10/01/2025
বর্ডারের মানুষ কেন এমন সাহস দেখাল?
বিজিবির ট্রেঞ্চের পাশে লুংগী পরা রামদাওয়ালা আর সরিষা ক্ষেতে গুলির মুখে শত শত লোকের ছবি সবাই দেখেছেন। আপনারা দেখছেন সাহস, দেখছেন ডেসপারেশন, দেখছেন দেশপ্রেম।
কিন্তু কেন এতলোক গুলির মুখে গেল?
বর্ডারের মানুষ ছাড়া এর উত্তর আপনারা বুঝবেন না। আমি জন্মেছি সীমান্তের গ্রামে, তাই এই ছবিগুলোর ভেতরে থাকা সাহসের উৎস আমি জানি। চলুন, প্রমাণসহ ব্যাখা করি।
গুগল আর্থে যে দুটি ছবি দেখছেন, এটা আমার এলাকা। প্রথম ছবির জায়গাটা বাড়ি থেকে এক কিলোমিটারের কাছে। কুশিয়ারা নদী এখানে অস্বাভাবিকভাবে বাংলাদেশের ভেতরে ঢুকে গেছে। নদী ভাঙ্গনের অভিশাপ। শুনেছি এক সময় এই জায়গাটায় কুশিয়ারা সোজা ছিল, তারপর বাংলাদেশের পাড় ভাঙতে ভাঙতে ঢুকে গেছে ভেতরে। হাজার হাজার মানুষের বসত ভিটা এখন ভারতে। দেশভাগের সময় কুশিয়ারা নদীকে সীমানা ধরে প্রায় ৫০ কিমি জায়গা জুড়ে পাকিস্তান-ভারত আলাদা হয়েছিল। নদীই বর্ডার, এই যুক্তিতে ভাঙনে পাওয়া পুরো জায়গাটাই নিয়ে নিয়েছে ভারত। বাংলাদেশের আপত্তি কাজে আসেনি।
জুম করে দেখুন, নতুন এই ভূমিতে কোনো বাড়ি নেই। হবে কী করে? ভারতের কোনো ব্যক্তির জমি হলে তো ঘর তুলবে। এত বড় জায়গা জুড়ে শুধু কাশফুল এবং বিএসএফ স্থাপনা।
এবার শেষ ছবিটায় নজর দিন। ৫০ কিমি জায়গা জুড়ে নদীকে সীমানা মানলেও এখানে মানা হয়নি। কারণ নদীটা এবার ভারতের দিকে ঢুকেছে। বর্ডারের সাদা দাগ আগেরবার নদীর সাথে সাথে ঘুরলেও এবার আর ঘুরেনি। এটাও আমার এলাকা, আমার উপজেলা। এখানেই জন্ম নিয়েছে সুরমা কুশিয়ারা।
ভারতের সীমানা মাস্তানি মেনে না নেয়ার কারণে ঠিক এই জায়গায় ২০০৪ সালের দিকে বিডিআর বিএসএফের সাথে যুদ্ধ শুরু করে। সর্বাত্মক যুদ্ধ। আমাদের বাড়ি থেকে প্রায় ৩০ কিমি দূরে, তাও আমরা মর্টারের শব্দ পেতাম। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়তে পারে আশংকায় বিডিআর বাড়ির পাশে বাংকার খুঁড়ে রেখেছিল। খুব আগ্রহ নিয়ে আমরা বাংকার খনন ও বালুর বস্তা টানাটানি দেখতাম। এখনো যুদ্ধ হওয়া এলাকায় মর্টারের শেলের চিহ্ন আছে।
আশ্চর্যজনকভাবে, পুরো একটা যুদ্ধের খবর কোথাও এখন আর নেই। গুগল ইউটিউবে সার্চ দিয়ে কিচ্ছু পাওয়া যায় না।
ব্যাক টু প্রিভিয়াস পিকচার, যেখানে নদী বাংলাদেশে ঢুকেছে। এখানে আমি লাল একটা স্পট দিয়েছি, এখানে বিএসএফের ওয়াচ টাওয়ার আছে। এমনিই মাগনা পাওয়া ভূমি, তাও সেটা বদলে যাওয়া সীমানার ২০ গজের ভেতরে। তারা নো ম্যানস ল্যান্ডের নিয়মকে তুড়ি মেরে ওয়াচ টাওয়ার বানিয়ে ফেলে। স্যাটেলাইটে একটা ক্যাম্পের মতো কিছু স্থাপনা দেখা যাচ্ছে। এটা নতুন দেখছি। আমি লাস্ট যখন এখানে গিয়েছিলাম, এটা ছিল না। আবার বর্ডার রোড বলে যেটা দেখা যাচ্ছে, এই জিনিসও নতুন। আগে দেখিনি।
ছবিটায় এবার আরেকবার তাকান। নদীর এপাশে একটা স্পটের নাম, ইন্ডিয়া ভিউ। ঠিক এখানে ২০০৬-২০০৮ সময়ের মধ্যে কোনো এক সময় বিডিআর টহল দেয়ার ফাঁকে বিশ্রাম নেবার জন্য বাঁশের একটা মাচা বানাতে গিয়েছিল। বিএসএফ নো ম্যানস ল্যান্ডের দোহাই দিয়ে বাধা দেয়। অথচ বর্ডারে এপাশে আগে থেকেই জনবসতি আছে এবং বিএসএফ নিজেরাই বিরান ভূমিতে আস্তো একটা ওয়াচ টাওয়ার বানিয়ে বসেছে ঠিক অপজিটে!
কেমন মাস্তানি ভাবেন!
অস্ত্রে সজ্জিত জনা বিশেক বিএসএফ সদস্য রণ প্রস্তুতি নিয়ে বাধা দিতে আসে। এপাশে ছিল মাত্র ৪-৫ জন বিডিআর। তারা তো আর জানত না এমন হবে। শীতকাল, নদীর পানি অনেক নিচে। একজন প্রবীণ বিডিআর সদস্য একাই একটা রাইফেল নিয়ে ঢাল বেয়ে নেমে গেলেন নদীতে। অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে বিএসএফের কাছাকাছি গিয়ে বললেন, পারলে গুলি কর!
সিনেমাটিক, কিন্তু বাস্তব সত্য ঘটনা।
আর হ্যাঁ, প্রথম দুই ছবির মতো ততক্ষণে ৪-৫ জন বিডিআরের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে শত গ্রামবাসী।
ছোট বেলায় আমরা এই দৃশ্যগুলোর সাথে পরিচিত ছিলাম। ফ্ল্যাগ মিটিং এর সময় যে কোনো এক পক্ষকে নদী পার হয়ে অন্য দেশে যাওয়া লাগতো। বিডিআর গেলে দৃশ্যটা হতো এক রকম, বিএসএফ আসলে অন্য রকম।
বিডিআর ভারতে গেলে ৩-৪ জন যেত, এপাড়ে হাঁটাহাঁটি করতো আরো ৪-৫ জন। তাদের সাথে সাথে ঘুরত পুরো গ্রামের পুরুষ। শিশুরা কাছাকাছি গিয়ে ধমক খেতো। আর নারীরা দাঁত দিয়ে আঁচল কামড় দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো অদূরে।
একবার বিএসএফ এসেছিল এ পাশে, মাই গড! তাদের পাশে নদীর ঢালে বন্দুকসহ পজিশন নিয়ে শুয়ে রইল অন্তত তিন প্ল্যাটুন বিএফএফ। ওপাশে সিভিলিয়ানের চিহ্নও নেই। বিএসএফ হয়তো সিভিলিয়ান এলাউ করে না, নয়তো তারাই আসে না। কোনটা সত্য জানি না।
ঢাকায় আতলামো আলাপ হয়, "ভারতের আধিপত্য"। এসব রাজনৈতিক টুলস। ঢাকাইয়া ও শহুরে মধ্যবিত্ত "ভারত" টপিকে যেসব বলে, যে পক্ষেই হোক, রাজনৈতিক ফায়দা নেয়ার একটা গুপ্ত উদ্দেশ্য মিশে থাকে তাতে। বর্ডারের মানুষ এত শিক্ষিত না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দরিদ্র, অশিক্ষিত। তারা ভারতের গুন্ডামির একদম কাচা রূপ প্রতিদিন দেখে। শহুরে আলাপে প্রভাবিত হয় না তারা, শুনেও না। তারা হিসেব একান্ত নিজেদের।
আমাদের গ্রামের কথাই যদি ধরি, একটা খরস্রোতা নদী গ্রাম বেয়ে গেছে। এমন এক নদীর জলে জীবিকা থাকে অনেক মানুষের। কিন্তু ভারতের আপত্তিতে নদীতে মাছ ধরা প্রায় বন্ধ। মাছ ধরার অবাধ অনুমতি যখন ছিল তখন ভারতীয় জেলেরা এপাড়ে আসতে পারত কিন্তু বাংলাদেশের জেলে নদীর অর্ধেক গেলেই গুলির হুমকি। তাদের কাঁটাতারের আলো এত উজ্জ্বল, বর্ডারের এপাশে বসে আপনি পত্রিকা পড়তে পারবেন। বর্ডারের রাস্তায় গেলে মনে হবে, আপনার ঘরে আলো ফেলে কেউ আপনাকে দেখছে। প্রাইভেসী হারিয়ে ন্যাংটা ন্যাংটা অনুভূতি হবে।
গুলি করে মানুষ মারা যদি বাদও দেন; এসবের কারণে সীমান্তের মানুষ সব সময়ই এক ধরনের রাগ পুষে রাখে। হাসিনা-ভারত-পেঁয়াজ...এইগুলার বহু উর্ধ্বে এসব রাগ। সুযোগ পেলেই মানুষ প্রকাশ করে।
আবার ধরেন আমাদের বিজিবির অধিকাংশ সৈনিক বাঙালি। যারা পাহাড়ি, তারাও বাংলা বলতে পারে, বুঝতেও পারে। বিজিবির সংগে বর্ডারের মানুষের হৃদিক একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়। স্কুল লাইফে বিডিআরের জওয়ানরা আমাদের সাথে মিশে ক্রিকেট খেলতেন। বেশ আন্তরিক সম্পর্ক তৈরি হয় জওয়ান ও সিভিলিয়ানে। বর্ডার প্রহরী তো আপন মানুষ, মিলেমিশে থাকায় আরো আপন লাগে।
বিএসএফ এর জওয়ানরা ভারতের একেক এরিয়া থেকে একেকজন আসে। স্থানীয়দের সাথে ভাষাগত দূরত্ব ছাড়াও কালচারাল দূরত্ব থাকেই। ঐ যে শৈশবে বিএসএফের পাশে তাদের লোকালদের দাঁড়াতে দেখতাম না, বোধহয় এটাই তার কারণ। এটা একমাত্র কারণ না হলেও একটা কারণ তো অবশ্যই। আর অপ্রেসরের পাশে আসলে সাধারণ মানুষ ঝুঁকি নিয়ে কোথাও দাঁড়ায় না।
মোটাদাগে ভাইরাল ছবি দুইটার পেছনে এই হলো ব্যাখা। এটাকে সাহস বলেন, দেশপ্রেম বলেন আর যাই বলেন...বর্ডারের মানুষের কাছে এটা একটা সাধারণ ছবি। খুঁজলে এমন অনেক ভিডিও পাবেন, অস্ত্রধারী বিএসএফের সাথে খালি হাতে টানাটানি করে সাধারণ মানুষ দেশের নাগরিক ছিনিয়ে এনেছে। কোথাও গুলি খাওয়া বডি কেড়ে এনেছে দেশে। ছোটবেলায় দেখেছিলাম, আমাদের গ্রামের এক শিশু রাগ করে নদী সাতরে ভারতে আত্মীয়ের বাড়ি যেতে চেয়েছিল। বিএসএফ ধরে তাকে নদীর পাড়ে এনে চোরের মতো পেটায়। নদীর এপাশে কয়েক হাজার মানুষ প্রচন্ড ক্ষোভ নিয়ে সে দৃশ্য দেখে, আমিও তার একজন ছিলাম। নদী পার হওয়া সহজ কথা নয়। নইলে সেদিন কয়েকশ মানুষ শিশুকে উদ্ধারে ছুটে যেত বলে আমার ধারণা।
এই একটা দৃশ্য আমাকে অনেক প্রভাবিত করেছে। এখনো মানতে পারি না। সহ্য করতে না পেরে আমি বর্ডার ইস্যু নিয়ে অনেক লেখা লিখেছি। নন-এক্টিভিস্টের মধ্যে আমার চেয়ে বেশি কেউ বোধহয় এই টপিক নিয়ে লিখেনি। বর্ডারে আমাদের কিছু লোকেরও দোষ আছে। সবই জানি। কিন্তু তাদের মাস্তানি এটার জাস্টিফিকেশন হয় না, কোনোভাবেই। ২০২১ সালের বইমেলার জন্য মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক একটা উপন্যাস লিখছিলাম, উপন্যাসের শুরুটা বিএসএফের মাস্তানির দৃশ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল। বইটা আর আসেনি যদিও। কারণ যে গল্পে যা বলতে গিয়েছিলাম লিখে ফেললে তাতে তখনকার ভারতপ্রেমী সরকার আমার ছাপার অর্ধেক লাল করতো। বাকি অর্ধেক লাল করতো বর্তমান পাকিস্তানপ্রেমী ক্ষমতাধর সিভিলিয়ানদের একাংশ। (উপস, আলগা লাইনটা বলে লেখার রিচ কমিয়ে দিলাম)
চাঁপাইনবাবগঞ্জের এই ছবিটা বাংলাদেশের যে কোনো বর্ডারের গ্রামের ছবি। এটা শৈশবে দেখা আমার গ্রামের ছবি। এ মানুষগুলো যেন আমার খুব চেনা জানা। বিজিবির সৈনিকেরা যেন ছোটবেলায় আমার দেখা বিডিআর জওয়ান, যাদের দিকে প্রচন্ড শ্রদ্ধা নিয়ে আমরা তাকিয়ে থাকতাম। বিডিআর জওয়ানদের দূর থেকে দেখলেও আমরা শিশুরা প্রচন্ড জোরে সমস্বরে সালাম দিতাম। ভয়ে নয়, আনন্দে। ওদের অনেকে চোরাকারনারী থেকে খুব ঘুষ খেতো, জানাও ছিল সবার। তাও আমরা এটা বুঝতাম, এরা আমাদের বাড়ি পাহারা দিচ্ছে, আমাদের দিকে গুলি আসলে আগে সেটা বুকে নেবে।
যুদ্ধ গুলি, লাশ কোনোটাই ভালো না। মরে যাওয়া মানেই প্রাণের খরচ। তবুও যখন কেউ অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাহস নিয়ে বুক পেতে দাঁড়িয়ে থাকে, বড় গর্ব হয়। আনন্দ হয়।
আমাদের প্রতিটা সৈনিক আমাদের জমি দখলের প্রতিবাদে এভাবে অস্ত্র নিয়ে আগের মতো সটান দাঁডাক।
আমরা লুংগী পরা, প্যান্ট পরা সবাই তাদের পাশেই থাকবো।
- Joynal Abedin