিকে সবার শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার দায়িত্ব।

আর হাদি বেছে নিলেন বৃহত্তর স্বার্থকে। তিনি বেছে নিলেন দেশকে। তিনি বেছে নিলেন ইনসাফকে। তিনি বেছে নিলেন ১৮ কোটি মানুষকে। এবং এভাবেই চলে গেলেন হাদি। চোখের পানি ফেলে, হৃদয় ভারাক্রান্ত করে, কিন্তু মাথা উঁচু করে। নিজের শিশুকে পেছনে রেখে, কিন্তু সবার শিশুদের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করার স্বপ্ন বুকে নিয়ে।

হাদির সেই শিশুটি আজ পিতৃহীন। আজ সেই শিশুর বয়স আট মাস, কিন্তু পিতার স্মৃতি কতটুকু থাকবে? হাদির সেই স্ত্রী আজ বিধবা। হাদির সেই মা আজ সন্তানহারা। কিন্তু হাদির সেই আত্মত্যাগ আজ লক্ষ লক্ষ মানুষকে অনুপ্রাণিত করছে। হাদির সেই শাহাদাত আজ কোটি কোটি মানুষকে সাহস দিচ্ছে। হাদির সেই স্বপ্ন আজ ১৮ কোটি মানুষের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে।

আর হাদি যে শেষ কথা বলেছিলেন, "আমার শিশুটিকে তোরা দেখে রাখিস" - সেই কথা আজ পুরো বাংলাদেশ শুনেছে। আর পুরো বাংলাদেশ আজ সেই শিশুটিকে দেখছে। শুধু সেই শিশুটিকে না, প্রতিটি শিশুকে যারা পিতৃহীন হয়েছে ইনসাফের লড়াইয়ে। প্রতিটি পরিবারকে যারা কষ্ট পেয়েছে সত্যের পথে। প্রতিটি মাকে যারা সন্তানহারা হয়েছে ন্যায়বিচারের জন্য।

# # হাদির শেষ দাবি: বিচারের অঙ্গীকার

হাদি একটাই দাবি করেছিলেন। একটাই আবেদন রেখে গেছেন। বলেছিলেন, "আমাকে যদি কেউ মেরে ফেলে, কোন দুঃখ থাকবে না। কিন্তু এই হত্যার যাতে বিচার হয়।" এটা শুধু হাদির ব্যক্তিগত আবেদন ছিল না। এটা ছিল ভবিষ্যতের সব হাদীদের জন্য নিরাপত্তার আবেদন। এটা ছিল ইনসাফের বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের আবেদন।

হাদি জানতেন যদি তাঁর হত্যার বিচার না হয়, তাহলে এই দেশে আর কোনো হাদি জন্ম নিতে সাহস পাবে না। কোনো তরুণ এগিয়ে আসবে না ইনসাফের জন্য লড়তে। কোনো মা তার সন্তানকে দেশের জন্য কাজ করতে উৎসাহ দেবে না। কোনো বাবা তার ছেলেকে রাজনীতিতে আসতে বলবে না। কারণ তারা জানবে, এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়লে মৃত্যু আছে, কিন্তু বিচার নেই।

যদি এ হত্যার বিচার না হয়, তাহলে হাদীরা জন্ম নিবে না। আর হাদীরা যদি জন্ম না নেয়, তাহলে ইনসাফের বাংলাদেশ কখনো বাস্তবায়ন হবে না। এটা শুধু একটা হত্যার বিচার না, এটা একটা জাতির ভবিষ্যতের বিচার। এটা শুধু একজন হাদির ন্যায়বিচার না, এটা ১৮ কোটি মানুষের ন্যায়বিচার।

হাদির হত্যার বিচার হতে হবে। কারণ এই বিচার না হলে, ভবিষ্যতে আর কোনো সৎ মানুষ রাজনীতিতে আসবে না। আর কোনো আদর্শবাদী তরুণ দেশের জন্য কাজ করতে চাইবে না। আর কোনো নিঃস্বার্থ মানুষ জনগণের সেবা করতে এগিয়ে আসবে না। কারণ তারা জানবে, এখানে ভালো কাজের শাস্তি মৃত্যু, আর খারাপ কাজের পুরস্কার ক্ষমতা।

তাই হাদির শেষ দাবিটা শুধু তাঁর নিজের জন্য না। এটা তোদের জন্য। এটা আগামী প্রজন্মের জন্য। এটা ইনসাফের বাংলাদেশের জন্য। যদি হাদির হত্যার বিচার হয়, তাহলে দেশের প্রতিটি মা জানবে তার সন্তান নিরাপদ থাকবে যদি সে সৎ পথে চলে। প্রতিটি তরুণ জানবে সে নিরাপদ থাকবে যদি সে ইনসাফের জন্য লড়ে। প্রতিটি নাগরিক জানবে এই দেশে আইনের শাসন আছে, জবরদস

Address


Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Rasel Munshi posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

  • Want your business to be the top-listed Media Company?

Share