27/12/2025
# ইনসাফের হাদি: একটি অসমাপ্ত বিপ্লবের গল্প
# # প্রস্তাবনা: যে মানুষটি স্বপ্ন দেখতেন
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর। পবিত্র জুম্মার দিন। হাদি জুম্মার নামাজ পড়ে বের হয়েছেন। একটি অটোরিক্সায় করে যাচ্ছেন। তাঁর মনে একটাই প্রতিজ্ঞা - ইনসাফের বাংলাদেশ গড়তে হবে। আজও রাজপথে যাবেন। আজও মানুষের কাছে যাবেন। আজও ইনসাফের ডাক দেবেন।
হঠাৎ পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এগিয়ে আসে। গুলির শব্দ। একটি বুলেট এসে বিদ্ধ করে হাদির মাথায়। কাপুরুষের মতো পেছন থেকে গুলি। কারণ সামনে থেকে গুলি করার সাহস ছিল না তাদের। হাদির চোখে চোখ রেখে গুলি করার সাহস ছিল না।
পবিত্র জুম্মার দিনে, নামাজের পরে, এভাবে একজন নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করা হলো। কিন্তু হত্যাকারীরা জানত না, তারা শুধু একজন মানুষকে হত্যা করেনি। তারা জন্ম দিয়েছে লক্ষ লক্ষ হাদির। তারা সৃষ্টি করেছে এক অমর কিংবদন্তির।
হাদি যে স্বপ্ন দেখেছিলেন - মিছিলে, সবার সামনে, ইনসাফের জন্য লড়তে লড়তে শহীদ হওয়ার - সেই স্বপ্ন হুবহু সেভাবে পূর্ণ না হলেও, তিনি শহীদ হলেন ইনসাফের পথে। পবিত্র জুম্মার দিনে। আল্লাহর ঘর থেকে ফেরার পথে। এবং এই শাহাদাত হয়ে উঠলো আরও বেশি পবিত্র, আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
ছয় দিন পর, ১৮ ডিসেম্বর, সিঙ্গাপুরের হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর শেষ নিঃশ্বাস ছিল একটি নতুন বাংলাদেশের প্রথম শ্বাস। তাঁর মৃত্যু ছিল একটি আন্দোলনের জন্ম। তাঁর শাহাদাত ছিল লক্ষ লক্ষ হাদির জাগরণ।
এই হলো হাদির গল্প। এক অসমাপ্ত বিপ্লবের গল্প। এক ইনসাফের স্বপ্নের গল্প। এক মানুষের গল্প যিনি নিজের জীবন দিয়ে দেখিয়ে গেলেন কীভাবে দেশকে ভালোবাসতে হয়।
# # অধ্যায় ১: কবির জন্ম, বিপ্লবীর উত্থান
শরীফ ওসমান বিন হাদী। এই ছিল তাঁর পুরো নাম। কিন্তু সবার সুবিধার জন্য তিনি নাম ছোট করেছিলেন - ওসমান হাদি। নামের পেছনে ছিল একটা দর্শন। তিনি চাইতেন সহজ হতে। সাধারণ মানুষের কাছাকাছি হতে। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন, "সহজ কথা যায় না বলা সহজে।"
কিন্তু হাদি শুধু একটা নাম ছিল না। ফ্যাসিবাদী শাসনামলে, যখন কথা বলা মানে মৃত্যু, তখন হাদির ছিল আরেকটা পরিচয় - "সীমান্ত শরীফ"। এই ছদ্মনামে তিনি লিখতেন। লিখতেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে। লিখতেন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে। লিখতেন ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে।
তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত কবিতা "রজস্রাবের রাষ্ট্র"। এই কবিতায় তিনি তুলে ধরেছিলেন ফ্যাসিবাদী শাসনের নোংরামি, অন্যায়, অত্যাচার। এই কবিতা হয়ে উঠেছিল ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অনন্য দলিল। মানুষ পড়ত। মানুষ ছড়িয়ে দিত। মানুষ সাহস পেত।
হাদি ছিলেন একজন কবি। কিন্তু তিনি ছিলেন সাধারণ কবি নন। তিনি ছিলেন এমন এক কবি যিনি বিশ্বাস করতেন কবিতা শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং পরিবর্তনের জন্য। তিনি ছিলেন এমন এক লেখক যিনি জানতেন লেখা একটা অস্ত্র। আর তিনি সেই অস্ত্র ব্যবহার করতেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
হাদির অনুপ্রেরণা ছিলেন তিনজন মহান ব্যক্তি। প্রথমে কাজী নজরুল ইসলাম। ছোটবেলা থেকেই নজরুলের কবিতা হাদির হৃদয়ে গেঁথে ছিল। নজরুলের বিদ্রোহী সত্তা, নজরুলের সাম্যের বাণী, নজরুলের অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস - এসব হাদিকে শিখিয়েছিল কীভাবে লড়তে হয়।
দ্বিতীয়ত জসিমউদ্দীন। হাদি মনে করতেন, জসিমউদ্দীন ছিলেন একজন বড় বিপ্লবী। কেন? কারণ তিনি গ্রামীণ শব্দকে সাহিত্যে নাগরিক মর্যাদা দিয়েছেন। যে ভাষা মানুষ সাধারণ মনে করত, সেই ভাষাকে তিনি কবিতায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। এটাই ছিল তাঁর বিপ্লব। এবং হাদি সেই বিপ্লব থেকে শিখেছিলেন - সাধারণ মানুষের ভাষাই সবচেয়ে শক্তিশালী ভাষা।
তৃতীয়ত আল মাহমুদ। তাঁর লোকজ শব্দের ব্যবহার এবং গদ্যশৈলী হাদীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। কীভাবে দেশীয় শব্দ দিয়ে শক্তিশালী সাহিত্য সৃষ্টি করা যায়, সেটা হাদি শিখেছিলেন আল মাহমুদের কাছ থেকে।
হাদি নিজেও লিখেছেন অসাধারণ সব কবিতা। তাঁর "ছোট্ট বোর্ডিং" এবং "বোবার চক্ষু" কবিতা দুটিতে তাঁর শৈশবের স্মৃতি এবং বাজারের মুদ্রাস্ফীতির ফলে সাধারণ মানুষের হাহাকার ফুটে উঠেছে। পড়লে মনে হয় যেন হাদি নিজে একজন সাধারণ মানুষ, যিনি প্রতিদিন বাজারে যান, প্রতিদিন দাম বাড়তে দেখেন, প্রতিদিন কষ্ট পান।
এটাই ছিল হাদির শক্তি। তিনি সাধারণ মানুষের মনের কথা বলতে পারতেন। যে বিষয় অন্যদের কাছে তুচ্ছ মনে হতো, হাদি সেই বিষয়কেও গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। এটাই ছিল তাঁর "আউট অফ দ্য বক্স" চিন্তা।
# # অধ্যায় ২: জুলাই বিপ্লব - এক নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন
২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশে এক অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। কোটা সংস্কার আন্দোলন নামে শুরু হলেও এটি দ্রুত পরিণত হয় একটি গণঅভ্যুত্থানে। হাজারো তরুণ রাজপথে নেমে আসে। তাদের দাবি - ইনসাফ। তাদের স্বপ্ন - নতুন বাংলাদেশ।
এই আন্দোলনে হাদি ছিলেন একজন অগ্রসেনানী। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন "ইনকিলাব মঞ্চ"। এই মঞ্চের মুখপাত্র হিসেবে তিনি হয়ে ওঠেন লক্ষ লক্ষ তরুণের কণ্ঠস্বর। তাঁর প্রতিটি বক্তব্য মানুষের হৃদয় স্পর্শ করত। তাঁর প্রতিটি কথা মানুষকে সাহস দিত।
জুলাই বিপ্লবের পর হাদি চেয়েছিলেন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি নতুন "রোল মডেল" তৈরি করতে। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতি কেবল ক্ষমতার লড়াই নয়, বরং মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার মাধ্যম হওয়া উচিত।
শুরুতে তিনি নিঃসঙ্গ ছিলেন। একা ছিলেন। কিন্তু মানুষের ভালোবাসায় তাঁর এই যাত্রা এক বিশাল আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। তিনি প্রতিদিন মাইলের পর মাইল হাঁটতেন। ফজরের নামাজ থেকে শুরু করে রাত দশটা পর্যন্ত তিনি যেতেন প্রতিটি মসজিদে, প্রতিটি স্কুলে, প্রতিটি অলিতে-গলিতে। দরজায় দরজায় মানুষের সাথে কথা বলতেন। তাদের সুখ-দুঃখ শুনতেন। তাদের স্বপ্ন জানতেন।
এভাবেই হাদি জিতেছিলেন মানুষের হৃদয়। টাকা দিয়ে নয়, ভালোবাসা দিয়ে। ঘুষ দিয়ে নয়, সততা দিয়ে। ক্ষমতা দিয়ে নয়, সেবা দিয়ে।
হাদি দেখিয়েছিলেন এক নতুন রাজনীতি। আগে রাজনীতি ছিল টাকা আর ঘুষের খেলা। রাজনীতিবিদরা জনগণকে টাকা দিয়ে ভোট কিনতেন। কিন্তু হাদির রাজনীতি ছিল উল্টো। জনগণ নিজেরাই হাদিকে টাকা দিত। তাঁকে সাহস জোগাত। তাঁকে বলত, "তুমি ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ে তোলো, টাকার চিন্তা করো না। আমরা আছি।"
এটাই ছিল টাকার রাজনীতি বনাম ভালোবাসার রাজনীতি। এবং হাদি প্রমাণ করেছিলেন যে ভালোবাসার রাজনীতিই প্রকৃত রাজনীতি।
# # অধ্যায় ৩: ঢাকা-৮ - চাঁদাবাজমুক্ত বাংলাদেশের প্রতীক
হাদি যখন ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন তিনি একটি সাহসী ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, "ঢাকা-৮ আসনে কোনো সবজি বিক্রেতা বা সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কেউ চাঁদা তুলতে পারবে না।"
এটা শুধু একটা প্রতিশ্রুতি ছিল না। এটা ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। চাঁদাবাজদের প্রতি চ্যালেঞ্জ। দুর্নীতিবাজদের প্রতি চ্যালেঞ্জ। পুরনো রাজনীতির প্রতি চ্যালেঞ্জ।
হাদি আরও বলেছিলেন, তিনি যদি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন, তাহলে "সংসদে দাঁড়িয়ে বিসমিল্লাহ বলে প্রতিটি চাঁদাবাজের নাম প্রকাশ করে দেবেন।" কজন রাজনীতিবিদের এই সাহস আছে? কজন নেতা সংসদে দাঁড়িয়ে চাঁদাবাজদের নাম ধরে ধরে প্রকাশ করার সাহস রাখেন?
কিন্তু হাদি শুধু কথা বলতেন না। তিনি কাজও করতেন। তিনি মানুষকে বলেছিলেন, "যদি কেউ তোমাদের কাছ থেকে চাঁদা তোলার চেষ্টা করে, তাহলে তার নাম আমাকে জানাও। আমি তাকে সামলাবো।"
এটাই ছিল হাদির সাহস। এটাই ছিল হাদির নেতৃত্ব। তিনি শুধু প্রতিশ্রুতি দিতেন না। তিনি সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে প্রস্তুত থাকতেন। তিনি জানতেন এতে তাঁর জীবন বিপন্ন হতে পারে। কিন্তু তাতে তাঁর কিছু যায় আসত না। কারণ তাঁর কাছে দেশ ছিল সবার উপরে।
# # অধ্যায় ৪: পরিবার যেখানে ১৮ কোটি মানুষ
হাদির কাছে "দেশ" মানেই ছিল "পরিবার"। তিনি বলতেন, "দেশটাকে যদি আমার নিজের পরিবার মনে করি, তাহলে অবশ্যই পরিবারের কেউ ক্ষতি চাইবে না।"
এটা শুধু কথা ছিল না। এটা ছিল তাঁর জীবনের দর্শন। হাদি নিজের সন্তানের জন্য আলাদা কিছু ভাবেননি। নিজের স্ত্রীর জন্য, ভাই বোনের জন্য, বাবা-মায়ের জন্য আলাদা কিছু ভাবেননি। তিনি ভেবেছেন, "দেশের ১৮ কোটি মানুষ যদি শান্তি পায়, সে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে আমার সন্তান, আমার স্ত্রী, আমার বাবা-মা, পরিবারের সবাই।"
কিন্তু এই দর্শনের মূল্য ছিল ভয়াবহ। হাদির তিন মাস বয়সী একটি সন্তান ছিল। তিনি সেই সন্তানকে মাত্র ৩০ মিনিটও কোলে নিতে পারেননি। কারণ তাঁর কাছে সময় ছিল না। সময় ছিল শুধু দেশের জন্য, ইনসাফের জন্য, ১৮ কোটি মানুষের জন্য।
একবার এক সাক্ষাৎকারে হাদি বলেছিলেন, চোখের পানি সামলাতে না পেরে, "মাঝেমধ্যে মন খারাপ হয়। আমার তিন মাসের একটি বাচ্চা আছে। তাকে ৩০ মিনিট কোলে নিতে পারি নাই।"
এই কথা বলার সময় হাদির চোখে পানি চলে এসেছিল। কণ্ঠ ভারী হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর সংকল্পে কোনো দুর্বলতা ছিল না। তিনি জানতেন কী করছেন। তিনি জানতেন কেন করছেন।
হাদি বলতেন, "আমার খুব বলতে ইচ্ছে করেছিল - আল্লাহ যদি আমাকে নিয়ে যায়, বাচ্চাটার দিকে খেয়াল রাখবেন। তবে কথাটা বলতে পারি নাই।" কেন বলতে পারেননি? কারণ এই কথা বলা মানে নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করা। আর হাদি চাইতেন না মানুষ তাঁর দুর্বলতা দেখুক। তিনি চাইতেন মানুষ তাঁর শক্তি দেখুক।
এখানেই হাদির মহত্ত্ব। তিনি জানতেন তাঁর শিশু পিতৃহীন হবে। তাঁর স্ত্রী বিধবা হবে। তাঁর মা সন্তানহারা হবে। কিন্তু তবুও তিনি থামেননি। কারণ তিনি জানতেন, তাঁর একটি শিশুর পিতৃহীন হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ শিশু পাবে একটি ভালো দেশ। তাঁর একটি স্ত্রীর বিধবা হওয়ার বিনিময়ে, লক্ষ লক্ষ পরিবার পাবে শান্তি।
# # অধ্যায় ৫: হাজার বছরের প্রভাব - জীবনের মূল্য বনাম দৈর্ঘ্য
হাদির চিন্তাধারা ছিল অসাধারণ গভীর। তিনি একবার বলেছিলেন এমন একটা কথা যা তাঁর দর্শনের সারমর্ম প্রকাশ করে।
তিনি বলেছিলেন, "আমি জন্ম নেয়ার পর যদি পঞ্চাশ বছর, ৬০ বছর, ১০০ বছর বেঁচে থাকি, এবং আমার দ্বারা কোন দেশের কল্যাণে, জনগণের কল্যাণে ইমপ্যাক্ট সৃষ্টি না হয়, তাহলে কি লাভ হবে? অন্তত আমাকে শহীদ করে দেয়ার পরে যদি এমন একটা ইমপ্যাক্ট তৈরি হয় যা আগামী ১০০০ বছর পর্যন্ত ইনশাল্লাহ বাস্তবায়িত হবে, লক্ষ কোটি কোটি মানুষ দুহাত তুলে আমার জন্য দোয়া করবে।"
এই কথার মধ্যে লুকিয়ে ছিল হাদির সম্পূর্ণ দর্শন। তিনি ভাবতেন না নিজের জীবনের দৈর্ঘ্য নিয়ে। তিনি ভাবতেন জীবনের গভীরতা নিয়ে, প্রভাব নিয়ে, অর্থ নিয়ে।
হাদি প্রায়ই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উদাহরণ দিতেন। তিনি বলতেন, "দেখো জিয়া কত অল্প সময় ছিলেন, কিন্তু তিনি কোটি মানুষের হৃদয়ে এমন জায়গা করে নিয়েছেন যে আজও মানুষ তাঁকে ভালোবাসে, তাঁর জন্য দোয়া করে।"
হাদিও চেয়েছিলেন তেমনি একটা প্রভাব সৃষ্টি করতে। স্বল্প সময়ে হলেও, এমন কিছু করতে চেয়েছিলেন যা বংশ পরম্পরায় মানুষের হৃদয়ে থেকে যাবে। এবং সত্যিই, তিনি সফল হয়েছেন। আজ তাঁর শাহাদাতের মাত্র কয়েক দিন পরেই লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে মনে রাখছে, তাঁর জন্য দোয়া করছে, তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হচ্ছে।
হাদি ১০০ বছর বেঁচে থেকে নিজের পরিবারের জন্য সম্পদ জমা করতে পারতেন। নিজের সন্তানদের জন্য বিশাল ব্যবসা গড়তে পারতেন। নিজের জন্য আরামদায়ক জীবন যাপন করতে পারতেন। কিন্তু হাদি সেই পথ বেছে নেননি।
হাদি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন ছোট হতে পারে, কিন্তু তাঁর প্রভাব হবে বিশাল। তিনি বেছে নিয়েছিলেন এমন একটা পথ যেখানে তাঁর সন্তান হয়তো পিতৃহীন হবে, কিন্তু লক্ষ লক্ষ সন্তান পাবে অনুপ্রেরণা।
# # অধ্যায় ৬: মায়ের কাছে স্বপ্নের কথা - শাহাদাতের প্রার্থনা
হাদির মায়ের সাথে তাঁর কথোপকথন ছিল অত্যন্ত হৃদয়স্পর্শী। তিনি তাঁর মাকে বলতেন, "মা, যারা রাজনীতি করে দেশের জন্য, তাদের ঘরে মৃত্যু হওয়া সেটা ভালো কিছু নয়। তাদের তো রাস্তায়, আন্দোলনে মৃত্যু হতে হয়। তাদের শহীদ হতে হয়।"
একজন মা তাঁর সন্তানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে কী অনুভব করেন? একজন মা যিনি চান তাঁর সন্তান নিরাপদে বাসায় থাকুক, বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকুক, তাঁর সন্তান বলছে রাস্তায় শহীদ হওয়াই তাঁর কাম্য।
কিন্তু হাদির মা বুঝতেন। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান সাধারণ কোনো মানুষ নয়। তিনি জানতেন তাঁর সন্তান একটা উদ্দেশ্য নিয়ে জন্মেছে।
হাদি তাঁর মাকে আরও বলতেন, "আমি স্বপ্ন দেখি, প্রার্থনা করি - একটা বিশাল আন্দোলনের মিছিল, সকলের সামনে আমি দাঁড়িয়ে আছি, দুহাত উঁচু করে, দেশের স্বার্থে, ইনসাফ বাস্তবায়নে। ওখানে আমি গুলিবিদ্ধ হয়েছি। ইনসাফের হাসি হেসে, সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে, শহীদ হয়ে চলে যাচ্ছি। এটাই সবচেয়ে বড় সার্থকতা।"
এই ছিল হাদির স্বপ্ন। এই ছিল হাদির প্রার্থনা। তিনি প্রার্থনা করতেন শহীদ হওয়ার জন্য। প্রার্থনা করতেন ইনসাফের পথে মৃত্যুবরণ করার জন্য।
হাদি আরও বলতেন, "কেউ শহীদ হলে পরে, কিছু ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে যাবে। তখন আর অবস থাকবে না কেউ।" তিনি জানতেন যে তাঁর জীবদ্দশায় সবাই তাঁকে বুঝবে না। কিন্তু তাঁর শাহাদাতের পরে, শয়তান ছাড়া সবাই বুঝে যাবে হাদি কে ছিলেন, তিনি কী চেয়েছিলেন।
এবং ঠিক তাই হলো। ১২ ডিসেম্বর, ২০২৫। পবিত্র জুম্মার দিন। হাদি জুম্মার নামাজ পড়ে বের হলেন। একটি অটোরিক্সায় করে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ পেছন থেকে একটি মোটরসাইকেল এগিয়ে আসে। এবং কাপুরুষের মতো পেছন থেকে গুলি করা হয় হাদির মাথায়।
তাঁর স্বপ্ন ছিল মিছিলের সামনে দাঁড়িয়ে, দুহাত তুলে, সবার সামনে শহীদ হওয়ার। কিন্তু হত্যাকারীদের সেই সাহস ছিল না। তারা পেছন থেকে গুলি করল। কারণ সামনে থেকে হাদির চোখে চোখ রেখে গুলি করার সাহস তাদের ছিল না। তারা জানত, সামনে থেকে গুলি করতে গেলে হাদির চোখের দিকে তাকাতে হবে। আর হাদির চোখে ছিল সত্য, সাহস, ইনসাফ। সেই চোখের দিকে তাকিয়ে গুলি করার সাহস কোনো হত্যাকারীর থাকে না।
তাই তারা পেছন থেকে গুলি করল। পবিত্র জুম্মার দিনে। নামাজের পরে। একজন নিরস্ত্র মানুষকে। এটা ছিল তাদের কাপুরুষতার প্রমাণ। এটা ছিল তাদের ভয়ের প্রমাণ। তারা ভয় পেত হাদিকে। ভয় পেত হাদির আদর্শকে। ভয় পেত হাদির প্রভাবকে।
কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি, হাদিকে মেরে তারা আসলে হাজার হাজার হাদি সৃষ্টি করেছে। পবিত্র জুম্মার দিনে হাদির এই শাহাদাত হয়ে উঠেছে আরও বেশি পবিত্র, আরও বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। আর সত্যিই, ইবলিশ ছাড়া সবাই বুঝে গেছে হাদি কে ছিলেন। আজ পুরো বাংলাদেশ বুঝেছে, পুরো জাতি জেগে উঠেছে।
# # অধ্যায় ৭: চিন্তক হাদি - বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন
হাদি শুধু একজন রাজনীতিবিদ বা কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন গভীর চিন্তক। তিনি সমাজের প্রতিটি অসংগতি, প্রতিটি বৈষম্য, প্রতিটি অন্যায় নিয়ে চিন্তা করতেন।
হাদি একটি মানবিক ও ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন। তাঁর মতে, "এ দেশে একজন নারী পেটের দায়ে শরীর বিক্রি করলে সেই লজ্জা পুরো জাতির।" এই কথার মধ্যে ছিল তাঁর সামাজিক চেতনার গভীরতা। তিনি বুঝতেন যে একজন মানুষের দুর্দশা আসলে পুরো সমাজের ব্যর্থতা।
হাদি বিশ্বাস করতেন, "মানুষের ন্যূনতম অর্থনৈতিক মুক্তি না ঘটলে ভালো সমাজ গঠন সম্ভব নয়।" তিনি জানতেন যে একটা সমাজে যতদিন কেউ অনাহারে থাকবে, যতদিন কেউ মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না, ততদিন সেই সমাজে ইনসাফ আসবে না।
হাদি বৈষম্য নিয়ে অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। তিনি বিয়ের অনুষ্ঠানে খাবার নষ্ট করা দেখলে তীব্র ক্ষোভ অনুভব করতেন। কারণ তিনি জানতেন, ঠিক সেই সময়ে কোনো শিশু হয়তো ডাস্টবিন থেকে খাবার কুড়িয়ে খাচ্ছে।
একবার এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, "এক দিকে বিয়ের অনুষ্ঠানে হাজার হাজার টাকার খাবার নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে একটা শিশু ডাস্টবিনে খাবার খুঁজছে। এটা কোন সমাজ? এটা কোন বাংলাদেশ?"
এই বৈষম্য, এই অসমতা হাদির হৃদয়কে রক্তাক্ত করত। তাই তিনি লড়েছেন এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে। লড়েছেন এক ইনসাফপূর্ণ সমাজ গড়তে যেখানে সবাই সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে।
হাদির একটি বড় স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের তরুণদের জন্য একটি জ্ঞানের আর্কাইভ বা গাইডলাইন তৈরি করা। যেখানে রাষ্ট্রবিজ্ঞান, সাহিত্য, সিনেমা বা থিয়েটার নিয়ে যারা পড়তে চায়, তারা সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তিনি চেয়েছিলেন তরুণদের জন্য এমন একটা প্ল্যাটফর্ম যেখানে তারা বিভ্রান্ত না হয়ে সঠিক পথে জ্ঞান অর্জন করতে পারবে।
হাদি বলতেন, "যার যার অবস্থান থেকে ইনসাফ কায়েমের লড়াইয়ে শরিক হতে হবে।" একজন কবি কবিতা লিখে লড়াই করবে। একজন শিক্ষক শিক্ষা দিয়ে লড়াই করবে। একজন ব্যবসায়ী সৎ ব্যবসা করে লড়াই করবে। প্রত্যেকে তার নিজের জায়গা থেকে ইনসাফের জন্য লড়লে, একদিন ইনসাফের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব।
# # অধ্যায় ৮: যোদ্ধা হাদি - জবাবদিহিতার দাবিদার
কিন্তু হাদি শুধু স্বপ্ন দেখতেন না। তিনি সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য কঠোর এবং নির্ভীকভাবে লড়াই করতেন। তিনি কোনো অন্যায়ের সাথে আপস করতেন না।
যখন সাবেক রাষ্ট্রপতি হামিদকে বিদেশে পালিয়ে যেতে সহায়তা করা হলো, হাদি তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়েন। তিনি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে তিন দিনের আল্টিমেটাম দেন। দাবি করেন, "কার নির্দেশে বা কার ফোনের মাধ্যমে হামিদকে বিমানবন্দর থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে সেটা স্পষ্ট করতে হবে।"
হাদি হুশিয়ারি দিয়ে বলেন, "যদি সরকার এই অপরাধীদের নাম প্রকাশ করে তাদের গ্রেফতার না করে, তবে জনগণ মনে করবে সরকার নিজেই এর সাথে জড়িত।"
এটাই ছিল হাদির সাহস। তিনি সরকারকেও জবাবদিহিতার মুখোমুখি করতে ভয় পেতেন না। তিনি বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতায় থাকুক আর না থাকুক, সবাইকে জবাবদিহি করতে হবে।
হাদি ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ এবং মাহফুজুল আলমকে পদত্যাগ করে জনতার কাতারে ফিরে আসার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, "এই ছাত্র উপদেষ্টারা ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও ফ্যাসিবাদের দোসরদের বিচার, রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর অপসারণ বা আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার মতো দাবিগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেননি। তাহলে তারা ক্ষমতায় থেকে কি করছেন?"
হাদি সতর্ক করে দেন, "কেউ যেন জুলাই আন্দোলনের 'মাস্টারমাইন্ড' হিসেবে নিজেকে দাবি না করে। আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হলো ১৮ কোটি জনতা এবং শহীদরা।" এই ছিল হাদির বিনয়। তিনি জানতেন বিপ্লব কোনো একজনের সৃষ্টি নয়। বিপ্লব সমগ্র জনগণের সৃষ্টি।
হাদি প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের কাছে দাবি করেন যে, জুলাই গণহত্যার বিচার ত্বরান্বিত করতে আন্তর্জাতিক মানের প্রসিকিউটর এবং বিচারক নিয়োগ দেওয়া হোক। তিনি তীব্র সমালোচনা করে বলেন, "সরকার উন্নয়নের জন্য বিদেশী এক্সপার্ট আনলেও গণহত্যার বিচারের জন্য কেন এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক মানের টিম আনেনি?"
এই প্রশ্নটা ছিল অত্যন্ত তীক্ষ্ণ এবং যুক্তিযুক্ত। উন্নয়নের জন্য বিদেশী এক্সপার্ট আসবে, কিন্তু শহীদদের বিচারের জন্য আসবে না? এটা কোন অগ্রাধিকার?
# # অধ্যায় ৯: শহীদদের মায়েদের কাছে করা ওয়াদা
অনেকে হাদীকে "ভায়োলেন্ট" বা উগ্র কথা বলার জন্য সমালোচনা করতেন। তাঁর ভাষা কঠোর ছিল, এটা সত্য। কিন্তু কেন?
হাদি নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, "যখন গণহত্যাকারীদের পালাতে দেওয়া হয় এবং শহীদদের রক্তের অবমাননা করা হয়, তখন অসভ্য ভাষা ছাড়া এদের কানে কথা পৌঁছানো সম্ভব নয়।"
হাদির কঠোর ভাষার পেছনে ছিল শহীদদের মায়েদের কাছে করা ওয়াদা। তিনি শহীদ আবু সাঈদ এবং মুগ্ধদের মায়েদের সাথে কথা বলেছিলেন। সেই মায়েরা তাঁদের সন্তানদের রক্তের বিচারের দাবি জানিয়েছেন।
একজন মা যিনি তাঁর সন্তানকে হারিয়েছেন, তিনি কী চান? তিনি চান তাঁর সন্তানের হত্যাকারীদের বিচার হোক। তিনি চান তাঁর সন্তানের রক্ত বৃথা না যাক। তিনি চান তাঁর সন্তান যে স্বপ্ন দেখেছিল, সেই স্বপ্ন বাস্তবায়িত হোক।
হাদি সেই মায়েদের কাছে ওয়াদা করেছিলেন যে তাদের সন্তানদের হত্যাকারীদের বিচার করা হবে। এখন যখন হাদি দেখতেন যে গণহত্যাকারীরা পালিয়ে যাচ্ছে, যখন তিনি দেখতেন যে বিচার হচ্ছে না, তখন তাঁর হৃদয় রক্তাক্ত হতো।
তিনি ভাবতেন, "শহীদদের মায়েদের মুখের দিকে কীভাবে তাকাবো? কীভাবে বলবো যে তাদের সন্তানদের বিচার হচ্ছে না?"
তাই হাদির ভাষা কঠোর হতো। কারণ তিনি লড়ছিলেন শহীদদের জন্য। লড়ছিলেন ইনসাফের জন্য। লড়ছিলেন সেই মায়েদের জন্য যারা তাদের সন্তানদের হারিয়েছেন।
# # অধ্যায় ১০: চূড়ান্ত সংগ্রামের ঘোষণা
হাদি ঘোষণা দিয়েছিলেন, "যদি তিন দিনের মধ্যে দাবিগুলো মানা না হয়, তবে আমরা সচিবালয় ঘেরাও করবো। এবং এবার সচিবালয়ে গেলে আর বাড়ি ফিরবো না। হয় দাবি আদায় হবে নতুবা সরকারের পতন হবে।"
এটা কোনো ফাঁকা হুমকি ছিল না। এটা ছিল হাদির দৃঢ় প্রতিজ্ঞা। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন, "জুলাই বিপ্লবের সাথে কোনো গাদ্দারি বরদাশত করা হবে না, তা নিজের বাবা বা ভাই হলেও।"
এটাই ছিল হাদির আপসহীন অবস্থান। এটাই ছিল হাদির নীতি। তিনি বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের সাথে আপস করা মানে অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া।
হাদি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, "ইনসাফ কায়েম না হওয়া পর্যন্ত হাদিরা রাজপথ ছাড়বে না।"
এবং তিনি রেখে গেছেন সেই আপসহীন মনোভাব, সেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা, সেই অদম্য সাহস। আজ যারা হাদির পথে চলছে, তারা সেই মনোভাব নিয়েই এগিয়ে যাচ্ছে।
# # অধ্যায় ১১: হাদির শেষ দাবি - বিচারের অঙ্গীকার
হাদি একটাই দাবি করেছিলেন। একটাই আবেদন রেখে গেছেন। তিনি বলেছিলেন, "আমাকে যদি কেউ মেরে ফেলে, শহীদ করে ফেলে, কোন দুঃখ থাকবে না। কিন্তু এই হত্যার যাতে বিচার হয়।"
এটা শুধু হাদির ব্যক্তিগত আবেদন ছিল না। এটা ছিল ভবিষ্যতের সব হাদিদের জন্য নিরাপত্তার আবেদন। এটা ছিল ইনসাফের বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপনের আবেদন।
হাদি জানতেন, "যদি আমার হত্যার বিচার না হয়, তাহলে এই দেশে আর কোনো হাদি জন্ম নিতে সাহস পাবে না। কোনো তরুণ এগিয়ে আসবে না ইনসাফের জন্য লড়তে। কোনো মা তার সন্তানকে দেশপ্রেমিক হওয়ার সাহস দেবে না।"
হাদির এই আশঙ্কা সত্যি হয়েছে। তাঁর ভাই ওমর বিন হাদি বলেছেন, "আমি যদি আবার আমার ভাইয়ের হত্যার বিচারের দাবিতে রাজপথে নামি, আমাকেও হত্যা করা হবে; এই ভয় আমার মায়ের মধ্যে কাজ করছে। মা ইতোমধ্যে এক সন্তান হাদীকে হারিয়েছেন, আরেকটাকেও হারানোর আশঙ্কায় ভীত।"
এই কথাটা ভয়াবহ। হাদির মা এক সন্তান হারিয়েছেন। এখন ভয় পাচ্ছেন আরেক সন্তান হারাবেন কিনা। কারণ তিনি জানেন যে এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া মানে মৃত্যু।
এটাই তো সেই প্রশ্ন যা হাদি রেখে গেছেন। যদি হাদির হত্যার বিচার না হয়, তাহলে আর কে এগিয়ে আসবে? কোন মা তার সন্তানকে এই পথে আসতে দেবে?
হাদির হত্যার বিচার শুধু একটা আইনি প্রক্রিয়া না। এটা একটা সামাজিক চুক্তি। এটা একটা জাতীয় অঙ্গীকার। এটা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি।
যদি হাদির হত্যার বিচার হয়, তাহলে বার্তা যাবে পুরো দেশে: এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া নিরাপদ। এই দেশে সত্য বলা সম্মানিত। তখন হাজার হাজার তরুণ এগিয়ে আসবে। হাজার হাজার হাদি জন্ম নিবে এই মাটিতে।
কিন্তু যদি বিচার না হয়? তাহলে বার্তা যাবে ভিন্ন: এই দেশে ইনসাফের জন্য লড়া মানে মৃত্যু। এই দেশে সত্য বলা মানে বিপদ। তখন কোনো মা তার সন্তানকে এই পথে আসতে দেবে না। ভয়ে, আতঙ্কে সবাই চুপ থাকবে। আর চুপ থাকার মধ্যে মরে যাবে ইনসাফের বাংলাদেশ।
# # অধ্যায় ১২: পরিবারের দাবি - টাকা নয়, বিপ্লব চাই
হাদির মেজো ভাই শরিফ ওমর বিন হাদি বলেছেন এমন কথা যা হাদির আদর্শের প্রকৃত উত্তরাধিকার প্রকাশ করে। তিনি বলেছেন, "আমরা কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা বা অনুদান চাই না। ওসমান যে বিপ্লবী আন্দোলনের জন্য জীবন দিয়েছে, সেই অসমাপ্ত বিপ্লবকে সমাপ্ত করাই আমাদের একমাত্র দাবি।"
এটাই তো হাদির পরিবার। এখানে টাকা-পয়সার মূল্য নেই। এখানে ক্ষমতার মূল্য নেই। এখানে শুধু আদর্শের মূল্য আছে। হাদির ভাই বলছেন, "আমরা টাকা চাই না। আমরা চাই হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন হোক।"
ওমর বিন হাদি আরও বলেছেন, "আমি চেয়েছিলাম রাজপথে বিপ্লবী ওসমানের পাশে থেকে, এই বাংলাদেশকে আধিপত্যবাদ মুক্ত করতে। আমি চেয়েছিলাম ইনসাফের বাংলাদেশ গঠন না হওয়া পর্যন্ত আমরা রাজপথ ছাড়বো না। কিন্তু আজকে ওসমান চলে গেছেন।"
কিন্তু ওসমান চলে গেলেও ওসমানের স্বপ্ন থেমে নেই। ওসমানের ভাই সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ওসমানের সহযোদ্ধারা সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে লড়ছে।
# # অধ্যায় ১৩: জাতির কাছে অঙ্গীকার - ড. ইউনূসের প্রতিশ্রুতি
হাদির জানাজায়, লাখো মানুষের উপস্থিতিতে, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন এমন কথা যা ইতিহাসে লেখা থাকবে। তিনি বলেছেন, "বীর ওসমান হাদি, তোমাকে আমরা বিদায় দিতে আসিনি এখানে। তুমি আমাদের বুকের ভেতরে আছ এবং চিরদিন বাংলাদেশ যতদিন থাকবে, তুমি সকল বাংলাদেশির বুকের মধ্যে থাকবে।"
তিনি আরও বলেছেন, "আমরা আজকে তোমাকে প্রিয় হাদি, বিদায় দিতে আসিনি। আমরা তোমার কাছে ওয়াদা করতে এসেছি, তুমি যা বলে গেছ, সেটি যেন আমরা পূরণ করতে পারি।"
এটা শুধু একটা বক্তৃতা না। এটা একটা জাতীয় অঙ্গীকার। একটা প্রতিশ্রুতি যে হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। হাদি যা বলে গেছেন, তা পূরণ হবে।
আর জাতি হাদিকে সম্মান জানিয়েছে এক অনন্য উপায়ে। শাহবাগের সেই ঐতিহাসিক চত্বর, যেখানে বাংলাদেশের প্রতিটি আন্দোলন, প্রতিটি বিপ্লবের কেন্দ্রবিন্দু, সেই চত্বরকে এখন বলা হয় "শহীদ ওসমান হাদি চত্বর"।
এটা শুধু একটা নামকরণ না। এটা একটা প্রতীক। একটা স্মারক। একটা অঙ্গীকার যে হাদির নাম, হাদির স্বপ্ন, হাদির আদর্শ চিরকাল বাংলাদেশের হৃদয়ে থাকবে।
# # অধ্যায় ১৪: এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে
আজ পুরো বাংলাদেশ স্লোগান দিচ্ছে - "এক হাদি লোকান্তরে, লক্ষ হাদি ঘরে ঘরে।"
এই স্লোগান শুধু কথা না। এটা বাস্তব। এক হাদি চলে গেছেন, কিন্তু লক্ষ লক্ষ হাদি জন্ম নিচ্ছে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পাড়ায়, প্রতিটি গ্রামে।
হাদির শাহাদাত যে বীজ বপন করে গেছে, সেই বীজ থেকে এখন লক্ষ লক্ষ গাছ জন্ম নিচ্ছে। প্রতিটি তরুণ যে আজ রাজপথে দাঁড়িয়ে ইনসাফের দাবি তুলছে, সে একজন হাদি। প্রতিটি মা যে তার সন্তানকে সৎ হতে শেখাচ্ছে, সে হাদির শিক্ষা বাস্তবায়ন করছে। প্রতিটি লেখক যে লিখছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে, সে হাদির উত্তরাধিকার বহন করছে।
হাদি বলে গেছেন, "চলতে থাকো, দৌড়াতে থাকো। দৌড়াতে না পারলে হাঁটো, হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দাও। কিন্তু থেমে যেও না।"
এবং আজকের হাদিরা থেমে নেই। তারা চলছে। তারা দৌড়াচ্ছে। তারা লড়ছে। কারণ তারা জানে, থামলেই শেষ। চললেই জয়।
# # অধ্যায় ১৫: একজন অনুসারীর আত্মজিজ্ঞাসা - "আমি কীভাবে হাদি হব?"
হাদির শাহাদাতের পর, হাজারো মানুষের জীবনে ঘটছে এক অদ্ভুত পরিবর্তন। একজন যুবক, যিনি সারাজীবন প্রতিজ্ঞা করে এসেছেন কখনো রাজনীতি করবেন না, কখনো নির্বাচন করবেন না, আজ রাতের পর রাত ঘুমাতে পারছেন না। আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি সৃষ্টিকর্তার সাথে কথা বলছেন। তাঁর মনে একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে: "আমি কীভাবে হাদি হব?"
এই যুবক লিখছেন তাঁর বন্ধুকে। লিখছেন সেই কথা যা তিনি সাধারণত কাউকে বলেন না। তিনি লিখছেন:
"আর আমার কেন যেন মনে হইতেছে অনেকদিন বসে রইলাম। এই মুহূর্তে হাদী হইয়া কাজ করা দরকার।"
কিন্তু কীভাবে? তাঁর মোটরসাইকেল নষ্ট। পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। একসময় লক্ষ লক্ষ টাকা লেনদেন করতেন, আজ ৫০০ টাকা ধার চাইতে পারবেন এমন কাউকে খুঁজে পান না পরিবার ছাড়া।
কিন্তু তবুও তিনি হাল ছাড়ছেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন: "মা-বাবা ভাই-বোন পরিবারের দোয়া নিয়ে প্রত্যেকদিন বাসে চলে যাব। বাসে যাতায়াত করেই কাজ করব যতদিন নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন না হয়।"
এটাই তো হাদির শিক্ষা। এটাই তো হাদির বাংলাদেশ। যেখানে একজন মানুষ নিজের সামর্থ্যের মধ্যে থেকেই কাজ করে যায়। দৌড়াতে না পারলে হাঁটে। হাঁটতে না পারলে হামাগুড়ি দেয়। কিন্তু থামে না।
তিনি লিখছেন তাঁর সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্বের কথা:
"সবশেষে ওই যে অসুস্থ হয়ে পড়ছি অনেকদিন ঘুমাইতে পারি নাই। শুধু একটা কথা মনকে বুঝাইতে পারি নাই - হাদি শহীদ হয়ে গেছে, হাদীর মত করে হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করার চেষ্টা করলে বেইমানি হবে। হাদিসের সাথে বেইমানী হবে। হাদির অবুঝ শিশুর সাথে বেইমানী হবে। আর এই বেইমানি শুধু হাদি অথবা হাদির শিশুর সাথে নয়, এই বেইমানি ১৮ কোটি হাদির সাথে, ১৮ কোটি শিশুর সাথে বেইমানি। এই বেইমানি বাংলাদেশের সাথে বেইমানি।"
এই উপলব্ধি তাঁকে পাগল করে দিচ্ছে। রাত জেগে তিনি ভাবছেন। কীভাবে কাজ করবেন? কোন কৌশলে? কোন পথে?
এবং তিনি একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যা তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সিদ্ধান্ত:
"আমার জীবনে অনেকগুলো প্রতিজ্ঞা আছে। তার মধ্যে অন্যতম দুইটি প্রতিজ্ঞা: নাম্বার ওয়ান - কখনো রাজনীতি করবো না। নাম্বার টু - কখনো নির্বাচন করব না, মেম্বার-চেয়ারম্যান-এমপি-মন্ত্রী কিছুই না। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে প্রতিজ্ঞাগুলো ভাঙতে হবে। প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো রাজনীতি করব না - ভাবছি প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব, রাজনীতি শুরু করব হাদীর মত করে। প্রতিজ্ঞা করেছি কখনো নির্বাচন করব না - প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করব, নির্বাচন করব, শুধুমাত্র হাদীর মত করে।"
এটা কত বড় পরিবর্তন! একজন মানুষ যিনি সারাজীবন রাজনীতি থেকে দূরে ছিলেন, আজ হাদির জন্য, হাদির স্বপ্নের জন্য, তিনি রাজনীতিতে নামতে প্রস্তুত। এটাই তো হাদির প্রভাব। এটাই তো হাদির বিপ্লব।
এবং তিনি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাঁর মায়ের কাছে যাবেন। মাকে বলবেন গোসল করিয়ে দিতে। ঠিক যেভাবে একজন মা তাঁর সন্তানকে নতুন জীবনের জন্য প্রস্তুত করেন, সেভাবে। এবং সেই গোসলের সময় তিনি মাকে বলবেন:
"মা, তুমি কি চাও না হাদির বিচার হোক? তুমি কি চাও না হাদির মত আর কেউ জীবন না হারাক? কোন মায়ের বুক খালি না হোক? কোনো যুবতী বোন বিধবা না হোক? কোন সন্তান তার বাবার আদর্শ আর ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত না হোক?"
এবং তিনি মাকে বলবেন:
"মা, আজকে গোসল করিয়ে আমাদেরকে অনুমতি দাও। আমার মনে হচ্ছে, কেন যেন বারবার মনে হচ্ছে, হাদী ভাইয়ের স্বপ্ন বাস্তবায়নে আমরা ঝাপিয়ে না পড়লে হাদী ভাইয়ের সাথে বেইমানি হবে। শহীদ না হয়ে মৃত্যু কামনা করো না মা। বেইমান হয়ে মৃত্যুবরণ করি, এটা তো অবশ্যই চাইবে না।"
এই হলো হাদির বাংলাদেশ। এই হলো হাদির প্রভাব। একজন মানুষ, যিনি কখনো রাজনীতি করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, আজ হাদির জন্য সেই প্রতিজ্ঞা ভাঙতে প্রস্তুত। কারণ তিনি বুঝে গেছেন, হাদির স্বপ্ন বাস্তবায়ন না করা মানে বেইমানি। বেইমানি হাদির সাথে। বেইমানি হাদির শিশুর সাথে। বেইমানি ১৮ কোটি মানুষের সাথে।
এই যুবকের মতো আজ হাজারো মানুষ একই দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। হাজারো মানুষ রাতের পর রাত ঘুমাতে পারছে না। হাজারো মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করছে: "আমি কীভাবে হাদি হব?"
এবং প্রত্যেকে তাদের নিজের উত্তর খুঁজে নিচ্ছে। কেউ রাজনীতিতে নামছে। কেউ লেখালেখি শুর